বাইবেল ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছেন ট্রাম্প
বাইবেল ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছেন ট্রাম্প

মতামত

ইরানে ট্রাম্পের আমেরিকার ধর্মযুদ্ধ!

প্রায় ৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে শুধু রাজনীতি বা ভূরাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখে না; তাদের অনেকেই মনে করে, এসব ঘটনার মধ্যেই বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে উঠছে। এ বিশ্বাসে লাখ লাখ মানুষকে বড় করা হয়েছে। একসময় আমিও সেই বিশ্বাসে বিশ্বাসীদের একজন ছিলাম।

সম্প্রতি খবর এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ইউনিটের কমান্ডার গত সোমবার এক ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তাদের বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নাকি ঈশ্বরের পরিকল্পনারই অংশ। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যিশু বেছে নিয়েছেন ইরানে সেই আগুন জ্বালানোর জন্য, যেখান থেকে আরমাগেডনের শুরু হবে এবং যিশুর পৃথিবীতে ফিরে আসার পথ তৈরি হবে।

খ্রিষ্টান বিশ্বাস অনুযায়ী, আরমাগেডন হচ্ছে শেষ সময়ের এক চূড়ান্ত যুদ্ধ। বাইবেলের রেভেলেশন গ্রন্থে বলা আছে, পৃথিবীর শেষ দিকে ভালো ও মন্দ শক্তির মধ্যে একটি বড় যুদ্ধ হবে। এ যুদ্ধকে আরমাগেডন বলা হয়। অনেকের বিশ্বাস, এই যুদ্ধের পর যিশু ফিরে আসবেন এবং পৃথিবীতে নতুন শান্তির যুগ শুরু হবে।

অনেক ইভানজেলিক্যাল গির্জায় যে খ্রিষ্টান জায়নবাদ দেখা যায়, তার শিকড়ও এই বিশ্বাসে। সেখানে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলেই শেষ যুগের ঘটনাগুলো শুরু করবে, যার মধ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সদস্য এমন আরও অনেক ঘটনা নিয়ে অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগ পেয়েছে মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন শাখার সদস্যরা জানিয়েছেন, কিছু কমান্ডারের মধ্যে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, তাঁরা শুধু যুদ্ধ করছেন না, বরং বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’-এ বলা শেষ সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়নের কাজ করছেন।

আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া প্রচারক জন নেলসন ডারবি আঠারো শতকের ত্রিশের দশকে বাইবেল ব্যাখ্যার একটি নতুন ধারণা দেন। এ ধারণার নাম ডিসপেনসেশনালিজম। তাঁর মতে, মানব ইতিহাস সাতটি আলাদা যুগে ভাগ করা। প্রতিটি যুগে ঈশ্বর মানুষের সঙ্গে ভিন্নভাবে সম্পর্ক রাখেন। যেমন আদম ও হাওয়ার সময়, মহাপ্লাবনের সময় ও যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময়।

বাইবেল হাতে শপথ নিচ্ছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স

এই বিশ্বাস অনুযায়ী, শেষ জামানায় পৃথিবীতে বড় অস্থিরতা দেখা দেবে। এরপর ঘটবে ‘র‍্যাপচার’। অর্থাৎ বিশ্বাসীরা অলৌকিকভাবে স্বর্গে চলে যাবেন। তারপর কিছু সময় পৃথিবী শাসন করবে অ্যান্টিক্রাইস্ট বা ধর্মদ্রোহীরা। শেষে যিশু ফিরে এসে পৃথিবীতে হাজার বছরের শান্তির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন।

ডারবির এ ধারণাই পরে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইভানজেলিক্যাল সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ প্রভাব ফেলে। তবে অধিকাংশ খ্রিষ্টান এই ব্যাখ্যা মানেন না। ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও অনেক প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা ‘রেভেলেশন’ গ্রন্থকে প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করে। অনেক গবেষকের মতে, সেখানে উল্লেখিত ‘বিস্ট’ বা পশু আসলে রোমান সম্রাট নিরোর প্রতীক, যিনি প্রাচীন খ্রিষ্টানদের ওপর নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিলেন।

১৯০৯ সালে প্রকাশিত ‘স্কোফিল্ড রেফারেন্স বাইবেল’-এ ডারবির ব্যাখ্যাগুলো বাইবেলের পাশে নোট হিসেবে ছাপা হয়। এতে অনেক পাঠক বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীকে বিশ্বরাজনীতির একধরনের সংকেত হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এই ধারণা আরও জনপ্রিয় হয় ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হাল লিন্ডসের বই ‘দ্য লেট গ্রেট প্ল্যানেট আর্থ’-এর মাধ্যমে। বইটিতে তিনি বলেন, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং পরে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া শেষ যুগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

এ ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইবেলের ‘ইজেকিয়েল’ গ্রন্থের ৩৮ নম্বর অধ্যায়। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জোট বাঁধবে। অনেকের মতে, সেখানে উল্লেখ করা পারস্য বলতে আজকের ইরানকে বোঝানো হয়েছে। লিন্ডসে মনে করেছিলেন, সেই জোটের উত্তরের শক্তি হতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আশির দশকেই আরমাগেডন ঘটতে পারে।

আজ অনেকেই ভুলে গেছেন, কিন্তু ষাটের দশকের অস্থিরতা, শীতল যুদ্ধের ভয় ও পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কার সময় এই বই আমেরিকায় বড় আলোড়ন তুলেছিল। ১৯৭৪ সালে হাল লিন্ডসে এ বিষয়ে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান করেন, যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দেখেছিল। পরে এ নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি হয়।

১৯৭৬ সালের হরর চলচ্চিত্র ‘দ্য ওমেন’-এ অ্যান্টিক্রাইস্টকে শয়তানের সন্তান হিসেবে দেখানো হয়, যার শরীরে ৬৬৬ সংখ্যার জন্মচিহ্ন থাকে। আশির দশকে কিছু হেভি মেটাল ব্যান্ডও বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে গান করে। এর একটি উদাহরণ হলো জনপ্রিয় মেটাল ব্যান্ড আয়রন মেইডেনের গান ‘নাম্বার অব দ্য বিস্ট’।

আমার বাবা স্কোফিল্ড বাইবেল ও হাল লিন্ডসের বই পড়ে ধীরে ধীরে এই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীমুখী ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। একসময় তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে বারাক ওবামা হলেন অ্যান্টিক্রাইস্ট।

ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্লেষকের কাছে ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা নতুন প্রতিপক্ষ খুঁজতে থাকে এবং ধীরে ধীরে তাদের দৃষ্টি ঘুরে যায় ইরানের দিকে।

এই ধারার একজন পরিচিত প্রচারক ওকলাহোমার পাদ্রি মার্ক হিচকক। তিনি বিভিন্ন বইয়ে দাবি করেছেন, আধুনিক ইরানই বাইবেলে উল্লেখ করা পারস্য এবং ইরানই ভবিষ্যতের শেষ যুদ্ধের কেন্দ্র হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সেই ঘটনারই প্রস্তুতি।

অনেক ইভানজেলিক্যাল গির্জায় যে খ্রিষ্টান জায়নবাদ দেখা যায়, তার শিকড়ও এই বিশ্বাসে। সেখানে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলেই শেষ যুগের ঘটনাগুলো শুরু করবে, যার মধ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনে এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়ে। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স তাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ২০১৮ সালে ইসরায়েল সফরে গিয়ে তিনি ইরান চুক্তি বাতিল এবং জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস দ্রুত খোলার প্রতিশ্রুতি দেন। তখন ইসরায়েলের একটি পত্রিকা লিখেছিল, অনেক ইভানজেলিক্যাল ও মেসিয়ানিক ইহুদির কাছে এটি যেন নতুন যুগের ইঙ্গিত।

কিছু বছর এই ধর্মীয় ভাষা কম শোনা গেলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা আবার জোরালো হয়েছে। মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি সামরিক ঘাঁটির ৪০টির বেশি ইউনিট থেকে এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। এতে বোঝা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাষ্ট্রনীতির মিশ্রণ এখন পেন্টাগন পর্যন্ত পৌঁছেছে।

এদিকে সম্প্রতি সিনেটর জন করনিন সান আন্তোনিওতে একটি ধর্মসভায় অংশ নেন, যার শিরোনাম ছিল ‘এন্ড অব ডেজ অপারেশন এপিক ফিউরি’। যার অর্থ দাঁড়ায় ‘শেষ সময়ের মহা অভিযান’। সভাটি পরিচালনা করেন টেলিভিশন প্রচারক জন হাগি, যিনি ‘ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েল’-এর প্রতিষ্ঠাতা।

ট্রাম্প নিজে ধর্মতত্ত্বে খুব একটা আগ্রহী নন। তবে তিনি ধর্মীয় প্রতীকের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝেন। বাইবেল হাতে ছবি তোলা বা নিজের বেঁচে যাওয়াকে ঈশ্বরের ইচ্ছা বলা—এ ধরনের কাজ তিনি প্রায়ই করেছেন। তাই ইরান যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া ভবিষ্যদ্বাণীর আলোচনায় ট্রাম্প এক অদ্ভুত অবস্থানে আছেন। কারও কাছে তিনি বাইবেলের সাইরাস রাজার মতো, যাঁকে ঈশ্বর ইতিহাসের শেষ অধ্যায় শুরু করার জন্য ব্যবহার করছেন। আবার অন্যদের কাছে তিনি সেই আকর্ষণীয় নেতার প্রতীক, যাঁর কথা ‘রেভেলেশন’ গ্রন্থে বলা হয়েছে; যিনি বিশৃঙ্খলার সময়ে উঠে এসে মানুষের আনুগত্য অর্জন করেন।

মার্কিন সিনেটর মার্কো রুবিও প্রায়ই বলেন, ইরানের শিয়া ধর্মগুরুদের ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁদের নীতিকে প্রভাবিত করছে। কিছু ক্ষেত্রে তা সত্যও হতে পারে।

কিন্তু যখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাই ব্রিফিংয়ে আরমাগেডনের কথা বলেন এবং সিনেটররা ‘শেষ দিনের’ ধর্মসভায় অংশ নেন, তখন মনে হয়, ভবিষ্যদ্বাণীর প্রভাব শুধু এক পক্ষের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়।

  • রায়ান জিকগ্রাফ আটলান্টাভিত্তিক একজন সাংবাদিক

    ইংরেজি সাময়িকী জ্যাকবান থেকে নেওয়া, সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত