চলতি মৌসুমে পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন উন্মুক্ত করার পর দেড় মাস শেষ হয়ে গেছে। এতে কার লাভ কার ক্ষতি হলো, আজ সেটা আলোচনা করা যাক।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। পর্যটকদের কাছে অন্যতম পছন্দের গন্তব্য এ দ্বীপ। একসময় অনিয়ন্ত্রিত ও অবাধ পর্যটনের সুযোগ থাকলেও ২০২৪ সাল থেকে সরকার এখানে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ ও সীমিতকরণ করেছে। মূলত পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ ও দূষণ রোধের জন্য সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
দৈনিক দুই হাজার পর্যটক সীমিতকরণ ও মাত্র দুই মাস (ডিসেম্বর ও জানুয়ারি) পর্যটকদের দ্বীপে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। নভেম্বর মাসে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও রাত্রিযাপনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সে মাসে কোনো পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেননি। কারণ শুধু দিনে গিয়ে দিনে ফেরত আসার জন্য এত ব্যয়বহুল ভ্রমণ কোনো বোকারই করার কথা না।
সরকারি কঠোর বিধিনিষেধ ও সংরক্ষণ নীতিমালার কারণে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এবং দ্বীপের স্থানীয় মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে। সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে বাস্তবতা তুলে ধরতেই মূলত এই লেখা।
কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করার পরও দ্বীপের পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি যত্রতত্র অনিয়ন্ত্রিত কটেজ নির্মাণ ও কেয়াগাছ নিধন। কার্যকর ময়লা ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়নি। বরং সৈকত ও রাস্তার আশপাশের জায়গা প্লাস্টিক–পলিথিনের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সৈকতে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নেই। পর্যটকদের সচেতনতার কোনো প্রচারণা নেই।
জাহাজ চলাচল করছে কক্সবাজার নুনিয়ার ছড়া ঘাট থেকে। ফলে জাহাজ ছাড়ার বিষয়টি বাঁকখালী নদীর জোয়ার ভাটার ওপর নির্ভর হয়ে গেছে। দেখা গেছে, একদিন দুপুর ১২টায় জাহাজ পৌঁছাচ্ছে কিন্তু বিকেল ৫টা বা সন্ধ্যা ৬টায় জাহাজ ফিরছে। এই দীর্ঘ সময় পর্যটকদের ঘাটে অপেক্ষা করতে হলেও তাঁদের জন্য সরকার বিশেষ কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। ঘাটে আসা-যাওয়া পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য যাত্রী ছাউনি বা বিশ্রামাগার নাই। পাবলিক টয়লেট ও চেঞ্জিং রুম নেই। এমনকি শিশুদের ফিডিংয়ের ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই।
তীব্র ঠান্ডায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছোট শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও নারীদের জাহাজের অপেক্ষায় রাস্তায় বা সৈকতে বসে বা হাঁটাহাঁটি করে পার করতে হয়! এই অমানবিক পরিস্থিতি কখনো কখনো চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
দূরত্ব ও সীমিত আসনের কারণে জাহাজের ভাড়া বেড়েছে। কিন্তু টিকিট সহজলভ্য হয়নি। মধ্যস্বত্বভোগী বা টিকিট সিন্ডিকেটের সৃষ্টি হয়েছে।
এবার সবচেয়ে বাজে যে ব্যবস্থা হয়েছে সেটা হলো, ট্যুর অপারেটর, সাংবাদিক, বিনিয়োগকারী ও কক্সবাজারের স্থানীয় লোকজনের জন্য ট্রাভেল পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটা অযৌক্তিক। কারণ, পর্যটকদের জন্য ট্রাভেল পাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
যেসব ট্যুর গাইড বা হোস্ট অথবা ট্যুর অপারেটর কখনো ট্যুরিস্ট হিসেবে যান না, তাঁদের জন্য বিশেষ নিবন্ধন করে একটা একটা পাস দিলে আর ঝামেলা হয় না। আর যাঁরা দ্বীপে বিনিয়োগ করছেন, নানা প্রয়োজনেই তাঁদের নিয়মিত দ্বীপে ঢুকতে হয়। কিন্তু তাঁদেরও ট্রাভেল পাস নিয়ে জাহাজে উঠতে দেওয়া ব্যবস্থা এবং সাংবাদিক ও অন্য যেসব ব্যক্তি ভ্রমণ ছাড়া প্রতিবেদন বা গবেষণার জন্য যান, তাঁদেরও ট্রাভেল পাস করে পর্যটক হিসেবে গণ্য করা যুক্তিসংগত নয়।
কক্সবাজার জেলার অনেক মানুষের সেন্ট মার্টিনে আত্মীয় আছে বা ব্যবসায়িক অথবা ব্যক্তিগত অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে, তাঁরা প্রয়োজনে সেন্ট মার্টিনে যেতে চাইলে তাঁদের ট্রাভেল পাসের আওতায় ফেলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ ট্যুরিস্ট হিসেবে দেখা হয়। এটা স্থানীয় মানুষের অধিকার অস্বীকার করার পর্যায়ে পড়ে। এটা নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে অনেক ক্ষোভ দেখা গেছে। কিন্তু প্রশাসনের একগুঁয়ে আচরণের কারণে কক্সবাজারের মানুষ পর্যটক না হওয়ার পরও পর্যটক হিসেবে সেন্ট মার্টিনে যাতায়াত করতে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করলে বলা যায়, করুণ থেকে চরম শোচনীয় আকার ধারণ করছে। সাড়ে বারো হাজার মানুষের অন্যতম আয়ের উৎস পর্যটন। কিন্তু সেটা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে দ্বীপের মানুষ আয়ের উৎস হারিয়ে কর্মহীন হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসাবাড়ি যেগুলো পর্যটন মৌসুমে ভাড়া দিয়ে সংসার চলত, এখন সেখানে কোনো আয় নেই। পর্যটকের সংখ্যা দুই হাজারে সীমিত করার কারণে, পর্যটকদের তেমন চাপ নেই; ফলে স্থানীয় বাসাবাড়ি ভাড়া হয় না।
সৈকতের আশপাশে বা ভালো মানের রিসোর্টগুলোয় চার হাজারের বেশি থাকার ব্যবস্থা আছে। আর সীমিত করার কারণে সৈকতপারের রিসোর্টগুলো স্পেশাল অফার বা ডিসকাউন্ট দেওয়ার কারণে পর্যটকেরা সেখানেই ওঠেন। এ ছাড়া বড় বড় রিসোর্ট ও ভালো মানের রিসোর্টগুলো পরিচালনা করেন ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী। তাঁদের ভালো প্রচার ও পরিচিতি থাকার কারণে সৈকতপারের রিসোর্টগুলো আগেই বুকিং হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় লোকজনের অগোছালো, নিম্নমানের রিসোর্ট ও নামমাত্র সার্ভিস এবং প্রচারহীন প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো পর্যটক পায় না।
আমি দেখেছি, দ্বীপের স্থানীয় লোকজনের বাসাবাড়ি যেগুলো ভাড়া দেয়, সেগুলোর অর্ধেকেরই কোনো রুম এ মৌসুমে ভাড়া হয়নি। দিতে পারেনি। ফলে স্থানীয় লোকজনের আর্থিক চাপ অবর্ণনীয় নজিরের সৃষ্টি হয়েছে। ২ মাস ব্যবসা করে ১০ মাস আয়হীন মানুষের বর্তমান ঊর্ধ্বগামী দ্রব্যের বাজারে ঘরসংসার চালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
স্থানীয় মানুষের ওপর অতিমাত্রায় আর্থিক চাপ দেওয়া ছাড়া এ সীমিতকরণ ও নিয়ন্ত্রিত পর্যটন কোনো উপকারে আসেনি। স্থানীয় মানুষ একপ্রকার বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি বা অলংকার ইত্যাদি বিক্রি করে চলছে। উন্নত প্রযুক্তি ও জায়গায় অভাবে মৎস্য আহরণ ও কৃষি খাতে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ অনেক পিছিয়ে। ছোট নৌকা দিয়ে মৎস্য আহরণ করতে গভীর সমুদ্রে যাওয়া সম্ভব নয়। আর দ্বীপের আয়তন অনেক ছোট হওয়ার কারণে চাষবাসের সুযোগ সীমিত। এ ছাড়া লবণাক্ততার কারণেও চাষাবাদ হয় না।
অর্থনৈতিক অচলাবস্থার কারণে দ্বীপের শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে গেছে। দ্বীপের স্কুলে শিক্ষক বা দক্ষ শিক্ষক না থাকার কারণে পড়ালেখা এমনিতেই দুর্বল। কিন্তু এখন আর্থিক দৈন্যদশার কারণে তারা যে বাইরে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে, সে সুযোগও নেই।
এ ছাড়া দ্বীপে পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র নেই। টেকনাফে গিয়ে মাসে মাসে রুম ভাড়া নিয়ে খাবার কিনে খেতে হয়। ফলে পুরো পরীক্ষা চলাকালীন অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। কিন্তু এবার যা ব্যবসা, অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের পরীক্ষা চলাকালীন খরচ জোগাতে পারেনি। দ্বীপে কোনো কলেজ নেই। ফলে বাইরে পড়তে হয়। স্বল্প আয় দিয়ে ছেলেমেয়েদের বাইরে পড়ানো অনেকের পক্ষে অসম্ভব।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ফলে রোগবালাই সব সময়ই লেগে থাকে। কিন্তু দ্বীপে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। নামমাত্র ২০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল থাকলেও সেটি কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। সারা বছর চিকিৎসকসংকট থাকে। ফলে অনেক মানুষ টেকনাফ বা কক্সবাজারে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে আসতেন। কিন্তু এবার মানুষের আয় সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে আর কারও উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্বীপের বাইরে যাওয়া সম্ভব হবে না বলে মনে হচ্ছে।
স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আর্তনাদ ও নানা দাবি লক্ষ করেছি। সেন্ট মার্টিনের মানুষ পর্যটন সীমিতকরণ (দৈনিক দুই হাজার) বাতিল চায় অথবা বিকল্প কর্মসংস্থান চায়। তারা মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা চায়। বিশেষ করে শিক্ষা ও চিকিৎসা। দ্বীপের মানুষ পরিবেশবান্ধব পর্যটন চায়। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করে। বিদ্যুৎ, সি–অ্যাম্বুলেন্স, সি-ট্রাক, খাদ্যগুদাম, পর্যাপ্ত স্কুল, শিক্ষক, কলেজ ও সাইক্লোন শেল্টার চায়। বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তৈয়ব উল্লাহ অধিকারকর্মী ও সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দা
*মতামত লেখকের নিজস্ব