মতামত

প্রশাসনে দলীয় নিয়োগের সংস্কৃতি কি ভাঙবে না

বাংলাদেশে যখন ক্ষমতার পটভূমি পরিবর্তিত হয়েছে, এরপরই পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে প্রশাসন সাজানোর সংস্কৃতি চর্চিত হয়ে আসছে। মেধানির্ভরতা কিংবা যোগ্যতানির্ভরতাকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক দলীয় অনুগতদের দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকাঠামো ক্ষমতাসীনদের শাসনব্যবস্থায় ‘প্রভুত্বশীল’ মনস্তত্ত্ব তৈরি করলেও এ ব্যবস্থা থেকে এবারও মুক্তি মিলছে না।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হওয়া ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশের মানুষ যখন ভোটাধিকার প্রয়োগ করল, নতুন সরকার গঠন করল, এর পর থেকে আমরা সেই পুরোনো কাঠামোয় দেশ পরিচালনার দৃশ্যায়ন দেখতে শুরু করেছি। সাংবিধানিক পদ থেকে শুরু করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগগুলোতে আবার দলীয়করণের খবরাখবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। কোথাও মব করে আবার কোথাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করে, বিভিন্ন সংস্থা, দপ্তরে বদলি, চাকরিচ্যুতির ঘটনা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

চব্বিশের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হলো, সেই সরকার গঠনের পরও আমরা ঠিক একই প্রবণতা দেখলাম। দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করানো হলো, মবের মুখে বিচারকদের পদত্যাগ থেকে শুরু করে প্রশাসনের অনেক কিছুতে পরিবর্তন আনা হলো।

গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে বিষয়টিকে স্বাভাবিক মনে করা হলেও সেটি যে সেই পুরোনো কাঠামোর আদলেই ‘সরকারের’ পছন্দনীয় গোষ্ঠী কিংবা সরকারের ভেতর প্রভাব বিস্তারকারী কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের পছন্দের ব্যক্তিদের পদায়ন দিয়ে পুরো প্রশাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছিল। সে সময়ও মেধাভিত্তিক ও যোগ্যতাভিত্তিক প্রশাসক, সচিব কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের নিয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; বরং গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, কে কে আওয়ামী লীগবিরোধী ছিলেন। কে কে আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন, তাঁদের ছেঁটে ফেলে নতুনদের নিয়োগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ইতিরকম ভিড় লেগে গিয়েছিল। পদায়নবঞ্চিত কিংবা ভিন্নমতাদর্শদের মৌখিক, কাগুজে সনদে অধ্যাপক ইউনূস সরকারের সরকারকাঠামো রচিত হয়েছিল। দিন শেষে দেখা গেল, ওই প্রশাসনই ইউনূস সরকারের কাঁধে চেপে সরকারের গতিপথ মন্থর করে ফেলেছিল।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এরই মধ্যে প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরকে ‘মব করিয়ে’ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেটিকে চাকরিচ্যুত করাই বলা যায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানসহ পুরো কমিশন এক দিনে পদত্যাগ করেছে। বিভিন্ন মন্ত্রাণালয়ে সচিব পরিবর্তন হচ্ছে, কাউকে কাউকে ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার আইন দেখিয়ে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। এই সরকার চাইছে তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করতে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিজেদের অনুগত দলীয় আদর্শের লোকবল দিয়ে সরকার পরিচালনা করলে কি সরকার ভালোভাবে পরিচালিত হবে? মেরোটোক্রেসি কিংবা কম্পিটেন্সির বৈচিত্র্য না থাকলে আদৌ কি আমরা দেশের গুণগত পরিবর্তন করতে পারব? এ প্রশ্নের উত্তর জানার আগে জানতে হবে, ক্ষমতাসীনেরা কেন দলীয়করণ প্রশাসনকে পছন্দ করে।

প্রথমত, দলীয়করণ প্রশাসন হলে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতৈক্য তৈরিতে সুবিধা হয়। দ্বিতীয়ত, নিজ দলীয় এজেন্ডা কিংবা নির্বাচনী ইশতেহার প্রতিপালন করতে গলদঘর্ম হতে হয় না। তৃতীয়ত, দলীয়করণ প্রশাসন থাকলে কেন্দ্রীয় নিদের্শনা অনুযায়ী নেটওয়ার্কিং বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়।

দলীয় অনুগত কর্মকর্তাদের তালিকা থেকে বেছে বেছে প্রশাসন সাজানোর এই সেকেলে নিয়মের কারণে সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে না। একজন মন্ত্রী কিংবা এমপি ভুল, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি করার পরও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রাও করার সুযোগ পান না।

অপর দিকে দলীয়করণ প্রশাসন কার্যকরের ফলে দেশে নতুন করে ‘অনুগত’ কিংবা গৃহপালিত প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, যেখানে ভিন্নমতের কিংবা আইডিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও বাস্তবায়নের সুযোগ মেলে না। ফলে ‘স্তুতিকর’ সম্প্রদায়ের দাপটে পুরো প্রশাসনকাঠামো কিংবা ক্ষমতার চুম্বকত্ব এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। স্বৈরাচারের কাঠামোয় প্রবেশের ঝুঁকি থাকে। প্রজন্মের মেধার সঠিক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়।

এমন ঝুঁকি থেকে বের হওয়ার জন্য অধ্যাপক ইউনূস সরকার নানা ধরনের সংস্কার সুপারিশের কথা বললেও বাস্তবতার নিরিখে তারা যেমন প্রয়োগ করতে পিছিয়ে ছিল, তেমনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার ঠিক একই পথে পা বাড়াচ্ছে।
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নকাঠামোর কথা চিন্তা করলে সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে দেশ এগিয়ে যাবে। পাহাড় থেকে সমতল কিংবা আঞ্চলিকতার চক্র থেকে বের হতে হবে।

মূলত যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্যতা অনুযায়ী সঠিক স্থানে পদায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন সম্ভবপর হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন ব্যক্তির মেধা অবশ্যই যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। ব্যক্তির রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় পছন্দ ও অপছন্দের প্রভাব কর্মক্ষেত্রে যেন না পড়ে, সে সংস্কৃতির বিকাশ আনতে হলে সরকারকে নতুন করে সুযোগ ও সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করতেই হবে।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ সবার। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়া ব্যক্তিরা নিশ্চয় রাজনৈতিক, লিঙ্গ কিংবা ধর্মের পরিচয়ে পাস করেন না। বরং নিজেদের যোগ্যতার মাধ্যমে তাঁরা দেশ পরিচালনার সুযোগ পান। তাই ব্যক্তির পরিচয় কেবল অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও মেধানির্ভর হতে হবে।

হ্যাঁ, এই দেশে প্রশাসনকাঠামোয় অবৈধ সুযোগ–সুবিধা, বিশেষ করে নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য সুবিধাবাদী কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা-কর্মচারী শাখায় নাম লেখেন, এটিও হয়েছে মূলত সরকারকাঠামো কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হওয়ার জায়গা থেকে। ফলে কে কোন দলীয় বিশ্বাসী কর্মকর্তা, তা মন্ত্রী, এমপি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর নখদর্পণে চলে যায়।

দলীয় অনুগত কর্মকর্তাদের তালিকা থেকে বেছে বেছে প্রশাসন সাজানোর এই সেকেলে নিয়মের কারণে সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে না। একজন মন্ত্রী কিংবা এমপি ভুল, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি করার পরও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রাও করার সুযোগ পান না। আইন অনুযায়ী চলার চেষ্টা করলে পরে তাঁরাও হেনেস্তার শিকার হন। মূলত এসব কারণে সরকারি কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগকর্ম চলে পছন্দের ব্যক্তিদের মাধ্যমে।

একটি শক্তিশালী মেরুদণ্ডওয়ালা জাতি গঠন করতে হলে ভিন্নমতাদর্শের পদ-পদায়নে যেমন বাধা প্রদান করা যাবে না, তেমনি পছন্দের রাজনৈতিক দলের সরকার না থাকায় সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়াও সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত হবে না। মনে রাখতে হবে, সবার আগে দেশ, তারপর ব্যক্তি, এরপরও রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের বিষয় থাকতে পারে। এটি করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে, এভাবে সরকার পরিবর্তিত হলে নতুন সরকারের সময় হুমকি দিয়ে পদচ্যুতির রেওয়াজ কখনোই থামবে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় একধরনের প্রভুত্ব এসে ভর করবে। দলীয়করণের বিষে নীল হয়ে যাবে বাংলাদেশের এগিয়ে চলার স্বপ্ন। তাই নতুন সরকারকে অনুরোধ করব, মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা সচল করুন।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: nadim.ru@gmail.com
    মতামত লেখকের নিজস্ব