রাজশাহীতে ‘ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট’ নামের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আজ রোববার সকালে নগরীর কুমারপাড়ায় গুল গফুর ফিলিং স্টেশনে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক
রাজশাহীতে ‘ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট’ নামের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আজ রোববার সকালে নগরীর কুমারপাড়ায় গুল গফুর ফিলিং স্টেশনে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক

মতামত

তেল সরবরাহের যে সমাধান সরকার এখনো দেখছে না

ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রহর গুনেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি তেল। অথচ এই তীব্র হাহাকারের বিপরীতে সরকারের তরফ থেকে দেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য।

নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, বাংলাদেশের হাতে নাকি এখন সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে! তাঁদের দাবি, দেশের এই মজুত দিয়ে অনায়াসেই আগামী কয়েক মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

মাঠের বাস্তবতা আর সরকারি দাবির এমন বিপরীত অবস্থান অবধারিতভাবেই একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়—তেলের মজুত যদি আসলেই এতটা পর্যাপ্ত থাকে, তবে সেই তেল যাচ্ছে কোথায়? বাস্তবের চরম ভোগান্তির দিকে তাকালে এই প্রশ্নের সদুত্তর মেলা ভার। কথা ও বাস্তবের এই দুস্তর ব্যবধানের কারণে সরকারি এসব আশ্বাসের ওপর সাধারণ মানুষ আজ স্বভাবতই আর ভরসা রাখতে পারছে না।

পেছনে তাকালে দেখা যায়, এই সংকটের শুরুতে প্রশাসন কেবল একটি নয়, বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথম ভুলটি ছিল তেলের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা। তাদের ধারণা ছিল, রেশনিং করলে মজুত টিকবে।

সবচেয়ে বেদনার কথা হলো, তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে কৃষকের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনাও আমাদের দেখতে হয়েছে। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সেচের জন্য ডিজেল নিতে গিয়ে একজন অন্নদাতার প্রাণ চলে যাওয়া একটি স্বাধীন দেশের ব্যবস্থাপনার জন্য চরম লজ্জার বিষয়।

বাইকে কম করে তেল দেওয়া হবে। কিন্তু এটি আসলে সমাধানের চেয়ে বরং সমস্যা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রেশনিংয়ের কারণে একজন মোটরসাইকেল বা গাড়িচালককে অল্প পরিমাণ তেল দেওয়া হতো। ওই সামান্য তেল বেশি সময় কাজে লাগত না।

ফলে চালকদের বাধ্য হয়ে দ্রুতই আবার পাম্পের লাইনে এসে দাঁড়াতে হয়েছে। একইভাবে রেশনিংয়ের ফাঁদে পড়ে প্রত্যেককেই নিয়মিত বা প্রতিদিন লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। এভাবেই পাম্পগুলোর সামনে জ্যাম এবং সারি লম্বা হতে শুরু করে।

অথচ পরিস্থিতি অনুযায়ী যদি রেশনিং পদ্ধতি না করা হতো, পাম্পের সক্ষমতা অনুযায়ী গাড়িগুলোকে শুরুতেই ট্যাংক ভরে তেল দিয়ে দেওয়া হতো, তবে এই জট তৈরি হতো না। মানুষ অন্তত বেশ কয়েক দিন আর তেল নেওয়ার জন্য আসত না, তাদের মধ্যে কোনো আতঙ্কও কাজ করত না।

মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার চালক নাজিম উদ্দিন রাজারবাগ ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য লাইনে অপেক্ষা করছেন। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শহীদবাগে

প্রশাসনের দ্বিতীয় বড় ভুলটি ছিল শুরুর দিকে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে শেষ পর্যায়ে এসে তা বাড়ানো। শুরুতে দাম অপরিবর্তিত রেখে সরকার হয়তো সাময়িকভাবে জনগণের মন জোগাতে চেয়েছিল।

সরকার হয়তো ভেবেছিল, দাম বাড়ালে মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্তই কাল হয়ে দাঁড়াল। কারণ, বৈশ্বিক অবস্থা বুঝে দেশি অসাধু ব্যবসায়ীরা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে সামনে দাম বাড়বে।

দাম অপরিবর্তিত রাখার কারণে তাঁরা ভবিষ্যৎ মুনাফার লোভে তেল কিনে ব্যাপকভাবে মজুত করা শুরু করলেন। সরকার যদি শুরুতেই বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিয়ে দাম বাড়াত, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীরা মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির এই ফায়দা লুটতে পারত না।

শুরুতেই দাম বাড়ালে হয়তো সাধারণ মানুষের পকেট থেকে লিটারপ্রতি ১৫-২০ টাকা বেশি যেত। কিন্তু লোকপ্রিয়তার আশায় সেই দাম না বাড়ানোর মাশুল সাধারণ মানুষকে কীভাবে দিতে হলো? তাদের শত শত অমূল্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে রাস্তায় আর তেলের পাম্পে দাঁড়িয়ে থেকে। শুধু তা-ই নয়, এই তেল জোগাড়ের অমানবিক দৌড়ঝাঁপে তেলের লাইনেই চলে গেছে মানুষের জীবন।

সরকারের প্রতি অনুরোধ, দ্রুত প্রতিটি উপজেলায় অস্থায়ী পাম্প চালুর নির্দেশ দিন। এটিই হতে পারে সাধারণ মানুষ ও দেশের জ্বালানি খাতকে অস্থিরতার হাত থেকে বাঁচানোর কার্যকর পথ।

মাঠপর্যায়ের এই অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও ভোগান্তির সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন গ্রামবাংলার প্রান্তিক কৃষকেরা। ডিজেলের তীব্র অভাবে মাঠে সেচের বিশাল সংকট তৈরি হয়েছে। কৃষকের বোরো ধান বা ফসলের জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। পানির অভাবে ফসল মরতে বসেছে। অথচ সেচের পাম্প চালানোর জন্য একটু ডিজেল তাঁরা পাচ্ছেন না। তেল জোগাড় করতে পাম্পে পাম্পে ঘুরে তাঁরা আজ নিঃস্ব প্রায়।

সবচেয়ে বেদনার কথা হলো, তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে কৃষকের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনাও আমাদের দেখতে হয়েছে। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সেচের জন্য ডিজেল নিতে গিয়ে একজন অন্নদাতার প্রাণ চলে যাওয়া একটি স্বাধীন দেশের ব্যবস্থাপনার জন্য চরম লজ্জার বিষয়।

শুধু কি কৃষক? পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ সারতে গ্রামগঞ্জের গৃহবধূরাও এখন গ্যালন হাতে জ্বালানি তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে, তবু গৃহবধূরা লাইন ছেড়ে যেতে পারছেন না। আরেক দিকে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা।

দিন শেষে তেল না পেয়ে যখন মানুষ বাধ্য হয়ে রাতের অন্ধকারেও লাইনে অপেক্ষা করছেন, তখন তাঁদের নতুন বিপত্তি জুটছে। তেলের দীর্ঘ সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত মানুষকে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাও আমাদের দেখতে হয়েছে।

এই চরম ভোগান্তি ও মজুতদারির সুযোগে জন্ম নিয়েছে কিছু ‘মৌসুমি ব্যবসায়ী’। তারা ভোরে বাইক বা অন্য কোনো উপায়ে গ্যালন নিয়ে বের হয়। সারা দিন পাম্পে পাম্পে ঘুরে তেল সংগ্রহ করে। এরপর সেই তেল নিজ এলাকায় চড়া দামে বিক্রি করে। ১২০ টাকার তেল খোলা বাজারে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকলেও তাঁদের শক্ত কোনো ভূমিকা চোখে পড়ে না। প্রভাবশালী বা বাড়তি টাকা দেওয়া লোকেরা লাইনের তোয়াক্কা না করেই তেল নিয়ে যাচ্ছেন। আর যাঁরা নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁরা দিনের পর দিন কেবল অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

এই দুঃসহ অবস্থার কি কোনো সমাধান নেই? কেবল জরিমানা বা দুই-চারটি অভিযান দিয়ে এর সুরাহা হবে না। সাধারণ মানুষের ‘প্যানিক বাইং’ ও হাহাকার থামাতে হলে এখন দৃশ্যমান এবং কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো, প্রতিটি উপজেলায় অন্তত তিনটি করে অস্থায়ী তেলের পাম্প নির্মাণ করা।

সরকার এবং বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি উপজেলার ফাঁকা মাঠে এই অস্থায়ী ফিলিং পয়েন্ট স্থাপন করতে পারে। প্রয়োজনে তেল বহনকারী লরি বা ট্যাংকারগুলোকেই সরাসরি অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে মূল পাম্পগুলোর ওপর পড়া বিশাল চাপ মুহূর্তের মধ্যেই কমে আসবে।

এই অস্থায়ী পাম্পগুলোতে কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া যায়। তাঁরা যাতে কৃষি অফিসারের স্লিপ দেখিয়ে সরাসরি তেল নিতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকলে তাঁদের জীবন বাজি রেখে লাইনে দাঁড়াতে হবে না।

পাশাপাশি সরাসরি তদারকি থাকায় দালাল চক্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে সুবিধা লুটতে পারবে না। হাতের কাছে তেল পেলে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক দূর হবে, তারা ঘরে মজুতও করবে না।

খাতায়-কলমে মজুত থাকাই শেষ কথা নয়, তা সুশৃঙ্খলভাবে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে এমন দক্ষতা দেখানোই প্রশাসনের পারদর্শিতার প্রমাণ। সরকারের প্রতি অনুরোধ, দ্রুত প্রতিটি উপজেলায় অস্থায়ী পাম্প চালুর নির্দেশ দিন। এটিই হতে পারে সাধারণ মানুষ ও দেশের জ্বালানি খাতকে অস্থিরতার হাত থেকে বাঁচানোর কার্যকর পথ।

  • সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

    ই-মেইল: shoikotamin@yahoo.com

    *মতামত লেখকের নিজস্ব