
সংকট আর আশঙ্কায় ঘেরা এই কঠিন বিশ্বে ব্রেক্সিটের এক দশক পর এসে ব্রিটেনের নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাস ও নিজস্ব নীতিবোধে অটল থাকার শক্তি হারানোর একটা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আমি অন্তত সেটি হতে দিতে রাজি নই। ব্রিটেন কোনো একটি সুনির্দিষ্ট নীতির পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়াবে—এই মুহূর্তে সেটি যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আমরা বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু উপযুক্ত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এসব কথা যে একেবারে অর্থহীন, তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে।
ইসরায়েলবিরোধী তকমা পাওয়ার ভয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমরা পদক্ষেপ নিতে ইতস্তত বোধ করেছি। কিন্তু আজ অত্যন্ত ভেবেচিন্তে ও লক্ষ্যভিত্তিক কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছি আমরা। এগুলো ইসরায়েলের জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং বর্তমান ইসরায়েল সরকারের অযৌক্তিক ও অন্যায্য নীতির বিরুদ্ধে।
ফিলিস্তিনের জনগণের এই অবর্ণনীয় কষ্ট বিশ্বের বিবেককে নাড়া দেয়। গাজায় নিষ্পাপ শিশুসহ অগণিত সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন। এর পাশাপাশি সেখানে চরম মানবিক সংকট চলছে, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে নামমাত্র।
গাজায় ধ্বংসলীলার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে তা কল্পনা করাও কঠিন। ইতিমধ্যে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ২০ হাজারই শিশু। কত পরিবার ও সমাজ চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে! লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন। এমনকি পুরো গাজার জনগণকে এখন তাঁদের মোট ভূখণ্ডের মাত্র এক-তৃতীয়াংশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আমি জানি, যুক্তরাজ্যের মানুষের মন এই ইস্যুতে কতটা কাঁদে; আমার অনুভূতিও ঠিক একই রকম।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেও আমি বলেছিলাম, ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমাদের দেশের পদক্ষেপ ছিল ধীরগতির এবং যা করা হয়েছে তা একেবারেই যথেষ্ট নয়। সে কারণেই আমি সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছিলাম।
এই নারকীয় ভোগান্তি যখন দিন দিন বাড়ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার একমাত্র আশা ‘দ্বিরাষ্ট্রনীতি’ যখন হুমকির মুখে পড়ছে, তখন আমি আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।
গত ২০ বছরে যে পরিমাণ অবৈধ বসতি স্থাপন করা হয়েছিল, এই ইসরায়েল সরকারের মাত্র চার বছরের শাসনামলেই তার চেয়ে বেশি বসতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে চলতি বছরই দেড় হাজারের বেশি বসতি স্থাপনকারী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইসরায়েল সরকার এ পর্যন্ত ১০৪টি নতুন অবৈধ বসতির অনুমোদন দিয়েছে। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনের আগেই তারা ‘ই-ওয়ান’ নামের এক বিশাল বসতি প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করে দেবে, যা একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে একেবারে ধূলিসাৎ করে দেবে। এটি কোনোভাবেই হতে দেওয়া যায় না।
এ কারণেই ইসরায়েল সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আমরা কঠোর কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছি:
প্রথমত, ফিলিস্তিনের দখলকৃত জায়গায় স্থাপিত অবৈধ বসতির সঙ্গে সব ধরনের পণ্য বাণিজ্য আমরা নিষিদ্ধ করব।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায়ের সঙ্গে সংগতি রেখে এবং নিজস্ব পর্যালোচনার ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করছে যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারত্ব সম্পূর্ণ বেআইনি।
তৃতীয়ত, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই অবৈধ বসতি স্থাপনে সহায়তা করবে, সুবিধা দেবে বা লাভবান হবে, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। এর আওতায় থাকবে ‘ই-ওয়ান’ প্রকল্পের নির্মাণকাজে জড়িত সব ব্যবসা ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও।
এর পাশাপাশি গাজার মানুষের জন্য অতি জরুরি একগুচ্ছ ত্রাণসামগ্রী ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণাও দিচ্ছি আমরা।
আমরা এই পদক্ষেপগুলো নিচ্ছি কেবল একটি কারণে—কারণ, এটাই সঠিক পথ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের চালানো সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা আমি আগেই জানিয়েছি এবং এখনো জানাচ্ছি। কিন্তু সেই ঘটনার অজুহাতে গাজা বা পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকার যা করছে, তা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।
আমাদের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য অবৈধ বসতি বন্ধ করা এবং ইসরায়েল সরকারকে সঠিক পথে ফেরাতে তাদের ওপর চাপ বাড়ানো। আমরা পুরো ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছি না। কারণ, এতে ইসরায়েলের সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেওয়া হবে, যাদের অনেকেই আবার তাঁদের নিজেদের সরকারের এই নীতির ঘোর বিরোধী।
ইসরায়েল সরকারের কর্মকাণ্ডের জন্য সাধারণ ইসরায়েলিরা দায়ী নন। ঠিক তেমনি যুক্তরাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়ও এর জন্য দায়ী নয়। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের দোষে ব্রিটেনের ইহুদিদের দোষ দেওয়া সম্পূর্ণ ভুল ও অন্যায়। এটি পরিষ্কারভাবেই ইহুদিবিদ্বেষ বা অ্যান্টিসেমিটিজম।
গত সপ্তাহেই আমি ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। প্রতিদিন তাঁরা কী ধরনের আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, তা আমি বুঝি। আমার সরকার তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে ইহুদিবিদ্বেষ নির্মূল করতে সম্ভাব্য সবকিছুই করবে।
আজ আমরা যেসব পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছি, তার উদ্দেশ্য একটাই—ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মানুষ যাতে পাশাপাশি দুটি স্বাধীন ও নিরাপদ রাষ্ট্রে শান্তিতে বাস করতে পারে, সেই একমাত্র সম্ভাব্য পথটিকে টিকিয়ে রাখা। যুক্তরাজ্যের কোটি কোটি মানুষও মন থেকে এটাই চান। বিশ্বজুড়ে আমাদের সহযোগী দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সেই শান্তির আশাকে বাঁচিয়ে রাখতে আমার সরকার কাজ করে যাবে।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত