
দেশে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং মানহীন সম্প্রসারণের কারণে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। দেশে হাজার হাজার কারিগরি প্রতিষ্ঠান থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, আধুনিক ল্যাবরেটরি নেই, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই, অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীও নেই। এত দুর্বল একটি ভিত্তির ওপর বিদেশি কোনো মডেল বাস্তবায়ন করলে তা আদৌ কতটা কার্যকর হবে?
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল চীন সফর শেষে ৩০ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরিতে চীনের মডেল বাংলাদেশে অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
চীন কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলেছে, তা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই শিক্ষণীয়। তবে চীনের সফলতা শুধু একটি শিক্ষাপদ্ধতির কারণে নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিল্পের অংশগ্রহণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর ধারাবাহিক বিনিয়োগের ফল।
দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানের সংকট। কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের নামে অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেলেও সব জায়গায় প্রয়োজনীয় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভোকেশনাল শিক্ষা পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া ৩ হাজার ৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি বা শিক্ষার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৩টি প্রতিষ্ঠানে এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং ১৭৮টি প্রতিষ্ঠানে দাখিল (ভোকেশনাল) কার্যক্রমের অনুমোদন রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানে টানা পাঁচ বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। (প্রথম আলো, ২৭ জুলাই ২০২৬)
সমস্যাটি শুধু শিক্ষার্থীসংকটে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় শিক্ষক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগের ঘাটতি রয়েছে। দুর্বল তদারকি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে কাগজ–কলমে ভোকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রম থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু নতুন প্রকল্প বা বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করলে হবে না। শিক্ষার্থী আকর্ষণের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সামাজিকভাবে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব, সচেতনতা ও প্রচারণা বাড়াতে হবে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো কেন শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহ হারাচ্ছে? এর একটি বড় কারণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কম মর্যাদার মনে করে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, কারিগর ও প্রশিক্ষিত কর্মীদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়।
চীনের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিতে পারে শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে। চীনে কারিগরি শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে বাস্তব প্রশিক্ষণ নেয় এবং শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করা হয়। ফলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে।
চীনের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। দেশটিতে ৯ হাজারের বেশি মধ্যম কারিগরি বিদ্যালয়, ১ হাজার ৫৬২টি উচ্চ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৮৭টি কারিগরি স্নাতক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী যুক্ত। তবে চীনের সাফল্যের মূল কারণ শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নয়, বরং শিল্প খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে শিক্ষার্থীদের বাস্তব উৎপাদনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেয়।
তবে চীনা মডেল বাংলাদেশে হুবহু প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। কারণ, দুই দেশের শিল্প কাঠামো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং শিক্ষা–সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। চীনে কারিগরি শিক্ষা সফল হয়েছে। কারণ, সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অংশ। বাংলাদেশে এখনো অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়।
বাংলাদেশে প্রথম কাজ হওয়া উচিত বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান উন্নয়ন। যেসব প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না, সেগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজন হলে দুর্বল প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক ল্যাব, দক্ষ শিক্ষক, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু নতুন প্রকল্প বা বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করলে হবে না। শিক্ষার্থী আকর্ষণের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সামাজিকভাবে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব, সচেতনতা ও প্রচারণা বাড়াতে হবে।
চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি কোনো প্রস্তুত সমাধান নয়। প্রয়োজন চীনের কার্যকর উপাদানগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত এবং সরকারের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করতে পারলেই কারিগরি শিক্ষা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত্তি হতে পারে। কারিগরি শিক্ষার লক্ষ্য শুধু সনদ প্রদান নয়; বরং এমন দক্ষ মানুষ তৈরি করা, যারা দেশের উৎপাদনব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখতে পারে।
● ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়