পরীক্ষার হলে বসে তাঁরা যখন শুনলেন যে, পরীক্ষা হবে না, এ সময় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মানোটা খুব স্বাভাবিক।
পরীক্ষার হলে বসে তাঁরা যখন শুনলেন যে, পরীক্ষা হবে না, এ সময় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মানোটা খুব স্বাভাবিক।

মতামত

সরকারি চাকরির পরীক্ষা কেন ঢাকাতেই নিতে হবে?

চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষার হলে বসেছেন। ওএমআর ফরম পূরণ করতে শুরু করেছেন। এর মধ্যে শুনলেন, ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রিলিমিনারি দিতে ঢাকায় আসেন প্রায় সোয়া তিন লাখ প্রার্থী। দেশের সব কটি জেলা থেকেই তাঁদের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ঢাকায় আসতে হয়েছে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে যে যেভাবে পেরেছেন, এসেছেন। দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসা–যাওয়া ও থাকা–খাওয়া মিলিয়ে তাঁদের ভালো অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে।

পরীক্ষার হলে বসে তাঁরা যখন শুনলেন যে, পরীক্ষা হবে না, এ সময় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মানোটা খুব স্বাভাবিক। পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণও দাবি করেন।

পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা বাংলাদেশের ক্রনিক অসুখের মতো একটি বিষয়। বিগত আওয়ামী লীগ আমলের একপর্যায়ে এসে এটি অনেকটাই মহামারির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। প্রাথমিকের ভর্তি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা, বিসিএসসহ সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস রীতিমতো অতি মুনাফাদায়ী পেশায় পরিণত হয়েছিল। চিকিৎসা পেশা বাদ দিয়ে কোচিং আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রে নাম লেখানোর ঘটনাও দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলের পাতি ছাত্রনেতা, ব্যর্থ চাকরিপ্রার্থী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়–দপ্তরের গাড়িচালক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা—সবাই মিলেমিশে একেকটা প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্র তৈরি করতে আমরা দেখেছি।

চব্বিশের জুলাইয়ে আবেদ আলী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। দুই হাতে, কাঁধে ও মাথায় চার পোষা পাখি নিয়ে তাঁর একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল।

পিএসসির গাড়িচালক আবেদ আলী তো রীতিমতো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কিংবদন্তিতুল্য। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আবেদ আলী চক্রকে গ্রেপ্তার করেছিল সিআইডি পুলিশ। তাঁর ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। ঢাকার উত্তরায় একটি ছয়তলা বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট ও একটি গাড়ি এবং গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের ডাসারে ডুপ্লেক্স বাড়ি করেছিলেন। ছেলে, স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনদের নামেও ছিল কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

একজন গাড়িচালক যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস করে অর্ধ শতকোটিপতি হয়ে যেতে পারেন, তাহলে অন্যরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকবেন কেন? প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের কাছে একসময় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। হাতের ঘড়ি ও কানের ভেতরে ছোট ইলেকট্রিক ডিভাইসের মাধ্যমে লাইভ উত্তর দিয়ে দেওয়া হতো। তবে বারবার ধরা পড়ায় বিবর্তনের উল্টো পথ ধরেছিল তারা।

প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, আবেদ আলী চক্র ফাঁস করা প্রশ্ন সারা রাত ধরে মুখস্থ করিয়ে তারপর প্রার্থীদের পরীক্ষার হলে পাঠাতেন। চুক্তিবদ্ধ প্রার্থীদের জন্য হোটেল ও রিসোর্ট ভাড়া করত তারা। শর্ত থাকত যে মুঠোফোনসহ কোনো ধরনের ডিভাইস আনা যাবে না।

বর্তমানে বিসিএসের প্রিলিমিনারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কিছু ভর্তি পরীক্ষা খুলনা, রাজশাহীসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা তো বহু বছর ধরেই নিজ নিজ জেলা শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাহলে সরকারি চাকরির পরীক্ষা কেন ঢাকায়ই নিতে হবে?

চব্বিশের জুলাইয়ে আবেদ আলী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। দুই হাতে, কাঁধে ও মাথায় চার পোষা পাখি নিয়ে তাঁর একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল। আড়াই বছর পার হওয়ার পরও আবেদ আলীর বিচার কি হয়েছে?

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইনে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র বা প্রশ্নসংবলিত তথ্য যেকোনো উপায়ে ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণ করা হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর অনেকেই এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে কঠোর শাস্তির কথা তুলেছেন। তবে আইন যথেষ্ট কঠোর হোক অথবা কিছুটা নরম হোক—মূল প্রশ্ন হলো, অপরাধীদের সাজা হচ্ছে কি না। আলোচিত আবেদ আলী চক্র বা অন্য কোনো চক্রের লোকদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধ বন্ধ করা যাবে না।

পত্রিকার খবরে দেখা যাচ্ছে যে, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। এর অর্থ, একটা চাকরির জন্য প্রায় ১ হাজার ৩১৮ প্রার্থীকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। বর্তমানে যেকোনো সরকারি চাকরির জন্যই কমবেশি এমন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি পাবনা জেলা পরিষদ কার্যালয়ে অফিস সহকারী বা এমএলএসএস বা পিয়নের ১৮টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। জাতীয় বেতন স্কেলে এই পদ ২০তম গ্রেডের। যাঁরা আবেদন করেন, তাঁদের কেউ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, কেউবা এমবিএ কিংবা অন্যান্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাস। এই পদে যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ১৭ জনই উচ্চশিক্ষিত।

গত জুনে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণি পদে চাকরির জন্য আবেদন করেন ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৯ জন। পদ ছিল ৩১২ জনের। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে লড়বেন ৩ হাজার ৯৫৬ জন।

গত কয়েক দশকে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স। বেসরকারি খাত অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেও দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে রয়েছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না। দেশের শ্রমবাজারের কথা চিন্তা না করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিস্তার হওয়ায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের জন্য শোভন চাকরি যেন সোনার হরিণ হয়ে উঠেছে। আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার।

রূঢ় বাস্তবতা হলো, প্রতিবছর ২৪ থেকে ২৫ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও সরকারি খাতে কর্মসংস্থান হয় সর্বোচ্চ ২–৩ শতাংশের। সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে একধাপে বেতন–ভাতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরির বেতন–ভাতা বাজারের বিবেচনায় শোভন; আছে চাকরির নিশ্চয়তা। এর বাইরে ৩৫–৪০ শতাংশ তরুণকে প্রবাসের শ্রমবাজারে জীবিকা খুঁজে নিতে হয়। বেসরকারি খাতে যাঁরা চাকরি পান, তাঁদের কত শতাংশের শোভন বেতন–ভাতা ও চাকরির নিশ্চয়তা আছে?

লাখ লাখ বেকার ও জীবন চালাতে হিমশিম খাওয়া তরুণ যেকোনো দেশ, যেকোনো সরকারের জন্যই বারুদের স্তূপের ওপর বসে থাকার মতো ব্যাপার। যেকোনো পরিস্থিতিতেই তার বড় বিস্ফোরণ হতে পারে। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যুব উন্নয়নের প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রকে অবশ্যই ধরতে হবে এবং শাস্তির নজির স্থাপন করতে হবে।

বেতন–ভাতা আগের চেয়ে অনেক আকর্ষণীয় হওয়ায় ও চাকরির নিশ্চয়তার কারণে সরকারি চাকরিতে সামনের দিনে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। যেখানে এখনই একেকটা বিজ্ঞাপনের বিপরীতে ৩ লাখ ও ১২ লাখ আবেদন করছেন, সেটা সামনে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা কল্পনার বাইরে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সবাইকে ঢাকায় আনাটা কোনোভাবেই যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত নয়। পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ঢাকায় আসা–যাওয়া ও থাকা–খাওয়ার খরচের বাইরেও একবারে যখন কয়েক লাখ মানুষকে ঢাকামুখী হতে হয়, তাতে যানবাহনের ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ে। যানজট বা অন্য কোনো কারণে অনেকের পক্ষে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব না–ও হতে পারে। ফলে চাকরির পরীক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি সরকারের গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তাভাবনা করা দরকার।

বর্তমানে বিসিএসের প্রিলিমিনারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কিছু ভর্তি পরীক্ষা খুলনা, রাজশাহীসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা তো বহু বছর ধরেই নিজ নিজ জেলা শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাহলে সরকারি চাকরির পরীক্ষা কেন ঢাকায়ই নিতে হবে?

ঢাকার সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলো ও বড় জেলা শহরগুলোয় পরীক্ষা নেওয়া হলে চাকরিপ্রার্থীদের সময়, খরচ ও ভোগান্তি—সব বাঁচবে।

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

monoj.dey@prothomalo.com