অভিমত–বিশ্লেষণ

সাপের কামড়ে কৃষকের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ নেই কেন

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন যে সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণকারী বা স্থায়ীভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য একটি জাতীয় ক্ষতিপূরণ বা সামাজিক সুরক্ষা তহবিল থাকা উচিত। কৃষক, জেলে, বনজীবীসহ উচ্চ ঝুঁকির পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ বিমা বা ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। লিখেছেন গওহার নঈম ওয়ারা

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পাট জাগ দেওয়ার সময় প্রাণঘাতী সাপে কামড় দিয়েছে এক কৃষককে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে কৃষিকাজ করার সময় সাপের কামড়ে আরেক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। একইভাবে কৃষকের মৃত্যুর খবর এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও রংপুরের মিঠাপুকুর থেকে।

কিষানিদের এর সঙ্গে যুক্ত করলে দেখা যাবে, কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মারা যাচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে যে চার নারীর মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে (দিনাজপুর ১ জুলাই, মাদারীপুর ৭ জুলাই, সিরাজগঞ্জ ২১ জুলাই, টাঙ্গাইল ১৬ জুলাই), তাঁরা সবাই ছিলেন কিষানি।

সবচেয়ে বেশি মানুষ সাপের আক্রমণের শিকার হন মে, জুন ও জুলাই মাসে। গত বছর (মে ২০২৫) গোয়ালন্দের এক কৃষক জানিয়েছিলেন, ১৫-১৬ দিন আগে উজানচর মহিদাপুর এলাকায় কৃষক সুরুজ শেখ ধান কাটতে গেলে রাসেলস ভাইপার কামড় দেয়। তাঁকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘদিন তাঁর চিকিৎসা চলে।

ওই কৃষক জানিয়েছিলেন, ‘পরপর আরও দুই কৃষককে কামড় দিলে আতঙ্কে আমরা ধানখেতে যেতে পারিনি। অনেক ফসল জমিতেই নষ্ট হয়েছে। ওই মৌসুমে শ্রমিকেরাও ভয়ে খেতে নামছিলেন না।’

বর্ষার সময় চর এলাকায়, উপকূলে এবং বন্যায় দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে সাপের উপদ্রব বেশি থাকে। কিছু জরিপে বলা হয়েছে, দেশে সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ের শিকার হন খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের মানুষ। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান গোখরা ও কালকেউটের কামড়ে। এখন এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া। বর্তমানে ২৭টি জেলায় এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

সাপের কামড়ে যাঁরা মারা যান, তাঁদের প্রায় সবাই কৃষির সঙ্গে যুক্ত। দরিদ্র মানুষ একবার সাপের কামড়ের শিকার হলে তাঁদের আর্থিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক যে ক্ষতি হয়, তা সামাল দিতে জীবন পার হয়ে যায়।

একটু পুরোনো হলেও সাপের কামড়ে মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জাতীয়ভাবে জরিপ রয়েছে। সেই জরিপের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ মোট ১১টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। ২০২১ ও ২০২২ সালে তারা মাঠপর্যায়ে জরিপটি করেছিল।

এর আগে এসব সংস্থা ২০০৮ সালে আরেকটি জরিপ করেছিল। তাতে বছরে ছয় হাজারের বেশি মানুষের সাপের কামড়ে মৃত্যু ঘটে বলে বেরিয়ে আসে। ওই জরিপে বছরে ছয় লাখের বেশি মানুষ সাপের আক্রমণের শিকার হন বলে জানানো হয়।

তবে এই সংখ্যা যে দিন দিন বাড়ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গত বছর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে তিনি বর্তমানে যত সাপে কাটা রোগী দেখছেন, তা গত ১৪ বছরে দেখেননি।

ওষুধ, হাসপাতাল সব থাকার পরও কেন এত মৃত্যু?

জীবন দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার রনগাঁও ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামের জুলেখা খাতুন। ঘটনার দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ধানের বস্তা বের করার সময় জুলেখার বাঁ হাতের কবজিতে সাপ কামড় দেয়। তাঁর চিৎকার শুনে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এ সময় সাপটিকেও ধরে হাসপাতালে নিয়ে যান জুলেখা খাতুনের স্বজনেরা।

স্বজনদের দাবি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম মজুত থাকলেও তা প্রয়োগ না করে রোগীকে সেখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কেন তাঁকে দিনাজপুর পাঠানো হলো? উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে বলা হয়, অ্যান্টিভেনম আছে, তবে তা প্রয়োগ করলে আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে, যা উপজেলা হাসপাতালে নেই।

জুলেখা খাতুনের ছেলে বলেন, ‘আমরা অ্যান্টিভেনম দিতে বারবার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু চিকিৎসক তা দিতে রাজি না হওয়ায় মাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

জুলেখার স্বজনদের দাবি, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর নার্সরা জানান, আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি নেই। পরে তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী জুলেখাকে দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের নজরে এলে দিনাজপুরের সিভিল সার্জন গণমাধ্যমকে বলেন, বোচাগঞ্জের রোগীর মৃত্যু এবং অ্যান্টিভেনম না পাওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে জেলায় অ্যান্টিভেনমের কোনো সংকট নেই।’

বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে জেনেছি। চলতি অর্থবছরে এডিবির বরাদ্দ থেকে হাসপাতালে রেবিস ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিভেনমের ৫০টি ভায়াল কেনা হয়েছিল। রোগীকে কেন তা দেওয়া হয়নি, গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।’

শুধু দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ নয়; সম্প্রতি একই রকমের ঘটনা ঘটেছে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ী ও শ্রীনগরে; জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুরে। বলতে গেলে দেশের প্রায় সব উপজেলায় একই চর্চা, একই রেকর্ড।

উপজেলা হাসপাতাল এমন করে কেন?

উপজেলা হাসপাতালের একজন আবাসিক চিকিৎসক একবার এই লেখককে বলেছিলেন, ‘আমাদের এখানে সাপের কামড়ের রোগী এলে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই। রোগীকে পর্যবেক্ষণে রেখে অ্যান্টিভেনম দিতে হয়। তা না হলে রোগীর সমস্যা হতে পারে। এ জন্য কার্ডিওলজির চিকিৎসক প্রয়োজন। এই পদে চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না।’

সাপের কামড় ব্যবস্থাপনার জাতীয় নির্দেশিকা (ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর ম্যানেজমেন্ট অব স্নেকবাইট) মূলনীতি হলো—‘ট্রিট ফার্স্ট, রেফার ইফ নেসেসারি’; অর্থাৎ চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলে আগে চিকিৎসা শুরু করতে হবে, পরে প্রয়োজন হলে রেফার করতে হবে।

আরও বলা হয়েছে, রেফার বিকজ দ্য পেশেন্ট নিডস আ হায়ার লেভেল অব কেয়ার-নট সিম্পলি বিকজ দ্য পেশেন্ট হ্যাজ বিন বিটেন বাই আ স্নেক।’ অর্থাৎ শুধু সাপে কামড়েছে বলেই তাঁকে তাড়াহুড়া করে রেফার করে দিতে হবে, সেটা ঠিক নয়। রোগীর উচ্চস্তরের চিকিৎসার প্রয়োজন হলেই কেবল রেফার করা যাবে।

বাস্তবে কেবল ঝামেলা এড়ানোর জন্যই হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুত থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়।

কথিত নির্দেশিকায় রেফারের আগে কী করতে হবে, তা বেশ খোলাসা করেই বলা আছে।

যদি রেফার করা অপরিহার্য হয়, তাহলে—

১. রোগীকে আগে স্থিতিশীল (স্ট্যাবিলাইজ) করতে হবে।

২. প্রয়োজন হলে অক্সিজেন দিতে হবে।

৩. আইভি লাইন খুলতে হবে।

৪. অ্যান্টিভেনম দেওয়ার নির্দেশ থাকলে এবং তা মজুত থাকলে চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

৫. রেফারাল নোট লিখে রোগীর অবস্থা ও দেওয়া চিকিৎসা উল্লেখ করতে হবে।

৬. সম্ভব হলে গ্রহণকারী হাসপাতালের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করতে হবে।

৭. নিরাপদ পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে।

বলা বাহুল্য, জুলেখা খাতুনদের ক্ষেত্রে এসবের কোনোটিই করা হয় না। পত্রপাঠ অন্য হাসপাতালে সাপে কাটা রোগী চালান করে দেওয়াই এখন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অসীম কিছু করা সম্ভব

ঘাড় থেকে ঝামেলা ঝেড়ে ফেলার বদলে দায় আর দরদ দিয়ে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে, গত বছর এই সময় (২৯ জুলাই) অসাধ্য সাধন করেছিলেন নীলফামারীর সদর হাসপাতালের কতিপয় স্বাস্থ্যকর্মী আর চিকিৎসকেরা।

একজন দরিদ্র কৃষক সাপে কাটা রোগীকে নির্ঘাত মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন সাধারণ বুদ্ধি খাটিয়ে। উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করার আগে রোগীর দমটা ধরে রাখতে ব্যবহার করেছেন আর্টিফিশিয়াল ম্যানুয়াল ব্রিদিং ইউনিট, যা ‘অ্যাম্বু ব্যাগ’ নামে পরিচিত। এটি কৃত্রিম উপায়ে শ্বাসপ্রশ্বাস–সহায়ক যন্ত্র। ব্যাগ-ভালভ-মাস্ক নামেও এটি পরিচিত।

খুব সাধারণ এই চিকিৎসাযন্ত্রের বেলুনের মতো ফোলা অংশটি হাতে চাপ দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্টে থাকা রোগীকে শ্বাস চালিয়ে যেতে সাহায্য করা যায়। রোগী যখন দম নিতে পারেন না, তখন এটা ব্যবহার করা হয়। সেদিন নীলফামারী থেকে রংপুর নেওয়ার পথে সারা রাস্তা পালা করে স্বাস্থ্যকর্মীরা অ্যাম্বু পাম্প করে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখেন। বেঁচে যান কৃষক।

সাপের ছোবল থেকে বাঁচার অন্য কোনো উপায় আছে?

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার কর্তৃপক্ষ গত বছর সাপের ভয়ে ধান কাটার কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলে কৃষকদের মধ্যে গামবুট বিতরণের এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। চরাঞ্চলের ১৫০ জনের মধ্যে গামবুট বিতরণের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি চালু হলেও পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নের চাষিদের মধ্যে গামবুট বিতরণ করার কথা জানিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

সেটি আর হয়নি, তবে এটা একটি পদক্ষেপ হতে পারে। সাপে কাটার পর ওষুধের পেছনে রোগীপ্রতি খরচ প্রায় ১৬ হাজার টাকা, সেই টাকায় কমপক্ষে ১৬ জন কৃষককে সুরক্ষা দেওয়া যায়।

আর কী করা যায়

বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর সাপের কামড়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। তাই উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন এবং প্রতি উপজেলায় আইসিইউ স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (এনসিডিসি) সব সময় দাবি করে, দেশে অ্যান্টিভেনমের কোনো সংকট নেই। তা–ই যদি হয়, তাহলে কোন হাসপাতালে কবে, কত পরিমাণ সরবরাহ করা হয়, সেটা নিয়মিত বিরতিতে মানুষকে জানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন যে সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণকারী বা স্থায়ীভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য একটি জাতীয় ক্ষতিপূরণ বা সামাজিক সুরক্ষা তহবিল থাকা উচিত। কৃষক, জেলে, বনজীবীসহ উচ্চ ঝুঁকির পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ বিমা বা ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। যেহেতু সাপও বন্য প্রাণী এবং সাপের কামড় একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, তাই বর্তমান ক্ষতিপূরণ নীতিমালা পুনর্বিবেচনার দাবি রয়েছে।

বর্তমান অবস্থায়, বাংলাদেশে সাপের কামড়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যতামূলক কোনো জাতীয় সরকারি বিধান নেই। তবে ভবিষ্যতে আইন বা নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা প্রণয়ন করা সম্ভব।

  • গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

    wahragawher@gmail.com

    মতামত লেখক নিজস্ব