আমরা সমাজ হিসেবে রাজনীতিবিদদের খুব একটা পছন্দ করি না। আপনি একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে একটু পরিমিত কথা বলেন, কেউ একজন মুখ বাঁকিয়ে বলবে, ‘তুমি তো আজকাল একদম রাজনীতিবিদদের মতো কথা বলো।’ আবার অন্য কোথাও যদি কোনো একটি বক্তব্য একটু জোরালোভাবে দেন, কেউ বলবে আপনি রাজনীতিবিদদের মেঠো বক্তব্য চালাচ্ছেন। দুই দিকেই বিপদ। তবু বলতেই হবে, বাংলাদেশের সামনে এখন দরকার রাজনীতিবিদদের সরকার। যেখানে রাজনীতিবিদেরা পার্শ্বচরিত্র হিসেবে থাকবেন না, তাঁরাই হবেন চলচ্চিত্রের প্রধান অভিনেতা ও অভিনেত্রী।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন দ্রুত আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। একটা সময় ছিল, যখন আমরা ধরেই নিতাম, পাঁচ বছর পরপর নিয়মিত নির্বাচন হবে, এবং আমরা হেলেদুলে ভোট দিতে যাব। কিন্তু পনেরো বছরের স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী হাসিনাতন্ত্রের পতনের পর আমরা বলতেই পারি, আর কোনো কিছু এত সহজভাবে নেওয়া যাবে না।
গণতান্ত্রিক উত্তরণে আমাদের আরও পরিপক্ব হতে হবে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের পর আমরা পনেরো বছর গণতন্ত্র উপভোগ করেছি। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এই পনেরো বছরও মসৃণ ছিল না। ১৯৯৬ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের ছায়ায় কলঙ্কিত হয়েছিল। আবার ২০০৬-২০০৭ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর বিফলে গিয়েছিল জেনারেল মইন ইউ আহমেদের এক-এগারোর দখলদারিতে।
সেই হিসাবে, সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সত্যিকারের শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল শুধু ২০০১ সালে। আমাদের রাজনীতিবিদদের শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং এটিকে একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের মুকুটমণি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে শিকড় গাড়তে দিতে হলে আমাদের দরকার একের পর এক শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর, যেখানে কোনো রকম বিচ্যুতির লেশমাত্রও থাকবে না।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় আবার রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব নিতে দিতে হবে, যাঁদের প্রধান ধ্রুবতারা হবে জনগণের কল্যাণ (আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি) অথবা সুষ্ঠু নির্বাচনে পুনর্নির্বাচন (বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি)। তাঁদের মনোযোগ আর সেই পুঁজিবাদী গোষ্ঠীতন্ত্র ও কর্মকর্তাদের আঁতাতের দিকে থাকবে না, যারা সাজানো নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে পারত এবং ক্ষমতাসীনদের আবার ক্ষমতায় ফেরত আসা নিশ্চিত করত।
কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দিই। আমাদের দরকার অর্থ মন্ত্রণালয়ে একজন রাজনীতিবিদ, যিনি অন্যান্য জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র নেতাদের চোখে চোখ রেখে নতুন ব্যাংক লাইসেন্স বা বিশাল ঋণের পুনঃতফসিলের অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখবেন। গত দেড় দশকে ব্যাংকিং খাতের যে বিপর্যয় ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হলে এমন একজন মন্ত্রী অপরিহার্য, যিনি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না, যেমন দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন মরহুম সাইফুর রহমান।
আমাদের দরকার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একজন রাজনীতিবিদ, যিনি সর্বনাশা ব্যয়বহুল চুক্তিতে ‘না’ বলবেন এবং জ্বালানি খাতকে লুটপাটের টিকিট বানানোর সেই পুরোনো দিনে ফিরে যেতে দেবেন না। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে অস্বচ্ছ জ্বালানি আমদানি চুক্তির স্মৃতিগুলো আমরা এখনো ভুলিনি।
আমাদের দরকার টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে একজন রাজনীতিবিদ, যিনি অবাস্তব সাবমেরিন কেব্ল প্রকল্প, ফাইবার সম্প্রসারণ, বা ইন্টারনেট গেটওয়েতে ‘না’ বলবেন, যতক্ষণ না সেই সব প্রকল্প বাংলাদেশের মানুষের জন্য সস্তা ডেটা বা বৃহত্তর সংযোগের লক্ষ্য পূরণ করবে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ অবশ্যই দরকার, তবে সেই বিনিয়োগের সুফল দেখতে হবে যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়।
রাজনীতিবিদদের নিয়ে আমাদের হতাশা ও অনাস্থা থাকতেই পারে; কিন্তু গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই, এবং গণতন্ত্র রাজনীতিবিদ ছাড়া অচল। জুলাই আন্দোলন আমাদের একটি বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে—নতুন করে শুরু করার, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার, এবং একটি পরিণত গণতন্ত্র গড়ে তোলার। এই সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, আমাদের সবার।
এবং সবশেষে, এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী হয়তো, আমরা চাই, একজন রাজনীতিবিদ মন্ত্রীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখতে, যা প্রমাণ করবে যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও সরকারের অন্য যেকোনো মন্ত্রণালয়ের মতোই একটি মন্ত্রণালয়, এবং আমাদের সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের নীতিকে আরও সুদৃঢ় করবে। পৃথিবীর পরিণত গণতন্ত্রগুলোয় এটাই স্বাভাবিক রীতি এবং বাংলাদেশেরও এই পথে হাঁটার সময় এসেছে।
অন্য মন্ত্রীদের নেতৃত্ব দিতে আমাদের দরকার এমন একজন প্রধানমন্ত্রী, যিনি মন্ত্রিসভার যৌথ নেতৃত্বে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী হবেন। নিশ্চয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া দলের ওপর একধরনের চাপ ও একধরনের প্রলোভন দুটোই থাকবে—বিপরীত পথে যাওয়ার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে অনির্বাচিত ও জবাবদিহিবিহীন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে দেশের শাসন ও অনুমোদনের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু বানানোর এবং অধিকাংশ মন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার যদি এই পথ অনুসরণ করে, তাহলে তারা জুলাই আন্দোলনের চেতনা বুঝতে ভুল করবে।
সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদের মর্মার্থ অনুযায়ী, জনগণের ভোটে নির্বাচিত মন্ত্রিসভাই হওয়া উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উৎস। যদি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনির্বাচিত উপদেষ্টাদের হাতে অর্পণ করা হয়, হাসিনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে সেই সব ব্যক্তির ভূমিকা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, সরকার নিশ্চিতভাবে একই সমস্যার মুখোমুখি হবে, যা হাসিনাকেও বিপদে ফেলেছিল। ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন শেষ পর্যন্ত কাউকেই রক্ষা করে না।
নির্বাচিত সরকারের প্রথম পরীক্ষাগুলোর একটি হবে মন্ত্রিসভার আকার। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকার তার প্রথম টানা নেতিবাচক শিরোনামের মুখোমুখি হয়েছিল ষাট সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে। আগামী প্রধানমন্ত্রীর সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ থাকবে: মন্ত্রিসভার আকার যথেষ্ট ছোট রাখা যাতে তা প্রশংসিত হয়, এবং একই সঙ্গে এমন ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া, যাঁদের যোগ্যতা ও পেশাগত অর্জন দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করবে। মন্ত্রিসভা গঠন হবে নতুন সরকারের প্রথম বার্তা জনগণের কাছে, এবং সেই বার্তাটি যেন মানানসই হয়।
নির্বাচিত হওয়ার পরপরই, সরকারকে ২০৩১ সালের নির্বাচন পরিচালনাকারী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার রূপরেখা নিয়ে ভাবতে হবে। গণভোটের ফলাফল যা–ই হোক, হ্যাঁ জিতুক বা না জিতুক, আগামী সংসদকে একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ২০৩১ সালের নির্বাচন সফলভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হবে।
অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এ ধরনের ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত পূর্বানুমান যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা। এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন ও আচরণ নিয়ে কোনো আকস্মিক অভিঘাত থাকবে না এবং বিরোধী দল মনে করবে না যে তারা প্রতারিত হয়েছে। ২০০৬-০৭ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, অনিশ্চয়তা ও অস্বচ্ছতা কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে লাইনচ্যুত করতে পারে।
রাজনীতিবিদদের নিয়ে আমাদের হতাশা ও অনাস্থা থাকতেই পারে; কিন্তু গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই, এবং গণতন্ত্র রাজনীতিবিদ ছাড়া অচল। জুলাই আন্দোলন আমাদের একটি বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে—নতুন করে শুরু করার, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার, এবং একটি পরিণত গণতন্ত্র গড়ে তোলার। এই সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, আমাদের সবার। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আমাদের বেশি বেশি আশা করতে হবে, এবং তাদেরও সেই আশার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে।
এহতেশামুল হক ওয়াশিংটন ডিসিতে আইনজীবী এবং কোম্পানি আইনের খণ্ডকালীন অধ্যাপক
*মতামত লেখকের নিজস্ব