মতামত

খণ্ডিত বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের পথচলা কেমন হবে

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। এমন এক সময়ে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা গভীর হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুদ্ধ, বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা, শুল্কনীতি, প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, জলবায়ু–সম্পর্কিত বাণিজ্যনীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন—সবকিছুই এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বিশ্বায়ন থেকে ভূ-অর্থনীতির দিকে

একসময় বিশ্বায়নের মূল চালিকা শক্তি ছিল অর্থনৈতিক দক্ষতা। এখন সেই হিসাব বদলেছে। কম খরচের পাশাপাশি কোন দেশ রাজনৈতিকভাবে কতটা নির্ভরযোগ্য, যুদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞায় সরবরাহব্যবস্থা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কোন প্রযুক্তি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কতটা—এসব বিষয়ও এখন সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থাকে বিভিন্ন দেশ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা যদি ভূরাজনৈতিকভাবে বিভক্ত কয়েকটি বলয়ে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে বিশ্ব জিডিপি ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং বিশ্ব রপ্তানি ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির জন্য এটি বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ, বড় অর্থনীতির তুলনায় দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ছোট দেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা কম।

সবার সঙ্গে সম্পর্ক, তবে নির্ভরতা কমাতে হবে

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস এবং শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রয়োজন সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে একই সঙ্গে রপ্তানিবাজার, বিনিয়োগের উৎস, প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে হবে। এতে কোনো একটি দেশ বা বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে এবং জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন

বাংলাদেশ আমদানি করা জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও প্রবাসী আয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, জ্বালানি ভর্তুকির কারণে সরকারের আর্থিক চাপ বাড়তে পারে, আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে। স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি আমদানির উৎস ও চুক্তিতে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। মধ্য মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং সঞ্চালন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন

কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতা দেখিয়েছে যে অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল সরবরাহব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন শুধু কম খরচ নয়, সরবরাহের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল গ্রহণ করছে; অর্থাৎ চীনে কার্যক্রম রাখার পাশাপাশি অন্য দেশেও উৎপাদনের ব্যবস্থা করছে। আবার কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে সরবরাহব্যবস্থা ছড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে একটি উৎসে সমস্যা হলে পুরো উৎপাদনব্যবস্থা থেমে না যায়।

এসব পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সুযোগ আপনা-আপনি বাংলাদেশের কাছে আসবে না। ২০২৫ সালে বিশ্বে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই ৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও এর ৮০ শতাংশের বেশি গেছে শীর্ষ ২০টি গন্তব্যে। কাজেই বাংলাদেশকে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নিজের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো। এর জন্য সক্রিয় ও দূরদর্শী নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং একটি সহনশীল ও বহুমুখী দেশীয় অর্থনীতি প্রয়োজন।

প্রযুক্তিও এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ

সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ক্লাউড অবকাঠামো, ডেটা, ব্যাটারি, টেলিযোগাযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন শুধু ব্যবসার বিষয় নয়; এগুলো কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই; বরং যেসব ক্ষেত্রে বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোতে দক্ষতা তৈরি করা দরকার। যেমন চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং, এআই দক্ষতা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো। তাই প্রযুক্তিনীতিকে এখন শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।

 জলবায়ু নীতিও হয়ে উঠছে বাণিজ্যনীতি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম বা সিবিএএম ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সার, বিদ্যুৎ, হাইড্রোজেনসহ কিছু পণ্য এর আওতায় রয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এখনো এর প্রধান আওতাভুক্ত খাত নয়। কিন্তু এ কারণে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। পণ্যের কার্বন নিঃসরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পানির ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎপাদনব্যবস্থা, পণ্যের উৎস শনাক্ত করার সক্ষমতা এবং পরিবেশগত মান ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তৈরি পোশাক যেহেতু বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত, তাই সবুজ রূপান্তরকে শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে রপ্তানি ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হিসেবেও দেখতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি

এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের মধ্যেই বাংলাদেশের ২৪ নভেম্বর ২০২৬ স্বল্পোন্নত দেশের বা এলডিসির তালিকা থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। বাংলাদেশ প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলে সাধারণ পরিষদ সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইকোসকও ২৪ নভেম্বরের আগে বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেছে।

নভেম্বরে উত্তরণ হোক কিংবা সময় বাড়ানো হোক—বাংলাদেশের প্রস্তুতি থামানোর সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে আরও কঠোর রুলস অব অরিজিন, শ্রম ও পরিবেশগত মান, মেধাস্বত্বের শর্ত এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার মোকাবিলা করতে হবে। তাই রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন বাণিজ্যচুক্তি করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

বাংলাদেশের সামনে পথ

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো। এর জন্য সক্রিয় ও দূরদর্শী নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং একটি সহনশীল ও বহুমুখী দেশীয় অর্থনীতি প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাফল্যের মাপকাঠি হবে—বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও অর্থনীতিকে কতটা স্থিতিশীল রাখা যায়, কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, মানুষের আয় ও সমৃদ্ধি কতটা বাড়ানো যায় এবং জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত করা যায়।

  • ড. ফাহমিদা খাতুন, অর্থনীতিবিদ, লেখক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো

    মতামত লেখকের নিজস্ব