
জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে চলতি মাসের শুরুতে উগ্র ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি ৪৩.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অথচ ওই রাজ্যের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৭.৯ শতাংশ বিদেশি নাগরিক, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে তিনটি আসন কম পাওয়ায় দলটিকে এমন একটি অভিবাসীবিরোধী দলের সমর্থন নিতে হচ্ছে, যার নেতা সাহরা ভাগেনকনেখটের বাবা ইরান থেকে এসেছিলেন।
দুই সপ্তাহ পর মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যেও প্রথম হয় অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি। অথচ ওই রাজ্যের অর্থনীতি প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসী পরিবারভুক্ত মানুষের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। সুযোগ বুঝে দলের নেতা আলিস ভাইডেল ক্রিসমাসের আগেই কেন্দ্রীয় নির্বাচনের দাবি জানান। অথচ তিনি নিজে সুইজারল্যান্ডে থাকেন। সেখানে তাঁর শ্রীলঙ্কায় জন্ম নেওয়া স্ত্রী ও তাঁদের দুই ছেলে রয়েছে।
পোল্যান্ডে বসে এসব ঘটনা দেখলে উগ্র ডানপন্থীদের রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের কৌশল হলো এমন কিছু বলা বা করা, যা এতটাই চমকপ্রদ, মিথ্যাপূর্ণ বা নৈতিকভাবে আপত্তিকর যে বিরোধীরা তাৎক্ষণিকভাবে তার জবাব দেওয়ার ভাষা খুঁজে পায় না।
জার্মানিতে যে দল অভিবাসী ও তাঁদের সন্তানদের দেশ ছাড়তে চাপ দেওয়ার নীতি বা ‘পুনঃ অভিবাসন’-এর প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই দলই সবচেয়ে বেশি ভোট পাচ্ছে এমন রাজ্যে, যেখানে অভিবাসীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। আবার যে রাজ্যের অর্থনীতি পুরোটাই অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল, সেখানেও তারাই জয়ী হচ্ছে।
পোল্যান্ডেও ঠিক একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। যে সরকার টানা আট বছর ধরে অভিবাসীদের নিয়ে দেশবাসীকে ভয় দেখিয়েছে, সেই সরকারের আমলে ২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি সংখ্যক ইইউবহির্ভূত নাগরিককে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়। পোল্যান্ডের জাতীয়তাবাদীদের অনেকেই জার্মানির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হলেও তাঁদের কারও কারও পদবি জার্মান বংশোদ্ভূত।
ইউরোপের আরও অনেক অভিবাসীবিরোধী নেতার ক্ষেত্রেও একই স্ববিরোধিতা দেখা যায়। চেক জাতীয়তাবাদী তোমিও ওকামুরা টোকিওতে জন্মেছেন, যাঁর বাবা ছিলেন অর্ধেক জাপানি ও অর্ধেক কোরীয়। নেদারল্যান্ডসের জাতীয়তাবাদী নেতা গিয়ার্ট ভিল্ডার্সের পদবি জার্মান বংশোদ্ভূত। তাঁর মায়ের দিকের বংশের যোগ ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে এবং স্ত্রী হাঙ্গেরীয়। ব্রিটেনের রিফর্ম ইউকে দলের অভিবাসননীতি দেখভাল করা জিয়া ইউসুফের বাবা-মা ছিলেন শ্রীলঙ্কার মুসলিম অভিবাসী। তিনি ‘ডিপোর্টেশন কমান্ড’ গঠন করে প্রতিদিন পাঁচটি বিশেষ বিমানে মানুষকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানান, যা তাঁর মতে ‘আগ্রাসন’ ঠেকানোর ব্যবস্থা। দলটি ক্ষমতায় এলে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও হতে পারেন।
অন্যদিকে ফ্রান্সে উগ্র ডানপন্থীরা উত্তর আফ্রিকার মুসলিম অভিবাসনের বিরোধিতাকে রাজনীতির ভিত্তি করলেও ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ নিয়ে কথা বলা নেতা এরিক জেমুরের বাবা ছিলেন আলজেরীয় ইহুদি। ন্যাশনাল র্যালির নেতা জর্দান বারদেলার প্রপিতামহ ছিলেন আলজেরীয় এবং দাদা ১৯৬০ সালে ইতালি থেকে ফ্রান্সে আসেন। বারদেলার প্রস্তাবিত অভিবাসননীতি তখন কার্যকর থাকলে হয়তো তাঁর নিজের জন্মই হতো না।
যুক্তরাষ্ট্রেও এই বৈপরীত্য চরম পর্যায়ে। সেখানকার আদিবাসীরাই একমাত্র জনগোষ্ঠী, যাদের ভূমিতে নিঃসন্দেহে আদি অধিকার রয়েছে; অথচ তারা এখন
মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। বাকি সবাই কোনো না কোনোভাবে অভিবাসী বা তাঁদের বংশধর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাদা ১৬ বছর
বয়সে সামরিক প্রশিক্ষণ এড়াতে বাভারিয়া ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং পরবর্তী সময়ে জার্মানি থেকে বহিষ্কৃত হন। ট্রাম্পের মা স্কটল্যান্ডের এবং তাঁর বর্তমান শ্বশুর-শাশুড়ি স্লোভেনীয়, যাঁরা ‘চেইন মাইগ্রেশন’ সুবিধা পেয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব পান। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কর্মক্ষেত্রে অভিবাসনের বিরুদ্ধে বললেও তাঁর স্ত্রী দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দাদাকে একসময় অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আটক ও বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ইলন মাস্ক শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়েও এখন অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। ট্রাম্পের গণহারে বহিষ্কার অভিযানের রূপকার স্টিফেন মিলারের নীতি কার্যকর থাকলে তাঁর নিজের দাদাই যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারতেন না। এসব বৈপরীত্য সত্ত্বেও উগ্র ডানপন্থীদের জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং চরম ও চমকপ্রদ বক্তব্যই এখন সফল নির্বাচনী কৌশলে পরিণত হয়েছে। তবে জাতীয়তাবাদকে সমর্থনকারীদের মনে রাখা উচিত—এমন নীতি শেষ পর্যন্ত তাঁদের নিজেদের পরিবার ও নেতাদেরও বিপদে ফেলতে পারে।
স্লাভমির সিয়েরাকোভস্কি ক্রিতিকা পলিতিচনা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত