চব্বিশের অভ্যুত্থান রাষ্ট্র সংস্কারের বড় সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছিল
চব্বিশের অভ্যুত্থান রাষ্ট্র সংস্কারের বড় সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছিল

আলতাফ পারভেজের কলাম

এই ‘হতাশা’র সময়ে আমরা কী করব

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজ বেশ হতবিহ্বল অবস্থায় পড়েছে এই মুহূর্তে। রাজনৈতিক সংস্কারের অনেক দিনের প্রচেষ্টাগুলো আচমকা আটকে গেল সংসদে। গত দুই বছরের যাবতীয় আয়োজনের অনেকাংশ নিষ্ফলে গেল বলা যায়। রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ দাবিদাওয়াগুলো আবার জিরো পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে। নীরব একটা প্রশ্ন চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে—এ অবস্থায় করণীয় কী?

১৯৪৭–এর আগস্টেই আমরা শুনেছি ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়’। ঔপনিবেশিক প্রশাসন, আইনি কাঠামো এবং উৎপাদন সম্পর্কের আমূল সংস্কারের তাগিদ ছিল ওই স্লোগানের মর্মকথা। সেই ধারাবাহিকতায় ‘সাম্য-মৈত্রী-মানবিক মর্যাদা’র জন্য ২৩ বছর পর ব্যাপক রক্ত দিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতা এল, কিন্তু মুক্তির প্রচেষ্টা চালু রাখতে হলো।

১৯৯০–এর গণ–অভ্যুত্থান শেষেও তখনকার ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে’র ১০ দফার কোনো সুরাহা হলো না। এরপর, মূলত ২০১৮ সালের সড়ক আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র মেরামতের তাগিদ আবার জোরালো হয়ে উঠল। যার রক্তাক্ত অভিপ্রকাশ দেখা গেল ২০-২১ মাস আগে। কিন্তু রক্তের দাগ না শুকাতেই যেন ১৯৭২ ও ১৯৯১–এর চেহারা নিতে শুরু করেছে ২০২৬।

বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করে রাজনীতিবিদের হাতে অস্ত্র ও আস্থা জমা দিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন ১৯৭২-এ। বদল—বদল পায়নি অর্থনৈতিক সম্পর্কের, প্রশাসনিক সংস্কৃতির। নব্বইয়ে ছাত্ররা সামরিক জান্তাকে হটিয়ে তিনটি রাজনৈতিক জোটের কাছে ‘১০ দফা’ করণীয় দিয়ে নানা পেশায় ঢুকে গিয়েছিল। পরে কেবল দুটি বড় দলের কাজিয়া দেখে সময় গেছে তাদের।

২০২৪–এর আগস্টে আন্দোলনকারীরা একনায়কতন্ত্র হটিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছিল নিজেদেরই নিযুক্ত ‘সরকারে’র হাতে। সেই সরকার নিজে থেকে কিছুই করতে পারল না—গণভোটের মাধ্যমে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার কয়েক চিমটি পাঠাল ত্রয়োদশ সংসদে এবং সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটিবিচ্যুতির কথা বলে পরিবর্তনমুখী অধ্যাদেশগুলোর অক্সিজেন মাস্ক খুলে নিল। চারটি এখনই বাতিল করল, গুরুত্বপূর্ণ অপর ১৬টিকে সংশোধনের আশ্বাস দিয়ে সেগুলোরও কার্যকারিতা আপাতত বিলোপ করা হলো।

গুমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চারদের মধ্যেই ছিল বিএনপি। অথচ সেই দলই পার্লামেন্টারি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গুম প্রতিরোধ ও এর প্রতিকারের আয়োজন অকার্যকর করে দিল। তারা এখন গুমের সংজ্ঞা পাল্টানোর কথা বলছে। অনেকের বিরুদ্ধে তদন্তের আগে সরকারের অনুমতির ওপর জোর দিচ্ছে। একইভাবে অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে অধস্তন আদালতের ওপর সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বতন্ত্র সচিবালয় এবং মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা বাড়ানোর উদ্যোগ।

জাতীয় সংসদে সংস্কারধর্মী এসব অধ্যাদেশ পাস হলেও যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র আমূল জনকল্যাণধর্মী চেহারা পেত বা রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে বড় বদল ঘটে যেত, তা নয়। সেগুলো পাস না করার পরোক্ষ ফলাফলই বরং বেশি তাৎপর্যবহ। এতে ‘লাল জুলাই’য়ের নৈতিক ও আদর্শিক শিকড়ে বড়সড় একটা কোপ পড়ল। ‘সমাজে’ এমন ভাবনাই ছড়াল, ‘এত কিছুর পরও যখন সামান্য কয়েক কদমও এগোনো গেল না, তাহলে আর এ দেশে কিছু হবে না।’

এ রকম মুহূর্তটা শক্তিশালী ব্যবসায়ী অলিগার্কি সমাজ, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, কলোনিয়াল পেনাল কোডসহ মূর্ত-বিমূর্ত সবার জন্য কেবল সুখকর নয়, উল্লাস করার মতো। ক্ষমতাচ্যুতরাও হয়তো মুচকি হাসছে।

সংসদে কোনো দল একচেটিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে কী ঘটে, তার একটা নজির নতুন সংসদের শুরুতেই দেখল বাংলাদেশ। ২০টি প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশের অকার্যকারিতা বিরোধী দলগুলো ঠেকাতে পারেনি। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া পর্যন্তই তাদের ভূমিকা।

রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন কী ঘটবে, সেটাও অনুমান অযোগ্য নয়। ‘তীব্র আন্দোলনে’র হুমকি দিয়ে বিরোধী দলগুলো কিছু মিটিং-মিছিল করবে। গণ-অভ্যুত্থানের মালিকানা নিয়ে রাজপথ কিছুটা উত্তপ্ত হবে। গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতারও অভিযোগ উঠবে। এ রকম ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ২০২৪–এর আগস্টেই ঘটে গিয়েছিল কি না, সেই অনুসন্ধানে আপাতত কারও আগ্রহ থাকবে না। সংসদে জ্বালাময়ী অনেক ভাষণ হবে এবং ভাষণ শেষে ওয়াকআউটও হবে। একপর্যায়ে আবারও কিছু ‘কমিশন’ গঠিত হবে সংস্কারের বিষয়-আশয় খুঁজতে।

এটা অনেকটা স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন গঠনের মতো। প্রায় সব নির্বাচিত সরকার একটা করে শিক্ষা কমিশন করেছে; কিন্তু শিক্ষাকাঠামোর প্রত্যাশিত সংস্কারে কেউ হাত দেয়নি। স্থানীয় সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনের বেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। করুণ এই ইতিহাসের হাস্যকর সর্বশেষ উদাহরণ ছিল বিগত আমলে আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর সংস্কারের নামে পুলিশ বাহিনীর পোশাক পরিবর্তন। আমাদের পিএইচডিধারীরা এভাবেই ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যকে জনবান্ধব করার কথা ভেবেছেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠন ও পথচলায় রাজনৈতিক দলগুলোর বেশ সহযোগিতা ছিল। যখনই বড় কোনো ‘মব’ ঘটত, তাৎক্ষণিক ‘এক দফা সম্মিলিত’ ফটোসেশন দেখা যেত। দক্ষিণপন্থা এবং স্থিতিশীলতা হাত ধরাধরি করে হাঁটতে চাইছিল।

এখনকার আবহটা মৃদু আলাদা। সংস্কারধর্মী অধ্যাদেশগুলোর ‘অপমৃত্যু’র পর নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক উত্তাপে আছি আমরা এখন। অনেক বেদনার পাশাপাশি সময়টা কিছুটা কৌতুককরও। খোদ গণ-অভ্যুত্থানের এজেন্সির দাবিদারেরাও স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে জোরের সঙ্গে সংস্কারের দাবিতে দাঁড়াতে পারছেন না। অন্যের ভোট-সহায়তায় নির্বাচন করে তাঁরা পরিবর্তনবাদী নৈতিক জোর অনেকখানি হারিয়েছেন।

এ রকম সব পিছুহটা মিলে অবস্থা এই দাঁড়াচ্ছে, গুমের মতো অপরাধ প্রতিরোধে আইনি সংস্কারকেও কার্যকর হতে দেওয়া হলো না। অথচ এটা ছিল ২০ মাস আগে বাংলাদেশে জাতীয় ঐকমত্যের বড় এক জায়গা। বিগত দেড়-দুই দশকে গুমের শিকার হওয়া মানুষদের মধ্যে বিএনপির তরুণ কর্মী-সংগঠক ছিলেন বড় একাংশ।

গুমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চারদের মধ্যেই ছিল বিএনপি। অথচ সেই দলই পার্লামেন্টারি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গুম প্রতিরোধ ও এর প্রতিকারের আয়োজন অকার্যকর করে দিল। তারা এখন গুমের সংজ্ঞা পাল্টানোর কথা বলছে। অনেকের বিরুদ্ধে তদন্তের আগে সরকারের অনুমতির ওপর জোর দিচ্ছে।

একইভাবে অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে অধস্তন আদালতের ওপর সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বতন্ত্র সচিবালয় এবং মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা বাড়ানোর উদ্যোগ।

কার্যকর হওয়া অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের উপযোগী ব্যক্তিদের বাছাই করতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল।

ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকে বার্তাটি কি তবে এই যে এসব সংস্কার দরকার নেই? পুরোনো ব্যবস্থা সামান্যতমও না পাল্টাক? স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার সঙ্গে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি ও সংসদের সর্বশেষ এসব পদক্ষেপ একদম মেলে না। স্পষ্টভাবে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ ‘লাল জুলাই’য়ের আগের অবস্থায় ফিরছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, যেসব সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ অকার্যকর হলো তার অনেকগুলোকে বিল আকারে সংসদে আনা হবে। সেসব বিলে কী থাকবে, তা এখনই অনুমান করা না গেলেও এটা তো অনুমান করা যাচ্ছে, অকার্যকর অধ্যাদেশগুলোর সংস্কার প্রস্তাবের চেয়ে কম কিছুই থাকবে সেখানে। অর্থাৎ বাংলাদেশ আবার ‘জিরো পয়েন্টে’ ফিরছে।

মুহূর্তটা হতাশার। এই হতাশা কেবল নির্দলীয় নাগরিকদের নয়, বিভিন্ন দলকে সমর্থনকারী নাগরিকদেরও। এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলীয় সাংগঠনিক সংস্কৃতির কারণে অনেক দলের সমর্থক ও কর্মীরা প্রকাশ্যে হতাশার কথা বলছেন না।

কিন্তু এটা তো সত্য, গত প্রায় দুই দশক বাংলাদেশে জেন-জি এবং তার আগের প্রজন্ম নানাভাবে যে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, বিভিন্ন দলে যুক্ত হয়েছে, তাদের প্রধান চাওয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয়, প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোর সংস্কার। সেই জায়গায় প্রচণ্ড হোঁচট খেল ২০২৬–এর এপ্রিলের বাংলাদেশ।

রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারের পরিবর্তনবাদী অঙ্গীকারগুলোর ব্যাপারে কতটা আন্তরিক, সে বিষয়ে এখনই গুরুতর শঙ্কার কারণ ঘটেছে। বড় দলগুলো আমলাতন্ত্র ও অলিগার্কিকে খুশি রাখতে গিয়ে এবং ছোট অনেক দল তাদের জোটগত সুযোগ-সুবিধার লোভে পড়ে যদি জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে হাঁটতে শুরু করে, তাহলে নাগরিক সমাজের করণীয় কী?

নিশ্চয়ই এ অবস্থাটা চ্যালেঞ্জপূর্ণ। এ রকম একটা অবস্থাকে নাগরিক সমাজ চাইলে ইতিবাচকভাবেও গ্রহণ করতে পারে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি আবার রাজনৈতিক শক্তির হাত থেকে জনতার কাছেই ফিরল।

ইতিমধ্যে জনসমাজের ছদ্ম পরিবর্তনবাদীরা এক দফা শনাক্ত হয়েছে। নাগরিক সমাজের আরেক দল রুটিরুজির খোঁজে এই পরিসর ছেড়েছে। অথচ বাংলাদেশকে এগোতে হলে প্রশাসন ও আইনি পরিমণ্ডলকে পাল্টাতেই হবে। এটা সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রধান চাওয়া। এ নিয়ে আপসের সুযোগ তো নেই। ফলে নাগরিক সমাজকে নতুনভাবে এসব বিষয়ে সংগঠিত হওয়ার সময় হয়েছে।

  • আলতাফ পারভেজ গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব