মতামত

ছেলেরা যৌন সহিংসতার শিকার হলে আমরা কেন নীরব থাকি

দেশে শিশু নির্যাতন নিয়ে সাম্প্রতিক জন-আলোচনায় একটি লক্ষণীয় বৈপরীত্য ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা যথার্থভাবেই নৈতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে অবস্থান করলেও পথশিশু ও ছেলেশিশুর প্রতি প্রতিদিনের সহিংসতা, শোষণ এবং অবহেলা থেকে যায় আলোচনার প্রান্তে, যা মূলত দৃশ্যমান বাস্তবতার মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যায়।

এই অদৃশ্যতা কেবল তথ্যের ঘাটতি নয়, বরং এটি একটি সামাজিকভাবে নির্মিত দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা, যেখানে সব সহিংসতা সমানভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না।

সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলো এই অদৃশ্য বাস্তবতার আংশিক উন্মোচন করে। পথশিশুদের জীবনের যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা যায় যে তারা নিয়মিতভাবে শারীরিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, মাদক চক্রে জড়িয়ে পড়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির শিকার হয়। কিন্তু এই সহিংসতাগুলো ধারাবাহিকভাবে জন-আলোচনার কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারে না, বরং সেগুলো প্রান্তিক বাস্তবতা হিসেবেই থেকে যায়।

বিবিসি নিউজ বাংলার প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে ছেলেশিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রকাশিত হয় না। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ১০ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর ওপর সংঘটিত গুরুতর যৌন সহিংসতার ঘটনাটি কেবল তখনই জনসমক্ষে আসে, যখন তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন মাদ্রাসার সুপার বা তত্ত্বাবধায়ক, যা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

২০২৫ সালের আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে একটি শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হলেও তা দীর্ঘ সময় আড়ালে থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি সামনে আসে কেবল তখনই, যখন ক্ষতি অপরিবর্তনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এমন এক পুনরাবৃত্ত বাস্তবতার অংশ, যা আমরা জানি কিন্তু দেখতে শিখিনি। এই সংকট ঘটনাগত নয় বরং জ্ঞানতাত্ত্বিক। আমরা কীভাবে সহিংসতাকে দেখি এবং কেন কিছু সহিংসতা আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, আর কেন কিছু থেকে যায় অদৃশ্য?

আমরা পুরুষের ওপর যৌন সহিংসতা দেখতে পাই না, কারণ আমাদের চিন্তাজগৎই ছেলেশিশু বা পুরুষকে ভুক্তভোগী হিসেবে কল্পনা করতে শেখেনি। আর এই না শেখাটিও চরম রাজনৈতিক একটি বিষয়, কারণ এটি সেই দ্বৈত চিন্তাকেই টিকিয়ে রাখে, যেখানে সমাজের এক পক্ষ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাবান, আর অন্য পক্ষ সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন।

এই না দেখার পেছনে কাজ করে একটি নির্বাচিত দৃষ্টি, যেখানে সহানুভূতি নিজেই একটি বাছাই করা কাঠামোর ভেতর বিতরণ হয়। সমাজ-বৈজ্ঞানিকভাবে একে কম্প্যাশন হায়ারার্কি বা সহানুভূতির স্তরবিন্যাস হিসেবে বোঝা যায়। যেখানে কিছু ভুক্তভোগীর প্রতি দ্রুত নৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, আর কিছু ভুক্তভোগী ‘স্বাভাবিকীকরণের’ মধ্যে পড়ে।

কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা আমাদের নৈতিকভাবে দ্রুত নাড়া দেয়, কারণ নারীত্বকে ঐতিহাসিকভাবে অরক্ষিত এবং রক্ষাযোগ্য হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু একজন ছেলেশিশু, বিশেষত যদি সে পথশিশু হয়, তার ভুক্তভোগিতা আমাদের নৈতিক কল্পনার কেন্দ্রে প্রবেশ করে না। এই অদৃশ্যতার পেছনে কাজ করে সামাজিক লজ্জা, পুরুষত্বের ধারণা এবং আইনি সীমাবদ্ধতার জটিল আন্তসম্পর্ক।

বিষয়টি বোঝার জন্য তাত্ত্বিকভাবে ক্ষমতা, জ্ঞান এবং দৃশ্যমানতার সম্পর্কের দিকে ফিরে যেতে হয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী মিশেল ফুকোর পাওয়ার/নলেজ অথবা ক্ষমতা ও জ্ঞানের ধারণা আমাদের দেখায় যে ক্ষমতা কেবল দমনমূলক নয়। এটি নির্ধারণ করে কোন অভিজ্ঞতা ভাষা পাবে এবং কোনটি নীরব থাকবে। যখন আইন ধর্ষণকে নারীভিত্তিক অভিজ্ঞতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, তখন তা কেবল একটি আইনি সীমা নির্ধারণ করে না, বরং এটি নির্ধারণ করে কে ভুক্তভোগী হিসেবে কল্পিত হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ান সমাজবিজ্ঞানী রায়উইন কনেলের হেজিমনিক ম্যাসকুলিনিটি বা আধিপত্যশীল পুরুষত্বের ধারণা দেখায়, পুরুষকে শক্তি, নিয়ন্ত্রণ এবং অপ্রভাবিত থাকার প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা হয়। যার ফলে একজন ছেলেশিশুর ভুক্তভোগিতা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। জোহান গালতুংয়ের কাঠামোগত সহিংসতা তত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সহিংসতা সব সময় দৃশ্যমান হয় না, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরেই পুনরুৎপাদন হয়। লারা স্টেম্পল দেখিয়েছেন, ধর্ষণ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনাও ঐতিহাসিকভাবে নারীকেন্দ্রিক হওয়ায় পুরুষ ভুক্তভোগিতা ধারাবাহিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।

একইভাবে মার্কিন দার্শনিক জুডিথ বাটলারের গ্রিভ্যাবিলিটি বা শোকযোগ্যতার ধারণা দেখায় যে সব জীবন সমানভাবে শোকযোগ্য হিসেবে স্বীকৃত নয়। কিছু জীবন এমনভাবে নির্মিত হয়, যাদের ক্ষতি আমাদের কাছে ক্ষতি হিসেবেই প্রতীয়মান হয় না। এসব তাত্ত্বিক অবস্থান একত্রে আমাদের দেখায় যে পথশিশু ও ছেলেশিশুর প্রতি সহিংসতা একটি দ্বৈত অদৃশ্যতার মধ্যে আবদ্ধ। এটি একদিকে সামাজিকভাবে অদৃশ্য, অন্যদিকে আইনগতভাবে অস্বীকৃত।

এই অদৃশ্যতা আইনগত কাঠামোর মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। পেনাল কোড ১৮৬০ এর ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা নারীভিত্তিক হওয়ায় পুরুষ বা ছেলেশিশু আইনগতভাবে ধর্ষণের ভুক্তভোগী হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা আইনের ভাষায় নামহীন থেকে যায়।

এই সীমাবদ্ধতাকে আংশিকভাবে পূরণ করার জন্য পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারার আশ্রয় নেওয়া হলেও, এটি একটি মৌলিক আইনি শূন্যতা তৈরি করে। কারণ, এই ধারা মূলত ক্রিয়াটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, কিন্তু ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা, সম্মতি এবং ক্ষমতার অসম সম্পর্ককে আলাদা করে চিহ্নিত করে না। ফলে যৌন সহিংসতা একটি ক্ষমতার প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং একটি অস্বাভাবিক আচরণ হিসেবে প্রতিফলিত হয়।

একইভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ শিশু সুরক্ষার কিছু কাঠামো প্রদান করলেও পুরুষ শিশুর যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতা এখনো আংশিক ও অস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। এর ফলে একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ফারাক বা এপিস্টেমিক গ্যাপ তৈরি হয়। বাস্তবে সহিংসতা বিদ্যমান থাকলেও আইনের ভেতরে তার যথাযথ ভাষার অভাব রয়েছে। এই অবস্থাকে লিগ্যাল ইনভিজিবিলিটি বা আইনি অদৃশ্যতা হিসেবে বোঝা যায়, যেখানে ভুক্তভোগী উপস্থিত থাকলেও তার অভিজ্ঞতা পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি পায় না।

পথশিশুরা প্রায়ই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অসম্পূর্ণ নাগরিক। তাদের জন্মনিবন্ধন নেই, স্থায়ী ঠিকানা নেই এবং সামাজিক পরিচয় অনিশ্চিত। ফলে তাদের প্রতি সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি অত্যন্ত কাঠামোগত।

অন্যদিকে পুরুষত্বের সামাজিকীকরণ ছেলেশিশুকে শেখায় যে কাঁদা যাবে না, দুর্বলতা দেখানো যাবে না এবং সবকিছু সহ্য করতে হবে। এই সামাজিকীকরণ তাদের সহিংসতার শিকার হওয়ার পরও নীরব থাকতে বাধ্য করে। যার ফলে সহিংসতা কেবল ঘটেই না, তা নীরবতার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পুনরুৎপাদন হয়। গণমাধ্যমও এই নির্বাচিত দৃষ্টিকে পুনরুৎপাদন করে। কিছু সহিংসতা সংবাদযোগ্য হয় এবং কিছু একেবারেই বাদ পড়ে যায়। ফলে সহানুভূতিও পরিণত হয় একটি সীমিত সম্পদে।

এ যেন এক কম্প্যাশন ইকোনমি বা সহানুভূতির অর্থনীতি, যেখানে সব কষ্ট সমানভাবে মূল্যায়িত হয় না। অতএব, প্রশ্নটি কেবল সহিংসতার নয়, এটি আমাদের দৃষ্টিরও প্রশ্ন। আমরা কীভাবে সহিংসতা দেখি এবং কীভাবে সহিংসতা দেখতে শিখি, সেটা জরুরি বিষয়। কারণ, আমরা যা দেখি না, সেটিই মূলত সহিংসতাকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সমাজে টিকিয়ে রাখে।

অন্যদিকে সমসাময়িক জনপরিসরে পুরুষকে প্রায়ই ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়। এই নির্মাণ পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার সমালোচনাকে শক্তিশালী করলেও, পুরুষের ভুক্তভোগিতার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি আড়াল করে দেয়। ফলে পুরুষ, বিশেষত ছেলেশিশু একটি দ্বৈত অবস্থানে পড়ে। সে একদিকে ক্ষমতার প্রতীক, অন্যদিকে চরম নীরব এক ভুক্তভোগী।

আমরা পুরুষের ওপর যৌন সহিংসতা দেখতে পাই না, কারণ আমাদের চিন্তাজগৎই ছেলেশিশু বা পুরুষকে ভুক্তভোগী হিসেবে কল্পনা করতে শেখেনি। আর এই না শেখাটিও চরম রাজনৈতিক একটি বিষয়, কারণ এটি সেই দ্বৈত চিন্তাকেই টিকিয়ে রাখে, যেখানে সমাজের এক পক্ষ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাবান, আর অন্য পক্ষ সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন।

ছেলেশিশুর যৌন সহিংসতায় আমাদের সামষ্টিক প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগই যেন তৈরি হয় না, কারণ আমরা দুর্বল পুরুষকে কোনোভাবেই স্বীকার করতে চাই না। আমাদের এই অস্বীকার তাদের ওপর হয়ে আসা সহিংসতাকে নীরবেই টিকিয়ে রাখে। আর এই যৌন সহিংসতাকে আমরা দিনের পর দিন অস্বীকার করি বলেই তারা গড়ে ওঠে এমন এক অস্তিত্ব হিসেবে, যারা প্রতিবাদে না বলতে পারে না। আর এই না বলতে না পারার দীর্ঘ অভ্যাসের ভেতরেই তাদের ভেতর আজীবন জমতে থাকে প্রবল দমন, ক্ষোভ ও নীরব ক্রোধ।

  • ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ানা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব