উত্তরা র‍্যাব–১ কার্যালয়ের ভেতরে ছিল গোপন বন্দিশালা
উত্তরা র‍্যাব–১ কার্যালয়ের ভেতরে ছিল গোপন বন্দিশালা

অভিমত–বিশ্লেষণ

গোয়েন্দা সংস্থা: গোপনীয়তার আড়ালে আর দায়মুক্তি নয়

বাংলাদেশের প্রয়োজন শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা, যারা জানবে তাদের ক্ষমতার সীমা কতটুকু। গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার নিয়ে লিখেছেন নাফিউল আলম

রাষ্ট্রের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থার প্রয়োজন নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হামলা, বিদেশি হস্তক্ষেপ কিংবা সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় দক্ষ গোয়েন্দাব্যবস্থা ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র চলতে পারে না। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থাকে কার্যকর করতে গিয়ে যদি তার ক্ষমতার সীমাই তুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে নাগরিকের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশে মূল সংকট এখানেই। গোপনীয়তাকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে দায়মুক্তির সমার্থক হতে দেখেছি।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন এ সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন কয়েকজন কর্মকর্তার অপরাধ হিসেবে দেখেনি। কমিশনের ভাষ্যে, দীর্ঘ সময় ধরে চলা গুমের ঘটনাগুলোর জন্য প্রয়োজন হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনুমোদন এবং একাধিক সংস্থার মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়।

প্রতিবেদনের ৪৪ পৃষ্ঠায় কমিশন বলেছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিভিন্নভাবে নিজেদের আইনি এখতিয়ার অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে ডিজিএফআই (ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) এবং এনএসআই (ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স) বেসামরিক নাগরিককে গ্রেপ্তার বা আটক করার আইনগত ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান নয়। ফলে অপহরণ, গোপন আটক বা জিজ্ঞাসাবাদে তাদের সম্পৃক্ততা কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার নয়; এটি রাষ্ট্রের ভেতরে একটি সমান্তরাল আইনের প্রয়োগব্যবস্থা তৈরির লক্ষণ।

সমস্যাটি শুধু ডিজিএফআইতে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের গোয়েন্দা কাঠামোয় ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ, গোয়েন্দা বিভাগ, সিটিটিসি (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম), র‍্যাবের (র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) গোয়েন্দা এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে কাজ করেছে। কিন্তু কোন সংস্থার দায়িত্ব কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ, তার পরিষ্কার ও সমন্বিত আইনি কাঠামো নেই। যদি এনএসআই সম্পর্কে বলি, এই সংস্থার ক্ষমতা, সীমা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নির্ধারণকারী কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। আবার গুম কমিশনের প্রতিবেদনে এনএসআই, ডিজিএফআই ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের কাজের মধ্যে এখতিয়ারগত পুনরাবৃত্তি ও আন্তসংস্থা বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধী দল, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের ওপর নজরদারিতে এনএসআইকে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

ডিবি ও সিটিটিসির ক্ষেত্রে সংকটটি আরেকটু ভিন্ন। এগুলো পুলিশের অংশ এবং আইনগতভাবে তদন্ত ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রাখে। কিন্তু একই ইউনিট যখন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলা তৈরির পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। গুম কমিশন ডিবির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পুলিশিং, অস্বীকৃত আটক এবং র‍্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে বন্দী হস্তান্তরের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। সিটিটিসি সম্পর্কে বলা হয়েছে, এর কার্যক্রম সম্পর্কে জনসাধারণের জানার সুযোগ খুব সীমিত এবং কার্যকর বিচারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির অভাব রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পাওয়া যায় প্রতিবেদনের ৫১ থেকে ৫৫ পৃষ্ঠায়।

নজরদারির ব্যবস্থাটিও সংস্কারের বাইরে রাখা যায় না। কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীন এনটিএমসি (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার) প্রতিষ্ঠার আগে ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টার ছিল ডিজিএফআই সদর দপ্তরে এবং এর প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা র‍্যাব ও ডিবি ব্যবহার করত।

আইনে স্পষ্টভাবে বলতে হবে, কোনো গোয়েন্দা সংস্থা নিজে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা গোপন স্থানে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না। অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি পুলিশের উপযুক্ত তদন্ত ইউনিটে দিতে হবে। প্রতিটি আটক ও আন্তসংস্থা স্থানান্তরের সময়, স্থান, নির্দেশদাতা কর্মকর্তা এবং গন্তব্য কেন্দ্রীয় রেজিস্টারে সংরক্ষণ করতে হবে। যোগাযোগে নজরদারির জন্য বিচারিক পরোয়ানা, নির্দিষ্ট মেয়াদ, প্রয়োজনীয়তা ও সমানুপাতিকতার পরীক্ষা এবং পরবর্তী স্বাধীন নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কমিশনকে জানিয়েছেন, কারও অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে নীরবে তুলে নেওয়ার জন্য মুঠোফোন নজরদারি প্রায় অপরিহার্য ছিল। অথচ কমিশন এই নজরদারির ওপর কোনো কার্যকর বিচারিক তদারকি খুঁজে পায়নি। প্রতিবেদনের ৭৬ পৃষ্ঠার এই তথ্য দেখায়, আড়ি পাতা ও অবস্থান শনাক্তকরণের ক্ষমতা শুধু প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর ছেড়ে দেওয়া কতটা বিপজ্জনক।

আরও উদ্বেগজনক হলো আন্তসংস্থা কার্যক্রমের চিত্র। কমিশনের ২৫৬টি ঘটনার নমুনায় অর্ধেকের কিছু বেশি ঘটনায় একাধিক সংস্থার অংশগ্রহণ পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি সংস্থা কাউকে তুলে নিয়েছে, দ্বিতীয় সংস্থা গোপনে আটক রেখেছে এবং তৃতীয় সংস্থা পরে মামলা দিয়ে আদালতে হাজির করেছে। হস্তান্তরের সময় চোখের বাঁধন ও হাতকড়া পর্যন্ত বদলে ফেলার বিবরণ রয়েছে। কমিশনের মতে, এটি আকস্মিক সহযোগিতা নয়; বরং সুসংগঠিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার লক্ষণ। এই অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ১১৪ পৃষ্ঠায় রয়েছে।

২.

এই বাস্তবতায় নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর ধারা ১৪(৩) গুরুত্বপূর্ণ হলেও যথেষ্ট নয়। বিধানটি অনুযায়ী, কোনো বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না; অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তবাহিনী তদন্ত দলকে দায়িত্ব দেওয়া যাবে। এটি স্বার্থের সংঘাত কমানোর একটি চেষ্টা। কিন্তু কমিশনের অনুসন্ধান বলছে, গুমের ঘটনায় একাধিক সংস্থা প্রায়ই যৌথভাবে কাজ করেছে এবং এক সংস্থা অন্য সংস্থার পরিচয়ও ব্যবহার করেছে। ফলে শুরুতেই অভিযুক্ত বাহিনী শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। আবার একটি বাহিনীর বদলে আরেক বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দিলেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না।

যে কাঠামো ক্ষমতার সীমা অস্পষ্ট রেখেছে, রাজনৈতিক নির্দেশকে গোয়েন্দা দায়িত্বে পরিণত করেছে এবং একাধিক সংস্থাকে জবাবদিহি ছাড়াই একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে, সেই কাঠামোর জরুরি পরিবর্তন দরকার।

প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যাবলি পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত ‘ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস অ্যান্ড ওভারসাইট অ্যাক্ট’ প্রণয়ন। এই আইনে প্রতিটি সংস্থার দায়িত্ব আলাদা করে নির্ধারণ করতে হবে।

ডিজিএফআই সামরিক ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিদেশি সামরিক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং শত্রুভাবাপন্ন কোনো দেশের বা সংগঠনের গোয়েন্দা তৎপরতা, গুপ্তচরবৃত্তি বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড নস্যাৎ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাই এই সংস্থার কাজ ‘কাউন্টার-ইনটেলিজেন্ট’-এর মধ্যে সীমিত থাকা উচিত। অন্যদিকে এনএসআই বেসামরিক জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কাজ করবে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ পুলিশের ‘প্রিভেন্টিভ ইন্টেলিজেন্স’ ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করবে। ডিবি ও সিটিটিসি অপরাধের তদন্ত করবে ফৌজদারি কার্যবিধি এবং আদালতের নিয়ন্ত্রণে। এনটিএমিসি হবে বিচারিক অনুমোদনসাপেক্ষ প্রযুক্তিগত সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান, স্বতন্ত্রভাবে কাউকে লক্ষ্য করার ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো অপারেশনাল সংস্থা নয়।

আইনে স্পষ্টভাবে বলতে হবে, কোনো গোয়েন্দা সংস্থা নিজে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা গোপন স্থানে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না। অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি পুলিশের উপযুক্ত তদন্ত ইউনিটে দিতে হবে। প্রতিটি আটক ও আন্তসংস্থা স্থানান্তরের সময়, স্থান, নির্দেশদাতা কর্মকর্তা এবং গন্তব্য কেন্দ্রীয় রেজিস্টারে সংরক্ষণ করতে হবে। যোগাযোগে নজরদারির জন্য বিচারিক পরোয়ানা, নির্দিষ্ট মেয়াদ, প্রয়োজনীয়তা ও সমানুপাতিকতার পরীক্ষা এবং পরবর্তী স্বাধীন নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন।

এই সংস্কারে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কার্যকর শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। বর্ণবাদী শাসনের নিরাপত্তাকাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার পর দেশটি ১৯৯৪ সালের ‘ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস ওভারসাইট অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে: পার্লামেন্টের জয়েন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ইন্টেলিজেন্স (গোয়েন্দাবিষয়ক যৌথ স্থায়ী কমিটি) এবং স্বাধীন ইন্সপেক্টর–জেনারেল অব ইন্টেলিজেন্স।

সংসদীয় কমিটি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, বাজেট, অডিট, প্রস্তাবিত আইন এবং বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বের বিভাজন পর্যালোচনা করতে পারে। প্রয়োজন হলে শুনানি আয়োজন, সাক্ষী তলব এবং জনসাধারণের অভিযোগের তদন্তের নির্দেশও দিতে পারে। গোপন তথ্য রক্ষার জন্য কমিটির বৈঠক বন্ধ দরজায় হতে পারে, কিন্তু গোপনীয়তার অজুহাতে সংসদীয় জবাবদিহি বাদ দেওয়া যায় না।

সেখানকার ইন্সপেক্টর জেনারেল অব ইন্টেলিজেন্স গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আইন ও নীতিমালা মেনে চলা পর্যবেক্ষণ করেন, কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন এবং প্রয়োজনীয় যেকোনো গোয়েন্দা তথ্য বা স্থাপনায় প্রবেশ করতে পারেন। আইনে বলা হয়েছে, তাঁর কাছ থেকে কোনো সংস্থা প্রয়োজনীয় নথি বা স্থাপনায় প্রবেশাধিকার আটকে রাখতে পারবে না। তাঁকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের কথাও আইনে স্পষ্ট করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা পরবর্তীকালে ‘জেনারেল ইন্টেলিজেন্স লজ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট থার্টি-সেভেন অব টুয়েন্টি টুয়েন্টি ফোর’-এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বেসামরিক গোয়েন্দা দায়িত্ব আবার পৃথক করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা দায়িত্বের সীমা পরিষ্কার রাখার গুরুত্বই তুলে ধরে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সঙ্গে কর্মপরিবেশও বদলাতে হবে। গুম কমিশন ডিজিএফআইয়ের এমন কিছু বিস্তারিত গোয়েন্দা নথি পর্যালোচনা করেছে, যেখানে কর্মকর্তার নিজের ও আত্মীয়দের রাজনৈতিক পরিচয় পর্যন্ত লেখা ছিল; কিন্তু গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের উল্লেখ ছিল না। অন্যদিকে বেআইনি আদেশ প্রত্যাখ্যানকারী জুনিয়র সদস্যদের বিরূপ মূল্যায়ন, বদলি ও পদোন্নতি আটকে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

৩.

বাংলাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকার মডেল হুবহু অনুসরণ করলে একটি বাস্তব সমস্যা থেকে যাবে। আমাদের সংসদে সাধারণত একটি রাজনৈতিক দলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে। ফলে শুধু সংসদীয় সদস্যদের নিয়ে গঠিত তদারকি কমিটি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই একটি স্বাধীন ইন্টেলিজেন্স ওভারসাইট কমিশন বেশি কার্যকর হতে পারে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মনোনীত প্রতিনিধি (যদিও নতুন আইন অনুযায়ী মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে এখনো যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে), অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং মানবাধিকার, আইন, তথ্যের গোপনীয়তা, প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এ কমিশন গঠন করা যেতে পারে।

কমিশন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন বাজেট, নজরদারির পরিসংখ্যান (কোনো ব্যক্তি, এলাকা বা কার্যক্রমের ওপর নজর রাখার মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্য বা উপাত্ত), আন্তসংস্থা অভিযান বা কার্যক্রম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ পর্যালোচনা করবে। সংবেদনশীল তথ্য বাদ দিয়ে কমিশনকে প্রতিবছর একটি প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

এই কমিশনের অধীনে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য একজন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব ইন্টেলিজেন্টে নিয়োগ করা যেতে পারে। তাঁর নিয়োগ ও অপসারণের সিদ্ধান্ত এককভাবে সরকার বা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হাতে না রেখে স্বাধীন বাছাইপ্রক্রিয়া এবং ইন্টেলিজেন্স ওভারসাইট কমিশনের অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত।

ইন্সপেক্টর জেনারেলের নিজস্ব বাজেট, পেশাদার তদন্তকারী দল এবং সব গোয়েন্দা সংস্থার নথি, ডিজিটাল রেকর্ডস ও স্থাপনায় বাধাহীন প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। নাগরিক, ভুক্তভোগী, সংস্থার কর্মকর্তা ও ‘হুইসল-ব্লোয়ার’ (গোপন অপরাধ বা দুর্নীতি প্রকাশকারী) সরাসরি তাঁর কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। কোনো সংস্থা তদন্তে অসহযোগিতা করলে বা নথি গোপন কিংবা নষ্ট করলে তার জন্য আলাদা শাস্তির বিধান থাকতে হবে। অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে ইন্সপেক্টর জেনারেল নিজে ফৌজদারি তদন্ত পরিচালনা না করে বিষয়টি স্বাধীন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বা প্রসিকিউশনের কাছে পাঠাবেন এবং তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সঙ্গে কর্মপরিবেশও বদলাতে হবে। গুম কমিশন ডিজিএফআইয়ের এমন কিছু বিস্তারিত গোয়েন্দা নথি পর্যালোচনা করেছে, যেখানে কর্মকর্তার নিজের ও আত্মীয়দের রাজনৈতিক পরিচয় পর্যন্ত লেখা ছিল; কিন্তু গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের উল্লেখ ছিল না। অন্যদিকে বেআইনি আদেশ প্রত্যাখ্যানকারী জুনিয়র সদস্যদের বিরূপ মূল্যায়ন, বদলি ও পদোন্নতি আটকে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য প্রতিবেদনের ১৪২ থেকে ১৪৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু আইনের অনুপস্থিতি নয়; প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোন আচরণ পুরস্কৃত এবং কোন আচরণ শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে, সেটিও বদলাতে হবে।

কমিশন আরও সতর্ক করেছে, গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পদে বহাল থাকলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার চাপ বা ‘ব্ল্যাকমেল’-এর লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। তাই জবাবদিহি জাতীয় নিরাপত্তার বিপরীত কোনো কিছু নয়; দায়মুক্তিই বরং নিরাপত্তার জন্য দুর্বলতা হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা; প্রয়োজন দক্ষ, পেশাদার এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ গোয়েন্দা সংস্থা, যারা জানবে তাদের ক্ষমতার সীমা কতটুকু। গোপনীয়তা তাদের কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু গোপনীয়তা কখনোই আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সম্মতি হতে পারে না। গুম কমিশনের প্রতিবেদন আমাদের সামনে অতীতের একটি ভয়াবহ চিত্র রেখেছে। এখন দায়িত্ব হলো সেই অভিজ্ঞতাকে এমন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক দমনযন্ত্রে পরিণত করতে না পারে।

  • নাফিউল আলম আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী

    ই–মেইল: nafiulalamshupto@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব