রাষ্ট্র পরিচালনায় উপযুক্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন করা ইতিহাসের সব যুগেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে বিবেচিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতে দুর্নীতিগ্রস্ত নন্দ বংশের পতনের পর মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে, যার পেছনে ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর রাজনৈতিক গুরু চাণক্য। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সিংহাসনে আরোহণ ও পরবর্তীকালে চাণক্যর প্রজ্ঞা প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় মন্ত্রী নিয়োগের কঠোর মানদণ্ডের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু ক্ষমতা দখলের বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও কৌশলগত দূরদর্শিতা।
চাণক্যের রচিত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রে অমাত্য ও মন্ত্রী নিয়োগের কিছু মানদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এমন মানুষ প্রয়োজন যিনি জ্ঞানী, বিচক্ষণ, স্মৃতিশক্তিতে প্রখর, যুক্তিবাদী, সাহসী ও কাজের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। একই সঙ্গে তাঁকে হতে হবে সদাচারী, ধৈর্যশীল, গর্বশূন্য, কষ্টসহিষ্ণু ও মানুষের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে পারদর্শী। অর্থাৎ প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্বের সমন্বয় আছে এমন ব্যক্তিকেই মন্ত্রী হওয়ার উপযুক্ত মনে করা হতো।
যদিও প্রাচীন রাজতন্ত্র আর আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে, তবু একটি বিষয় একই থাকে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট অঞ্চল, জনগোষ্ঠী ও ইতিহাস সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও সংবেদনশীলতা থাকা জরুরি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। মন্ত্রিসভা গঠনের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
দীপেন দেওয়ান পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্য হলেও প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল পার্বত্য এলাকার বাসিন্দা নন এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তও নন। প্রায় তিন দশক আগে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের পর নির্বাচিত সরকারের আমলে এ ধরনের নিয়োগ এই প্রথম—এমন দাবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর পরপরই প্রশ্ন ওঠে—এই নিয়োগ কি ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বর্তমান নিয়োগকে অনেকেই চুক্তির উদ্দেশ্য ও চেতনার পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন।
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন জোট পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একজন অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহারের দাবি জানায়। তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ে আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। ৩ মার্চ ঢাকায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি পুনর্গঠন, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সক্রিয়করণ এবং পার্বত্য পরিষদগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরুর দাবি জানায়। এ ছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি পাহাড়ের ৩৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই নিয়োগের প্রতিবাদ জানিয়ে একে চুক্তির লঙ্ঘন আখ্যা দেন এবং প্রতিমন্ত্রীকে অন্য মন্ত্রণালয়ে পদায়নের আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস কমিশন ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইনডিজিনাস অ্যাফেয়ার্স (আইডব্লিউজিআইএ) নবনির্বাচিত সরকারকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি একই মন্ত্রণালয়ে অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব ক্ষুণ্ন করতে পারে। সংগঠন দুটি সরকারের কাছে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণা, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা, ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি সংরক্ষণ, আটক বম সম্প্রদায়ের সদস্যদের সুষ্ঠু বিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি জটিল অঞ্চল—এখানে ভূমিবিরোধ, বাস্তুচ্যুতি, আস্থাহীনতা ও প্রান্তিকতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো ও সংঘাতের গতিশীলতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীর অভিজ্ঞতার ঘাটতি পার্বত্য অঞ্চলে কার্যকর নীতিনির্ধারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত যখন ভূমি, পরিচয় ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল, তখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আস্থার ঘাটতি রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করতে পারে।
সম্প্রতি পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ে ইকো–ট্যুরিজম উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে গত বছর জাতিসংঘের স্পেশাল প্রসিডিউরস ব্যবস্থার আওতায় ৯টি থিমেটিক ম্যান্ডেটের বিশেষ প্রতিবেদক ও ওয়ার্কিং গ্রুপ পাহাড়ে পর্যটনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে তাঁরা বাংলাদেশের সরকারের কাছে চিঠিও পাঠান।
তাঁদের পাঠানো চিঠিতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে ট্যুরিজমসহ অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যক্রম আদিবাসীদের স্বাধীন, পূর্বানুমোদিত ও অবহিতকরণপূর্বক সম্মতি ছাড়া বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে পাহাড়ি আদিবাসীদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন, সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর রূপান্তর ও প্রান্তিকীকরণ, ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে উচ্ছেদ, জোরপূর্বক স্থানান্তর এবং পুনর্বাসনে উদ্যোগহীনতার মতো গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
চিঠিতে এসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের সুরক্ষায় সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়। বিশেষভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে করপোরেশন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সামরিক অংশীদারদের কাছে ভূমি ইজারা দেওয়ার আইনি কাঠামো সম্পর্কেও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
এ ছাড়া ভূমি ইজারার ক্ষেত্রে আদিবাসীদের স্বাধীন, পূর্বানুমোদিত ও অবহিত সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা আছে কি না এবং আদিবাসী অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কী ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, সে বিষয়েও সরকারের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়।
তবে জানা যায়, ওই চিঠির কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তর দেওয়া হয়নি। নবগঠিত বিএনপি সরকারের আমলেও চিঠিতে উত্থাপিত পরিস্থিতিগুলোর কোনো গুণগত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যথাযথ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ এবং আদিবাসীদের সম্মতি ছাড়া যদি নতুন ইকো ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, তবে তা বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করতে পারে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু তা হতে হবে মানবাধিকারসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পার্বত্য চুক্তির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টি তাই কেবল ব্যক্তিগত বা দলীয় সিদ্ধান্ত নয়। এটি পার্বত্য চুক্তির অঙ্গীকার, আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সংবেদনশীলতা ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সরকার যদি উত্থাপিত উদ্বেগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দপ্তর পুনর্বণ্টন, চুক্তি বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা ও অংশগ্রহণমূলক সংলাপের উদ্যোগ নেয়, তবে তা পার্বত্য অঞ্চলে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। অন্যথায়, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাসকে আরও গভীর করার ঝুঁকি বহন করবে। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিচক্ষণতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে সেই শিক্ষাই আজ নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
• মিলিন্দ মারমা আদিবাসী লেখক ও অধিকারকর্মী। ই-মেইল: milinda.marma@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব