মতামত

ফ্যামিলি কার্ড খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও নারীর ক্ষমতায়নে যে ভূমিকা রাখবে

বাংলাদেশ গত দুই দশকে দারিদ্র্য হ্রাসে অগ্রগতি অর্জন করলেও চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে এখনো প্রায় ১৮-১৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং চরম দারিদ্র্যে রয়েছে প্রায় ৫-৬ শতাংশ মানুষ।

একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং আরও বড় একটি জনগোষ্ঠী খাদ্য ও পুষ্টির অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে।

দারিদ্র্য ও খাদ্য সংকটের এই বাস্তবতা পরিবারের ভেতরে সমানভাবে আঘাত হানে না; নারী ও শিশুরাই সাধারণত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ফ্যামিলি কার্ড কেবল দারিদ্র্য হ্রাসের একটি হাতিয়ার হবে না; এটি হতে পারে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি, যেখানে নারীর হাতে শক্তি তুলে দিয়ে একটি সুস্থ, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

আয়ের সংকট দেখা দিলে পরিবারের খাবার কমে গেলে প্রথমে নিজের খাবার কমিয়ে দেন মা, আর পুষ্টির ঘাটতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করে শিশু। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী মা, স্তন্যদানকারী নারী এবং ছোট শিশুদের জন্য অপুষ্টি এখনো একটি নীরব কিন্তু গভীর সংকট, যার প্রতিফলন দেখা যায় শিশুদের খর্বাকৃতি ও অপুষ্টির উচ্চ হারে।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগটি কেবল একটি সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি উন্নয়ন এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি সমন্বিত কাঠামো হিসেবে ভাবা হয়েছে।

এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যদের হাতে সহায়তার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া, যাতে তারা পরিবারের খাদ্য ও আর্থিক সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুষ্টির চ্যালেঞ্জ এখনো গুরুতর। দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ২৩ শতাংশ খর্বাকৃতির, যা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির ফল। একই সঙ্গে অনেক গর্ভবতী ও প্রজনন-বয়সী নারী অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন, যা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং জন্মের পর শিশুর অপুষ্টির সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করে।

খর্বাকৃতি কেবল উচ্চতার সমস্যা নয়; এটি মূলত মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়ার একটি সূচক। জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর মস্তিষ্কের গঠন, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে স্কুলে শেখার সক্ষমতা কমে যায়, দক্ষতা অর্জন সীমিত হয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আয় করার সক্ষমতাও কমে যায়।

ফলে অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপর গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

এখানেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কেবল একটি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি নয়; বরং এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা উদ্ভাবন।

প্রচলিত সামাজিক ভাতা কর্মসূচির মতো শুধুমাত্র ভোগব্যয়ের জন্য নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থ বা খাদ্য সহায়তা সরাসরি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী প্রধানের হাতে প্রদান করা হবে, যাতে তিনি ধীরে ধীরে সঞ্চয় গড়ে তুলে পরিবারকে আরও আত্মনির্ভর করে তুলতে পারেন।

একই সঙ্গে, সঠিকভাবে নকশা করা হলে এই কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে শুধু খাদ্য সহায়তা দেওয়া নয়, বরং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের নিশ্চয়তাও দেওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, আয়রন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ ফর্টিফায়েড চাল ও গমের আটা, ভিটামিন এ ও ডি সমৃদ্ধ ফর্টিফায়েড ভোজ্য তেল, মৌসুমি ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ সবজি, এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য যেমন ডাল।

এই ধরনের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করলে পরিবারগুলো শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের সুযোগ পাবে, যা বিশেষ করে নারী, গর্ভবতী মা এবং ছোট শিশুদের পুষ্টি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে পুষ্টি উন্নয়নের জন্য শুধু খাদ্য বিতরণ যথেষ্ট নয়। সচেতনতা এবং আচরণগত পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ডের একটি উদ্ভাবনী দিক হতে পারে কার্ডধারী পরিবারের কাছে মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক বার্তা পাঠানো।

বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা এবং দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রদান করলে অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এভাবে ফ্যামিলি কার্ড একটি ডিজিটাল পুষ্টি সহায়তা প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করতে পারে—যেখানে খাদ্য সহায়তা, পুষ্টি শিক্ষা এবং আচরণগত পরিবর্তন একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।

বর্তমানে এই কর্মসূচি দেশের কয়েকটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। এই পাইলট পর্যায়ে দুটি ভিন্ন পদ্ধতি পরীক্ষা করা হবে, যাতে বোঝা যায় কোনটি বাস্তবে বেশি কার্যকর ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য।

প্রথম পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের পরিবারকে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা (ডিরেক্ট ক্যাশ ট্রান্সফার) প্রদান করা হবে। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে সমপরিমাণ মূল্যমানের খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে, যার মধ্যে চাল, গমের আটা, ভোজ্য তেল, লবণ, আলু ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে এই ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি খাদ্য সংগ্রহ বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে না। এর পরিবর্তে ফ্যামিলি কার্ডধারীরা নির্ধারিত দোকান থেকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যপণ্য ক্রয় করবেন এবং সেই মূল্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি কার্ড থেকে পরিশোধ করা হবে।

এই পদ্ধতির মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাকেও সক্রিয় রাখা যাবে। পাইলট পর্যায়ে এই দুটি পদ্ধতির বাস্তব অভিজ্ঞতা, মানুষের পছন্দ এবং বাস্তবায়নের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ দ্রুত দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হবে।

তবে যেকোনো বড় সামাজিক কর্মসূচির মতো এখানেও একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে—গুজব ও ভুল তথ্যের বিস্তার। ইতিহাস বলছে, যখন কোনো উদ্যোগ দরিদ্র মানুষের ক্ষমতায়ন এবং বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করে, তখন কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন একটি রাজনৈতিক ধারা ও মতাদর্শও রয়েছে যারা নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান এবং আত্মনির্ভরতার ধারণার বিরোধিতা করে। ফলে এই ধরনের উদ্যোগকে দুর্বল করার জন্য তারা ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব, অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে পারে। তাই ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচিকে সফল করতে হলে জনগণকে সচেতন থাকতে হবে এবং যেকোনো ধরনের অপপ্রচার বা ভ্রান্ত তথ্যের বিরুদ্ধে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

এই কারণে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা অন্য কোনো গোষ্ঠী যদি গুজব ছড়িয়ে এই কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে, তবে নাগরিকদের সচেতন ও সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি ভাতা নয়; এটি নারীর মর্যাদা, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা এবং শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত একটি জাতীয় উদ্যোগ।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রবর্তিত ‘ফুড ফর এডুকেশন’ কর্মসূচি লাখ লাখ শিশুকে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের, স্কুলমুখী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেই কর্মসূচি শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ায়নি, বরং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

আজকের প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড সেই ঐতিহ্যেরই একটি আধুনিক রূপ—যেখানে খাদ্য সহায়তা, পুষ্টি উন্নয়ন এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন একসঙ্গে অগ্রসর হবে, এবং যার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ফ্যামিলি কার্ড কেবল দারিদ্র্য হ্রাসের একটি হাতিয়ার হবে না; এটি হতে পারে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি, যেখানে নারীর হাতে শক্তি তুলে দিয়ে একটি সুস্থ, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

  • ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)