হামে আক্রান্ত ৯ মাস বয়সী আনহা ছয় দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠায় আজ মেয়েকে নিয়ে স্বস্তিতে মা আয়েসা আক্তার। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা, ১০ মে
হামে আক্রান্ত ৯ মাস বয়সী আনহা ছয় দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠায় আজ মেয়েকে নিয়ে স্বস্তিতে মা আয়েসা আক্তার। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা, ১০ মে

মতামত

হাম শেষ হলেও যে বিপদ থেকে যাবে

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা কেবল একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; বরং এটি একটি গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হতে চলেছে। প্রায় অর্ধলাখ রোগীর এই বিশাল সংখ্যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সাধারণত আমাদের সমাজে হামকে কেবল জ্বর এবং শরীরে কিছু লালচে ফুসকুড়ি ওঠার একটি সাধারণ রোগ হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই রোগের প্রভাব কেবল চামড়ার ফুসকুড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। হামের ভাইরাসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করার ক্ষমতা, যা আক্রান্ত শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হামের এই স্নায়বিক প্রভাব নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান দীর্ঘকাল ধরে সতর্ক করে আসছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই চিকিৎসকেরা লক্ষ করেছিলেন যে হামের সংক্রমণের পর অনেক শিশু তীব্র এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ‘সাবঅ্যাকিউট স্কেলেরোজিং প্যানেনসেফালাইটিস’ বা এসএসপিই।

এসএসপিই এমন এক বিরল কিন্তু জটিলব্যাধি, যা হাম হওয়ার ৭ থেকে ১০ বছর পর প্রকাশ পায়। ইতিহাসের বিভিন্ন মহামারি–পরবর্তী পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোতেও যখন টিকাদান কর্মসূচির আগে হামের প্রাদুর্ভাব ছিল, তখন বেঁচে যাওয়া শিশুদের একটি বিশাল অংশ অন্ধত্ব, শ্রবণশক্তি হারানো এবং স্থায়ী মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, যেখানে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছিল না, সেখানে হাম–পরবর্তী ‘নিউরো-ডিজঅ্যাবিলিটি’ বা স্নায়বিক পঙ্গুত্ব কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) ২০১৯-২০ সালের ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের সময় দেখা গেছে, পুষ্টিহীনতা এবং বিশেষায়িত স্নায়বিক সেবার অভাবে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে স্নায়বিক জটিলতার হার ছিল বেশি।

একইভাবে ভিয়েতনামে ২০১৪ সালের হামের প্রাদুর্ভাবের পর গবেষণায় দেখা গেছে যে সঠিক সময়ে স্নায়বিক পর্যবেক্ষণ ও পুনর্বাসন না হওয়ায় অনেক শিশু দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক জটিলতার শিকার হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে হাম–পরবর্তী সময়ে একটি সমন্বিত পুনর্বাসনব্যবস্থা অপরিহার্য।

আমরা যদি এখনই হামে আক্রান্ত শিশুদের স্নায়বিক ও বিকাশজনিত ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন না হই এবং আমাদের একমাত্র বিশেষায়িত সেবাকাঠামো শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোকে রক্ষা না করি, তবে ভবিষ্যতে আমাদের একটি বড় প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। আমাদের এখনই সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তুলতে হবে, যাতে বেতন বন্ধ বা বাজেটঘাটতির অজুহাতে এই অমূল্য সেবাগুলো বন্ধ না হয়। 

গবেষণালব্ধ তথ্য বলছে, হামের কারণে যারা মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত হয়, তাদের মধ্যে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক বা জ্ঞানীয় সংকটের মুখে পড়ে। এটি অত্যন্ত চিন্তার বিষয় যে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ হয়ে যাওয়া অনেক শিশু পরবর্তী জীবনে কথা বলতে দেরি করা, শেখার অক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া কিংবা মৃগীরোগের মতো স্থায়ী সমস্যায় ভুগতে পারে।

বাংলাদেশে বর্তমানে যে হাজার হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ঝুঁকির আওতায় রয়েছে। অথচ এই অত্যন্ত নাজুক সময়েই দেশের শিশুদের একমাত্র বিশেষায়িত আশ্রয়স্থল ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্রের’ (এসবিকে) সেবা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো মূলত একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শিশুবিশেষজ্ঞ, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট ও মনোবিজ্ঞানীরা একটি শিশুকে পূর্ণাঙ্গভাবে সুস্থ করে তোলার কাজ করেন। হাম–পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত শিশুর জন্য এই সমন্বিত সেবা কেন জরুরি, তার উজ্জ্বল উদাহরণ পাওয়া যায় ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সের (এনআইএমএইচএএনএস) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে। সেখানে দেখা গেছে, মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে যদি সংক্রমণের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে নিবিড় ‘কগনিটিভ রিহ্যাবিলিটেশন’ শুরু করা যায়, তবে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার হার প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে যায়। বাংলাদেশে আমাদের শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো ঠিক এ কাজই করে আসছিল।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে বর্তমান সংকটকালে অনেক শিশু বিকাশ কেন্দ্রের বাজেট কমিয়ে আনা হয়েছে এবং কর্মীদের বেতন মাসের পর মাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর ফলে অনেক কেন্দ্র এখন বন্ধের পথে বা স্থবির হয়ে পড়ছে। একটি সচল শিশু বিকাশ কেন্দ্র যেভাবে একটি শিশুর বিকাশজনিত ঘাটতি শনাক্ত করে, তাকে থেরাপির মাধ্যমে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পারে, তা কোনো সাধারণ হাসপাতালের আউটডোরে সম্ভব নয়।

আমাদের শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো যদি অচল হয়ে যায়, তবে ৫০ হাজার  শিশুর একটি বড় অংশ সঠিক পুনর্বাসন পাবে না। এর ফলে কয়েক বছর পর আমরা এমন এক প্রজন্মের দেখা পাব, যারা কথা বলায় পিছিয়ে থাকবে এবং যাদের পড়াশোনায় বা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে অক্ষমতা প্রকট হবে।

এই সংকট নিরসনে সরকারি নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা রয়েছে। এটি কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রুটিন কাজ নয়; বরং একটি জাতীয় মেধা রক্ষা মিশন। শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোর তহবিল নিশ্চিত করা, স্থগিত থাকা বেতন-ভাতা অনতিবিলম্বে সচল করা এবং এই বিশেষজ্ঞদের পূর্ণ শক্তিতে হাম–পরবর্তী পুনর্বাসনকাজে নিয়োজিত করা এখন সময়ের দাবি। এসবিকে কেন্দ্রগুলোকে সচল রেখে প্রতিটি আক্রান্ত শিশুকে নিয়মিত ফলোআপের আওতায় আনতে হবে, যাতে কোনো শিশুর মস্তিষ্কে ক্ষতির লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

আমরা যদি এখনই হামে আক্রান্ত শিশুদের স্নায়বিক ও বিকাশজনিত ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন না হই এবং আমাদের একমাত্র বিশেষায়িত সেবাকাঠামো শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোকে রক্ষা না করি, তবে ভবিষ্যতে আমাদের একটি বড় প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। আমাদের এখনই সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তুলতে হবে, যাতে বেতন বন্ধ বা বাজেটঘাটতির অজুহাতে এই অমূল্য সেবাগুলো বন্ধ না হয়। 

ইমদাদুল হক তালুকদার মানসিক জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ