
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগে চলমান আন্দোলন নিয়ে আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই আন্দোলন এখন ‘সরকার পরিবর্তনের লড়াইয়ে’ পরিণত হয়েছে।
প্রশান্ত ভূষণের মতে, এটি নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার। সুপ্রিম কোর্টের রাষ্ট্রদ্রোহসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সহিংসতা বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত না হলে সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ সৃষ্টি করা অপরাধ নয়।
কিন্তু বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা রাজনাথ সিং, নিতিন নবীন, সংবিৎ পাত্রসহ অনেকে এর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিরোধীরা রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতি তৈরি, বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ কিংবা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছে।
বিজেপির এই বক্তব্যের মূল সমস্যা হলো, সরকার পরিবর্তনের দাবিকে তারা রাষ্ট্রবিরোধী, অসাংবিধানিক ও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরছে। সরকার ও রাষ্ট্রকে তারা গুলিয়ে ফেলছে।
অথচ বিরোধী দলে থাকার সময় বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নেতারা নিজেরাই সরকার পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। তাঁদের অতীত কর্মকাণ্ড বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রথমত, মোদি সরকার আর ভারত এক বিষয় নয়। বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন সরকার পরিবর্তনের দাবিকে ভারতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হিসেবে দেখিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি বিজেপি, কেন্দ্রীয় সরকার ও রাষ্ট্রকে এক করে ফেলেছেন।
অথচ সরকার সাময়িকভাবে দেশ পরিচালনা করে। জনগণের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারির মতো তারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। জনগণ ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে পারে। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা জাতীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্তও নয়।
দ্বিতীয়ত, সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে পাঁচ বছর নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা দেয় না। ভারতীয় সংবিধানের ৭৫ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মন্ত্রিসভা লোকসভার কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ। সরকারের টিকে থাকা নির্ভর করে সংসদের আস্থার ওপর।
নির্বাচনে জয়ের অর্থ এই নয় যে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে না। নির্বাচন, গণ-আন্দোলন কিংবা সংসদে অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের দাবি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও মোদির পদত্যাগ দাবি করা যায়।
তৃতীয়ত, নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে নাগরিক অধিকার স্থগিত হওয়া নয়। ভারতীয় সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকার রয়েছে। এসব অধিকার নির্বাচনের পরও কার্যকর থাকে।
২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৪০টি আসন পেয়েছিল এবং ভোট পড়েছিল এমন ভোটের প্রায় ৩৬ শতাংশ তাদের পক্ষে যায়।
প্রায় ২৩ কোটি ভোটারের সমর্থন নিয়ে দলটি সরকার পরিচালনার অধিকার পেয়েছিল। কিন্তু তাই বলে দেশের অন্য নাগরিকদের নীরব থাকার নির্দেশ দেওয়ার অধিকার পায়নি। নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েও পরদিন থেকে বিজয়ী দলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর রাজনৈতিক প্রচার চালানো যায়।
চতুর্থত, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ক্ষমতা দখলের অসাংবিধানিক চেষ্টা নয়। রাস্তায় সমাবেশ করে কোনো দল নিজে থেকেই সরকার গঠন করতে পারে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে সরানোর দাবি তোলার কারণে আন্দোলনকারীদের অপরাধীও করা যায় না।
‘সরকার পরিবর্তন’ শব্দবন্ধকে বিদেশি হস্তক্ষেপ বা অবৈধ ক্ষমতা দখলের অর্থে ব্যবহার করে বিজেপি নাগরিক সমাজ, কর্মী ও আন্দোলনকারীদের ভয় দেখাতে চাইছে।
অথচ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পদত্যাগ, আইন পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনে সরকারকে পরাজিত করার দাবি তোলা সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। বিরোধীরা যদি আইন মেনে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে, সেখানে কারুর কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
পঞ্চমত, বিরোধী দলের ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা অপরাধ নয়। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজ জনঅভিযোগকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ দেওয়া এবং বিকল্প সরকার গঠনের চেষ্টা করা।
কংগ্রেস নেতা পবন খেরা বলেছেন, গণআন্দোলনের লক্ষ্য নির্বাচনে সরকারকে পরাজিত করা। অথচ বিজেপি এটিকে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখাচ্ছে।
ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধীদলীয় নেতাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলকে বিকল্প মন্ত্রিসভা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২৫ বছর ধরে সরকারি দায়িত্বে থাকা মোদির বিষয়টি বোঝা উচিত।
ষষ্ঠত, সরকার পরিবর্তনের দাবি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের স্বীকারোক্তি নয়। বিজেপি নেতা সুধাংশু ত্রিবেদী বলেছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন গণতান্ত্রিক। কিন্তু ‘সরকার পরিবর্তন’ বলতে তিনি ষড়যন্ত্র ও সহিংস সংঘাত বোঝাতে চেয়েছেন।
এটি তাঁর ব্যাখ্যা, প্রমাণ নয়। নিতিন নবীনের বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও একইভাবে প্রমাণসাপেক্ষ।
কোনো আন্দোলন সরকারকে সরাতে চাইলেই তার পেছনে বিদেশি মদদ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কার্যকর বিরোধিতাকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে চালানো দেশীয় সমালোচনার জবাব দেওয়ার বিকল্প হতে পারে না।
সপ্তমত, বিজেপি নিজেই অতীতে সরকার পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করেছে। বিজেপি ও তার পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘ এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পদত্যাগের দাবি এবং সংসদ অচল করার রাজনীতি করেছে।
গণতন্ত্রের নিয়ম দলভেদে বদলায় না। ১৯৯৮ ও ২০১৪ সালে যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল, সেই প্রক্রিয়ায় অন্য দলও তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করতে পারে। হিন্দি কবি রামধারী সিং দিনকরের বহুল উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি তাই আজও প্রাসঙ্গিক—‘সিংহাসন খালি করো, জনগণ আসছে।’
অটল বিহারি বাজপেয়ি ও লালকৃষ্ণ আদভানি ১৯৭৫ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
তাঁদের লক্ষ্য ছিল নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো। বিজেপির নেতারাও পরে এই ইতিহাসকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষমতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
মনমোহন সিং সরকারের আমলেও বিজেপি নেতারা সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ, সংসদ অচল করা ও আগাম নির্বাচনের দাবি তুলেছিলেন। অরুণ জেটলি ও আদভানির মতো নেতারা দুর্নীতিগ্রস্ত বা অযোগ্য সরকারকে সরানোর পক্ষে কথা বলেছেন।
২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বারানসির জনসভায় মোদিও বলেছিলেন, দেশের মানুষ দিল্লির সরকারকে উপড়ে ফেলতে চায়। একই বছরের জুনে গোয়ার সভায় তিনি ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ গড়ার আহ্বান জানান।
ক্ষমতাসীন দলকে দেশজুড়ে ক্ষমতা থেকে সরানোর এই আহ্বানও সরকার পরিবর্তনের প্রচার ছিল। তখন এমন আন্দোলনকে জনসমর্থনের প্রমাণ বলা হলেও এখন বিজেপিবিরোধী একই ধরনের দাবিকে ষড়যন্ত্র বলা হচ্ছে।
অথচ গণতন্ত্রের নিয়ম দলভেদে বদলায় না। ১৯৯৮ ও ২০১৪ সালে যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল, সেই প্রক্রিয়ায় অন্য দলও তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করতে পারে।
হিন্দি কবি রামধারী সিং দিনকরের বহুল উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি তাই আজও প্রাসঙ্গিক—‘সিংহাসন খালি করো, জনগণ আসছে।’
দ্য ওয়্যার ভারতের একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম। প্রকাশিত লেখাটি তাদের বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ