
আমার স্কুলজীবনের কাছের এক বন্ধু এইচএসসি বোর্ড পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছিল। অনার্স শেষ করে আমি দেশের বাইরে পড়তে গেলেও আমার সেই মেধাবী বন্ধু যেতে পারেনি। কারণ, তার পরিবার তাকে অবিবাহিত অবস্থায় দেশের বাইরে একা পড়তে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। পরিবারের এই নিয়ম সেই বন্ধু আর অতিক্রম করতে পারেনি।
সমাজের অদৃশ্য শিকল ভাঙতে না পারা সেই বন্ধুর কথা অনেক বছর পর মনে পড়ে গেল গত ৮ আগস্ট ২০২৬-এ তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেপালে যেতে বাধা দেওয়ার খবরটি পড়ে। ভ্রমণের অনুমতি না দেওয়ার কারণ হিসেবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তাঁরা অবিবাহিত নারী!
২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে এই বাধা দেওয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন এবং ভবিষ্যতে আইনি কারণ ছাড়া রিট আবেদনকারী নারী ত্রয়ীদের বাধা না দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন।
অন্যদিকে ২৭ সেপ্টেম্বর ফার্মগেটে মেট্রোস্টেশনে একজন অ্যাথলেটিকস কোচকে শর্টস পরার কারণে একজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রায় ৪০ মিনিট আটকে রাখেন বলে তিনি অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁকে বলা হয়েছিল পোশাকটি ‘অশালীন’ এবং তিনি যেন ট্রাউজার্স বা ফুলপ্যান্ট পরে আসেন। দুটি ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একজন ব্যক্তিকে তাঁর সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করতে কেবল বাধাই দিচ্ছে না, বরং মনমতো প্রেসক্রিপশন দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে যেন সে অনুযায়ী চলাফেরা করেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ কি তবে সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার স্বাধীনভাবে ভোগ করতে পারবেন, নাকি যখন-তখন কারও খেয়ালখুশিমতো বানানো নিয়মকানুনের বেড়াজালে পড়ে ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্য দিতে হবে আমাদের?
প্রথমেই দেখা দরকার পোশাক-আশাক পরিধান সম্পর্কিত আইনের কোনো ধারা বাংলাদেশে আছে কি না। না, এমন কোনো ধারা নেই। বরং বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১-এ বলা আছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩ অনুযায়ী কেবল নির্দিষ্ট আইনগত কারণে পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যান, সীমিত বা বাতিল করার বিধান রয়েছে। তাই ‘অবিবাহিত নারী’দের বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বা নির্দিষ্ট পোশাক পরা ব্যক্তিকে হেনস্তা করার মতো ঘটনা রীতিমতো বেআইনি ও ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার সাধারণ জনগণ তথা নারীর প্রতি আচরণ করে, সেটি অনেকভাবেই সমাজকে প্রভাবিত করে থাকে। যেমন রাষ্ট্র যখন মেয়েশিশু ও নারীদের অগ্রসরতার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেটি নারীদের কিছুটা এগিয়ে যেতে যেমন সাহায্য করে, তেমনি সমাজও নারীদের এই অগ্রসরমাণতাকে আত্মস্থ করে নিতে সম্মত হয় অনেকাংশে।
তবে সম্প্রতি উল্টোটাও দেখেছি আমরা। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে ‘মোরাল পুলিশিং’-এর নামে নারীদের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন উপায়ে হেনস্তা করা হয়েছে। যেমন ওড়না পরা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর হেনস্তা এবং পরবর্তী সময়ে হেনস্তাকারীকে বীরের মতো ফুল দিয়ে বরণ করে জামিন করিয়ে আনা, কিংবা লঞ্চে দুই নারীকে সবার সামনে পেটানো এবং পরবর্তী সময়ে প্রহারকারীর নিজ কর্মকে ‘বড় ভাই হিসেবে শাসন করা’ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে। আবার বিভিন্ন স্থানে জোর করে ধরে জনসমক্ষে চুল কেটে দেওয়ার মতো ঘটনাও দেখেছি আমরা।
ওই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোশাকের বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করেছিল, যা পরে তীব্র সমালোচনার মুখে প্রত্যাহার করা হয়। এই ধরনের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখা যায় না। কেননা, এগুলো হলো ব্যক্তিগত জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে অপকৌশলের প্যান্ডোরার বাক্স থেকে সুকৌশলে ছুড়ে দেওয়া একেকটি গুগলি বল মাত্র।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো, কীভাবে সাধারণ মানুষ এই ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, তা পর্যবেক্ষণ করা। একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে তাদের আকাঙ্ক্ষিত আচার-ব্যবহার ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সমাজে। যেমন ধরুন, অবিবাহিত হওয়ার কারণে তিনজন নারীকে বিদেশভ্রমণের এই নিষেধাজ্ঞার খবরটি যখন অন্য অবিবাহিত নারীরা পড়বেন, একসময় তাঁদেরও মনে হতে পারে, ‘আমি বিদেশভ্রমণে যেতে চাইলে আমার সঙ্গেও এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে’, যা হয়তো তাঁদের সেলফ-সেন্সরড করে ফেলবে নিজের অজান্তেই।
মুশকিল হলো, আমাদের দেশে গুরুতর জনস্বার্থ-সম্পর্কিত বিষয়ও তীব্র আলোচনার জন্ম দেওয়ার অল্প কিছুদিন পরই তা জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় আরও অগণিত নতুন খবরের ভিড়ে। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা বারবার আলোচনার দাবি রাখে; একইভাবে দাবি রাখে এই সব ব্যক্তিস্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিগগিরই সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করার।
প্রশ্ন আসতে পারে, কেন গুরুত্বের সঙ্গে এই সব ঘটনার পেছনের কারণ ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন? কেনই-বা প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনার? একটু ব্যাখ্যা করা যাক। তিনজন নারীকে যখন বলা হয় ‘তোমরা অবিবাহিত, তাই একা বিদেশে যেতে পারবে না’, এবং একজন পুরুষকে যখন বলা হয় ‘তোমার পোশাক অশালীন, তাই তুমি গণপরিবহনে উঠতে পারবে না’—ঘটনা দুটি আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন হলেও উভয় কর্তৃপক্ষের অন্তর্নিহিত যুক্তি কাঠামোর মধ্যে একটি মিল রয়েছে।
দুটি ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ প্রথমে একজন ‘উপযুক্ত’ বা ‘শালীন’ নাগরিকের আচরণের একটি মনগড়া মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, এরপর সেই মানদণ্ডের বাইরে থাকা ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। এভাবে আরোপিত কোনো সামাজিক বা নৈতিক মানদণ্ডকে যখন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়, তখন ব্যক্তিগত আচরণ কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় হয়ে থাকে না; বরং ক্রমে তা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিষয় হয়ে ওঠে।
এই দুই ঘটনার লিঙ্গভিত্তিক প্রভাবও এক নয়। যখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর পাসপোর্ট, ভিসা এবং বিদেশভ্রমণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও তাঁর বৈবাহিক অবস্থা এবং অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন তাকে পরোক্ষভাবে এটি বলার চেষ্টা করা হচ্ছে যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী মানেই একজন ‘স্বতন্ত্র ব্যক্তি’ নন, বরং তিনি পুরুষ ও পরিবারের অধীন ঊন-মানুষ মাত্র! বর্তমানে পুরো পৃথিবী যেখানে জেন্ডার সমতার কথা বলছে, সেখানে ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনার সূত্রপাত খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত ও হতাশাজনক।
সুতরাং বিষয়টিকে শুধু ‘কে কী পোশাক পরবে’ বা ‘একজন নারী একা বিদেশ যেতে পারবেন কি না’—এই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কেননা, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ যখন কোনো ব্যক্তির পোশাক, চলাফেরা বা বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘শালীনতা’, ‘নৈতিকতা’, ‘পারিবারিক সম্মান’ বা ‘উপযুক্ত আচরণ’-এর মতো কথিত মানদণ্ড দিয়ে বিচার করতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন ওঠে—কে ঠিক করছে কোন আচরণ স্বাভাবিক, শালীন বা গ্রহণযোগ্য? এবং সেই মানদণ্ড প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রকে কে দিয়েছে?
এটা পরিষ্কার হওয়া দরকার, একজন নাগরিক কি নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী, নাকি তাঁর লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা বা পোশাকের ভিত্তিতে তাঁর নাগরিক অধিকার ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হবে? তাই এ ধরনের অযাচিত ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা কোনো নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা প্রয়োগ করা হয়, তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলা আমাদের নাগরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব বলে মনে করি।
উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব