
ইরানের গ্রীষ্ম মানেই ভারী আর্দ্রতা আর দম বন্ধ করা গরম পরিবেশ। কিন্তু ১৯৫৩ সালের আগস্টে তেহরানের বাতাসে শুধু তাপ আর আর্দ্রতা ছিল না, ছিল আরও ভয়ংকর কিছু। ছিল সাজানো বিপ্লবের বাতাস।
তখন তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের ছায়ায় বসে ছিলেন কারমিট রুজভেল্ট। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের বংশধর এই ব্যক্তি সঙ্গে এনেছিলেন প্রায় ১০ লাখ ডলার সমমূল্যের নগদ অর্থ। এই অর্থ দিয়েই বাস্তবায়ন হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বড় হস্তক্ষেপ। ইতিহাসে যা আজ ‘দ্য অরিজিনাল সিন’ বা ‘আদি পাপ’ হিসেবে পরিচিত।
এই ইতিহাস এখন আর কেবল অতীতের আলাপ নয়, বরং এটি এক নকশা। ২০২৬ সালের অস্থির ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই নকশাই আবার সামনে এসেছে। ইরানে চলমান অস্থিরতায় সিআইএ, এমআই সিক্স এবং মোসাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। এর মধ্যেই সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকা মোসাদ সদস্যদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এতে বোঝা যায় সেই আদি পাপ আবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে। এবার বিষয়টি শুধু তেলের চুক্তি নয়। এবার প্রশ্নটি বৈশ্বিক জ্বালানি ভারসাম্য।
১৯৫৩ সালে লক্ষ্যবস্তু ছিলেন ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। তিনি ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী নেতা। তাঁর অপরাধ ছিল একটাই। তিনি বলেছিলেন, ইরানের তেল কেবলই ইরানিদের। ১৯০৮ সাল থেকে ব্রিটিশরা ইরানে তেলক্ষেত্র গড়ে তুললেও ইরানকে দিত সামান্য একটু ভাগ।
মোসাদ্দেকের তেলের দাবি ব্রিটিশদের কাছে ছিল অমার্জনীয়। উইনস্টন চার্চিল এই ইস্যুতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
এখানেই ইতিহাসের ভয়ংকর বিদ্রূপ। যে আইজেনহাওয়ার উপনিবেশ ভাঙার নীতির কথা বলেছিলেন, তিনিই আবার একটি গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতে সম্মতি দেন। তখন ক্ষেপণাস্ত্রের দরকার হয়নি। সংবাদপত্র কেনা হয়েছে। লেখক ভাড়া করা হয়েছে। দিনে ১০ থেকে ১৫ ডলারের বিনিময়ে ভাড়া করা হয়েছে দাঙ্গাবাজ জনতা।
শেষ পর্যন্ত মোসাদ্দেককে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে বিচারের নামে অপমানিত করা হয় এবং আজীবন গৃহবন্দী করে রাখা হয়। শাহকে ফিরিয়ে আনা হয় সিংহাসনে। সাময়িক সাফল্যই ভবিষ্যতের বিপর্যয়ের বীজ বপন করেছিল।
১৯৫৩ সালের আদি পাপ ওয়াশিংটনকে শিখিয়েছিল টাকা দিয়ে রাজপথ কেনা যায় এবং নেতৃত্ব সরানো যায়। দীর্ঘমেয়াদি ফলের কথা কেউ ভাবেনি। আজ সেই বুমেরাং ফিরে আসছে ধারালো হয়ে।
আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষা এখন আর শুধু সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নেই। এখন কথা হচ্ছে নেতৃত্ব ছিন্ন করার কৌশল নিয়ে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হুমকি দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার মাদুরোর অভ্যন্তরীণ বলয় ভাঙার উদাহরণ টেনে আনা হচ্ছে। কিন্তু তেহরান আর কারাকাস এক নয়। ইরান সাত দশক ধরে ১৯৫৩ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তারা এমন এক নিরাপত্তাকাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে স্যুটকেস কূটনীতি কাজ করবে না।
২০২৫ সালের জুনে ঘটে যাওয়া ১২ দিনের সংঘাত ছিল সেই প্রস্তুতির মহড়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান ছুড়েছে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। ট্রাম্প দাবি করছে যে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ধ্বংস হয়েছে। বাস্তবতা হলো ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা এখনো সক্রিয়। পরিস্থিতি আপাত শান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির পর ইরান শত শত মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আবার হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা চালাচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে না। ট্রাম্পও আবার সেই কাজ শেষ করতে আগ্রহী।
বার্তাটি স্পষ্ট। ১৯৫৩ সালের মতো আর পরিস্থিতি নেই। ইরান আজ পুরো অঞ্চলকে জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যদি ইরান মনে করে হামলা আসন্ন, তাহলে তারা অপেক্ষা করবে না। তারা একযোগে হামলা চালাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে। একই সঙ্গে বন্ধ করে দেবে হরমুজ প্রণালি। এর ফল হবে তেলের দামে ভয়াবহ উল্লম্ফন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিপর্যয়।
১৯৫৩ সালের আদি পাপ ওয়াশিংটনকে শিখিয়েছিল টাকা দিয়ে রাজপথ কেনা যায় এবং নেতৃত্ব সরানো যায়। দীর্ঘমেয়াদি ফলের কথা কেউ ভাবেনি। আজ সেই বুমেরাং ফিরে আসছে ধারালো হয়ে।
মার্ক টোয়েন বলেছিলেন ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্ত করে না। কিন্তু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আজ সিআইএ আর ইসরায়েলের করিডরে আবার সেই ইতিহাসের পাঠ চলছে। কিন্তু একটি বড় পার্থক্য তারা ভুলে যাচ্ছে। ১৯৫৩ সালে ইরান প্রস্তুত ছিল না। ২০২৬ সালে ইরান বারুদের পাশে দেশলাই হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যদি কারমিট রুজভেল্টের ছায়া নিয়ে তেহরানের পথে হাঁটেন তাহলে তাঁরা এমন আগুন জ্বালাতে পারেন, যা আর নেভানো যাবে না। ১৯৫৩ সালের আদি পাপ শুরু হয়েছিল ১০ লাখ ডলার দিয়ে। ২০২৬ সালের বুমেরাংয়ের মূল্য হতে পারে গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
জাসিম আল-আজ্জাবি সাংবাদিক, কাজ করেছেন এমবিসি, আবুধাবি টিভি, আল-জাজিরা ইংলিশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত