‘দশে মিলি করি কাজ/ হারি জিতি নাহি লাজ।’ সম্ভবত এটি খনার বচন। কথা হলো, কেউ হারতে চায় না। হেরে যাওয়ার জন্য কেউ কি একসঙ্গে জোট বাঁধে? একা যেটি সম্ভব নয়, জোট বেঁধে কয়েকটি পক্ষ শক্তি বাড়াতে পারে। নির্বাচনের রাজনীতিতে এই শক্তির প্রদর্শন ও ব্যবহার খুবই জরুরি।
আমাদের দেশে জোটের রাজনীতির শুরু সেই ১৯৫৪ সালে। ক্ষমতায় তখন পাকিস্তান মুসলিম লীগ। এটিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে। তার বিরুদ্ধে একজোট হয় তিনটি দল—পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফতে রব্বানী পার্টি। তারা গঠন করে যুক্তফ্রন্ট। নেপথ্যে থেকে সমর্থন দেয় কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ। এ দলের কয়েকজন যুক্তফ্রন্টের টিকিটে প্রার্থী হন।
দেশে ছিল পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা। কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতা সংখ্যালঘুদের জন্য বরাদ্দ আসনেও প্রার্থী হন। এ ছাড়া মাঠে ছিল পাকিস্তান কংগ্রেস ও তফসিলি ফেডারেশন। তাদের প্রার্থীরা সবাই ধর্মীয় সংখ্যালঘু। তাঁরাও ‘অমুসলিম’ আসনে দাঁড়ান। তাঁদের ভোট দেন ‘অমুসলিম’ ভোটাররা।
যুক্তফ্রন্টে আওয়ামী লীগ ছিল সবচেয়ে বড় দল। এর বাইরে কিছু দলের নেতাদের সঙ্গে তাদের সমঝোতা ছিল, নির্বাচনে জিতলে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করবে। আওয়ামী লীগ এই সমঝোতা বাস্তবায়ন করে এক বছর পর, ১৯৫৫ সালে। দল থেকে তারা ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে দেয়।
এ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ভূমিধস বিজয় হয়। ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা ২২৮টি আসনে জয়ী হন। প্রদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, তা-ও আবার দলীয় সরকারের অধীনে, এ ছিল অভাবিত। ক্ষমতাসীনেরা কোনো কারচুপির চেষ্টা করেনি। ক্ষমতাসীন দলের প্রধান নেতা মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন হেরে যান তরুণ ছাত্রলীগ নেতা খালেক নেওয়াজ খানের কাছে।
দলীয় সরকারের অধীনেও যে ভালো নির্বাচন হতে পারে, তার একটি উদাহরণ হলো ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন। তবে এটিই প্রথম, এটিই শেষ। দলীয় সরকারের অধীনে পরবর্তীকালে কোনো নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। স্থূল ক্ষমতালিপ্সা, নিম্নরুচির রাজনীতি আর গুন্ডামি দিয়ে ক্ষমতাসীনেরা বরাবরই নির্বাচনকে প্রভাবিত করে জয় ছিনতাই করেছে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলের জয়ের প্রধান নিয়ামক ছিল তাদের জোটবদ্ধ হওয়া। এই জোটে যারা ছিল, তাদের মধ্যে আদর্শের মিল ছিল না বললেই চলে। একটা ব্যাপারে তারা একমত হয়, ক্ষমতাসীনদের হারাতে হবে। আদর্শিক মিল ও সংহতি না থাকার কারণে যুক্তফ্রন্টের আয়ু ফুরিয়ে যায়। বছর না পেরোতেই এটি মুখ থুবড়ে পড়ে এবং মারা পড়ে। তারপর দেখা যায় দলীয় রাজনীতির এক বীভৎস রূপ। পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, গালাগাল, এমনকি মারামারির এক নির্লজ্জ নজির তৈরি হয়। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা তাঁদের স্পিকার শাহেদ আলীকে দৈহিক আঘাত করে মেরে ফেলেন। এ কলঙ্ক মুছবার নয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমরা দেখছি জোটের রাজনীতি। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে প্রথমে দুটি জোটের দেখা মেলে—আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫-দলীয় জোট আর বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট। পরে ১৫-দলীয় জোট ভেঙে একটি ৮-দলীয় এবং একটি ৫-দলীয় জোট হয়। জোটের মধ্যে অনেক দলই ছিল বিপরীত মেরুর। তারা এককাট্টা হয়েছিল একটি ইস্যু নিয়ে, এরশাদকে হটাতে হবে। তো এরশাদ হটে গেলেন। নির্বাচনের গন্ধ নাকে এসে লাগল। ৫-দলীয় জোট কিছুদিন জাতীয় সরকারের দাবিতে হইচই করল।
আওয়ামী লীগ আর বিএনপি—দুটিই চায় একা একা ক্ষমতায় যেতে। ফলে কোনো নির্বাচনী জোট হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের মিত্রদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছিল। এই সমঝোতার ফল নগদ পেয়ে যায় বিএনপি। লাভের একটা বড় বখরা জোটে তার মিত্র জামায়াতে ইসলামীর ভাগ্যে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতসহ তিনটি দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করে মাঠে নামে। জয় পেয়ে তৈরি হয় জোট সরকার। ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবার দেশে জোট সরকারের দেখা মেলে।
বিএনপির নেতৃত্বে যে জোট, সেটি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ, এ জোটে বিএনপির অবস্থান পাহাড়সম। অন্যেরা খুব ছোট ও দুর্বল। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে তারা জোট থেকে বেরিয়ে আসতে চাইবে না। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে জামায়াতের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য থাকলেও অন্যেরা মোটেও হেলাফেলার পাত্র নয়। এই জোটে নেতা বেশি। ফলে ঝামেলাও বেশি।
একটা বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট। বিএনপি আর জামায়াত যে কটি নির্বাচনে জোট করে বা জোট বেঁধে নির্বাচন করেছে, প্রতিবার তারা জয় পেয়েছে। যেবার তাদের জোট ছিল না, তারা হেরেছে। এটা দেখেই জোটের শক্তি ও মূল্য আন্দাজ করা যায়।
২০০৮ সাল থেকে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪-দলীয় জোট। কিন্তু নির্বাচনগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়ার কারণে এগুলো গ্রহণযোগ্য হয়নি। এটি প্রথাগত জোটও ছিল না। জোটের ছোট শরিকেরা সবাই আওয়ামী লীগে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা আওয়ামী লীগ কবজা করে নিয়েছিল। নির্বাচনে তারা কোনো বিরোধী পক্ষকে দাঁড়াতেই দেয়নি।
এ বছর আরেকটি সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সময় আছে সাকল্যে চার সপ্তাহ। এখন পর্যন্ত মাঠে দেখা যাচ্ছে দুটি জোট। একদিকে বিএনপি জুলাই আন্দোলনের কতিপয় সহযোগীর সঙ্গে আসন সমঝোতা করে প্রার্থিতা ঠিক করেছে। সেখানে অন্যরা দল হিসেবে গৌণ। হাতে গোনা তাদের কয়েকজন নেতাকে বিএনপি আসন ‘ছেড়ে’ দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কয়েকটি দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আসনবিন্যাস চূড়ান্ত করেছে। বলতে গেলে, এটিই প্রথাগত জোট।
দুই জোটের অনেক শরিকের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। আদর্শিকভাবে তারা কেউ কেউ বিপরীত মেরুর। এটাও স্বাভাবিক। কারণ, জোট বা আসন সমঝোতা হয়েছে নির্বাচনে জিততে। নির্বাচন হয়ে গেলে এই সমঝোতা কত দিন টিকবে, বলা মুশকিল। যে পক্ষ জিতবে, তারা সরকার গঠন করে সরকারি পদ ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বিলিয়ে ‘মিত্রদের’ ধরে রাখবে। যে পক্ষ হেরে যাবে, তাদের সংহতিতে চিড় ধরতে পারে।
বিএনপির নেতৃত্বে যে জোট, সেটি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ, এ জোটে বিএনপির অবস্থান পাহাড়সম। অন্যেরা খুব ছোট ও দুর্বল। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে তারা জোট থেকে বেরিয়ে আসতে চাইবে না। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে জামায়াতের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য থাকলেও অন্যেরা মোটেও হেলাফেলার পাত্র নয়। এই জোটে নেতা বেশি। ফলে ঝামেলাও বেশি।
যে জোটই বিরোধী দলে যাক, তারা সরকারি দলকে সুস্থির থাকতে দেবে না। আমাদের দেশে ‘এজিটেশনাল পলিটিকস’-এর যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তাতে কোনো সরকারের পক্ষে শান্তিতে মেয়াদ পূরণ করা খুব কঠিন। সবাই রাজনীতিটাকে সংসদ ভবনের দেয়ালের ভেতরে না রেখে রাস্তায় নিয়ে এসেছে। সবাই চায় সব ফয়সালা রাস্তায় হোক। ‘রাজপথ ছাড়ি নাই’, এ জমানার একটা বুলন্দ স্লোগান। রাস্তা আটকে মিছিল করা বা বসে পড়া, যখন-তখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো অফিস ঘেরাও করা, এসব তো অনেক দিন ধরেই মহিমান্বিত করা হয়েছে। বক্তৃতা দেওয়ার সময় ছোট-বড় সব নেতা কথা শুরু করেন ‘সংগ্রামী ভাইয়েরা’ বলে। সংগ্রাম ছাড়া কোনো কথা নেই। যিনি যত গরম কথা যত চড়া স্বরে বলতে পারেন, তিনিই তত বড় সংগ্রামী নেতা।
অনেক অনিশ্চয়তা ডিঙিয়ে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তারপরও শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ১২ ফেব্রুয়ারির দিনটা পেরোলে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারব, দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে। আমার মনে হয়, সমস্যা শুরু হবে তার পর থেকে।
রাজনীতিটা এখন আর ভদ্র-সজ্জনদের আওতায় নেই। এটি চলে গেছে চাঁদাবাজ-গালিবাজদের হাতে। যে যত বেশি গাল দিতে পারে, সে তত বেশি হাততালি পায়। হাততালির রাজনীতিতে সুবচনের জায়গা নেই।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব