বিশ্বনিরাপত্তার ইতিহাসে আমরা এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর যে নীতি, অনুমান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আপেক্ষিক বৈশ্বিক স্থিতি নিশ্চিত করেছিল, তা এখন মোচড় খাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই দশকে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে। ভবিষ্যতে কি আরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিরোধে গড়ে উঠবে, নাকি স্বৈরতান্ত্রিক আগ্রাসন আরও বিস্তার লাভ করবে—তা এই দশকেই নির্ধারিত হবে।
বিশ্বব্যবস্থায় এই মহারূপান্তর ঘটার পেছনে তিনটি বড় পরিবর্তন কাজ করছে।
প্রথমত, বিশ্ব এখন নিছক নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতে চলে এসেছে। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণ ইউরোপ মহাদেশে আবার যুদ্ধ ফিরিয়ে এনেছে। একই সঙ্গে অন্য স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা পুরোনো নিরাপত্তা ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। চীন সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক প্রভাব ও সাইবার অভিযানের মাধ্যমে ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলের কৌশলগত চিত্র পাল্টাতে চাইছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার কিছু ঐতিহ্যগত মিত্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক মিত্রদেশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত ধারণা পুনর্বিবেচনা করছে।
দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতি, সমাজ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে দ্রুত বদলে দিতে শুরু করেছে। যে দেশ এই প্রযুক্তিকে সবচেয়ে দক্ষভাবে কাজে লাগাতে পারবে, সে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত—উভয় ক্ষেত্রেই নির্ণায়ক সুবিধা পাবে। যুদ্ধ এখন তথ্যকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এখানে গতি, নির্ভুলতা এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক ব্যবস্থার নমনীয়তাই হচ্ছে মূল শক্তি। নিছক বলপ্রয়োগের চেয়ে অভিযোজনক্ষমতাই এখন বড় কৌশলগত সম্পদ।
এই বাস্তবতার মুখে পুরোনো কাঠামো আঁকড়ে থাকলে চলবে না। দেশগুলোকে পরিবর্তনগুলো স্বীকার করে প্রস্তুতি নিতে হবে। ইউরোপ ও এশিয়ার গণতান্ত্রিক দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আত্মতুষ্টি কাটিয়ে তারা নিরাপত্তাকৌশল হালনাগাদ করেছে এবং প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে।
২০২২ সালে জার্মানি স্বীকার করে, তারা একটি ‘জাইটেনভেন্ডে’ (ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুহূর্ত) অতিক্রম করছে। এরপর তারা ১০০ বিলিয়ন ইউরোর (১১৮ বিলিয়ন ডলার) একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা তহবিল গঠন করে। ২০২৪ সালের মধ্যে তাদের সামরিক ব্যয় দাঁড়ায় ৮৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। পুনরেকত্রীকরণের পর প্রথমবারের মতো জার্মানি মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশ এবং বিশ্বে চতুর্থ স্থানে উঠে আসে। পোল্যান্ড ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ও আধুনিক স্থলবাহিনী গড়ে তুলছে এবং এ বছর প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
ইউরোপের বাইরে জাপান এ বছর প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এমন পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা অর্জনের পথে হাঁটছে, যা কিছুদিন আগেও রাজনৈতিকভাবে অকল্পনীয় ছিল। অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রতিরক্ষা কাঠামো পুনর্গঠন করছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উন্নত শিল্প সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে তারা দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা, সাবমেরিনভিত্তিক অভিযান সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
এই পদক্ষেপগুলো দেখায়—প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয় এবং তা বজায় রাখতে হয়। বিশ্বাসযোগ্য সামরিক শক্তি ছাড়া স্থিতি ও স্বাধীনতা রক্ষা সম্ভব নয়। তবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালেই যে কার্যকর সামরিক সক্ষমতা বাড়ে, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যয় সামরিক দক্ষতার চেয়ে দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস বন্ধ হয়ে যাওয়া গাড়ি কারখানাকে সামরিক উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। সেখানে কর্মসংস্থানের বিষয়টি সামরিক কার্যকারিতার চেয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছে।
ফ্রান্স ও ইতালির নৌজাহাজ নির্মাণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধ সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও শিল্পোন্নয়ন সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
কিছু ইউরোপীয় দেশ এখন চাইছে ন্যাটো অবকাঠামো বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও যে টাকা খরচ হয়, তা প্রতিরক্ষা বাজেটের হিসাবের মধ্যে দেখানো হোক। তারা যুক্তি দিচ্ছে, এতে দেশের সহনশীলতা বা প্রস্তুতি বাড়ে।
কিন্তু এখন স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলো দ্রুত তাদের সেনা ও সামরিক ক্ষমতা আধুনিক করছে এবং হুমকি দেখাতে আগ্রহী। তাই এ সময়ে প্রতিরক্ষা বাজেটের একটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত—সবচেয়ে শক্তিশালী, কার্যকর এবং সক্ষম সেনাবাহিনী গড়ে তোলা।
এই বাহিনীকে বিংশ শতাব্দীর কাঠামো, ধীর ক্রয়প্রক্রিয়া এবং শিল্পযুগের ‘সংখ্যাগত ভর’-নির্ভর ধারণায় আবদ্ধ রাখা যাবে না। যেমন উদ্ভাবনী স্টার্টআপের চ্যালেঞ্জের মুখে পুরোনো করপোরেশনকে বদলাতে হয়, তেমনি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার এই যুগে সেনাবাহিনীকে নিজেদের ক্রমাগত নবায়ন করতে হবে, যাতে তারা গুণগত সুবিধা ধরে রাখতে পারে।
এর অর্থ পুরোনো সবকিছু পরিত্যাগ করা নয়—ঐতিহ্যগত ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু নতুন প্রযুক্তি ও নতুন কৌশলকে দ্রুত গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ জেতার মতো অস্ত্র ও সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। গতি, অভিযোজন ও উদ্ভাবননির্ভর এই যুগে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বিঘ্ন নয়, বিলম্ব।
গণতান্ত্রিক বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো বুঝতে পারছে—নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে এবং এক নতুন যুগের প্রস্তুতি জরুরি। এই বিরল রাজনৈতিক সমঝোতা, কৌশলগত স্বচ্ছতা ও অভিন্ন উদ্দেশ্যের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামনে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল বিশ্বের ভিত্তি স্থাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তবে সেই প্রয়াসে আজকের চেয়ে আরও বেশি ঐক্য প্রয়োজন। সুযোগ হাতছাড়া হলে আগামী দিনের যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত প্রতিপক্ষের কাছে তারা দ্রুত পিছিয়ে পড়বে।
● জেমস রাইসেফ স্পেশাল কম্পিটিটিভ স্টাডিজ প্রজেক্টের প্রতিরক্ষাবিষয়ক পরিচালক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ