অন্তর্বর্তী সরকারের ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের ৪২ শতাংশই চট্টগ্রামে।—খবরটি দৈনিক বণিক বার্তার। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে নেওয়া ২ লাখ ১২ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের ৮৯ হাজার ২৯৭ কোটি টাকাই চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য বরাদ্দ হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৪২ শতাংশ। বরাদ্দের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, মোট বরাদ্দের ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে খুলনা বিভাগ, মোট উন্নয়ন বরাদ্দের ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। বরাদ্দের ক্ষেত্রে চতুর্থ স্থানে রয়েছে সিলেট বিভাগ, মোট বরাদ্দের ২ দশমিক ৫১ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে পঞ্চম স্থানে রয়েছে রংপুর বিভাগ। এ বিভাগের জেলাগুলোয় উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বশেষ একনেকে চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্প সাবেক একজন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে, যার বাড়ি সংশ্লিষ্ট জেলায়।
‘হামার বেটাক মারলু ক্যান?’—দেয়ালে দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ল শহীদ আবু সাঈদের মায়ের প্রশ্ন; কিন্তু যখন সরকার গঠন করা হলো, তখন উত্তরবঙ্গে কোনো যোগ্য লোক ছিল না একজন উপদেষ্টা হওয়ার। পরে যখন আরও উপদেষ্টা নেওয়া হলো, তখনো রংপুর বিভাগের কাউকে পাওয়া গেল না। শেষে প্রধান উপদেষ্টা নিজেই হয়ে গেলেন রংপুরের প্রতিনিধি। এমনটাই শহীদ আবু সাঈদের মাকে গিয়ে বলেছিলেন তিনি।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দেশজুড়ে ১৭টির মতো কালচারাল প্রতিষ্ঠান আছে। অথচ বৃহত্তর রংপুরে রাজবংশী বা অংপুরিয়া ভাষার একটি প্রতিষ্ঠান নেই। অথচ অংপুরিয়া ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য একটি ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউটের দাবি দীর্ঘদিনের।
কুড়িগ্রাম জেলার ২২ শতাংশ ভূমি ব্রহ্মপুত্রের চরগুলোতে। সেগুলোর একেকটার আয়তন সিঙ্গাপুরের সমান। নদীভাঙনই সেখানকার জনগণের জীবনমান নিচু হওয়ার প্রধান কারণ। স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা অসম্ভব। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চরশাখাহাতী ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গত এক বছরে তিনবার ভাঙনের শিকার। পুরো চিলমারী ইউনিয়নে একটি হাইস্কুল নেই। নয়ারহাট ইউনিয়নের একমাত্র হাইস্কুলটি এ পর্যন্ত পাঁচবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। অষ্টমীরচর ইউনিয়নের নটারকান্দি হাইস্কুলটি গত দুই বছরে তিনবার ভেঙে এখন দুটি অংশের এক ভাগ নটারকান্দি চরে, আরেকটি অংশ চর মুদাফৎ কালিকাপুরে স্থাপন করা হয়েছে। সব কটিই নতুন করে ভাঙনের মুখে।
২০১৪ সালের একটি পোস্টারে রেল, নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি দেখিয়েছে, সারা দেশের মানুষ যেখানে গড়ে সাড়ে ১২ কেজি মাছ খেতে পারেন, কুড়িগ্রাম জেলার মানুষ সেখানে পান মাত্র ৮ কেজি।
গত দুবারের খানা জরিপে একবার ৬৩ শতাংশ, আরেকবার ৭১ শতাংশ গরিব মানুষ নিয়ে দারিদ্র্যের শীর্ষে কুড়িগ্রাম জেলা। গত ১৬ মাসে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নতুন করে নিবন্ধন পেয়েছে ২৫০টির মতো। তার মধ্যে রংপুর বিভাগ চার–পাঁচটিও পায়নি। কেন পায়নি জানতে চাইলে বলা হয়েছে, শর্ত পূরণ করতে পারেনি। তার মানে দুর্বলেরা চিরকাল দুর্বলই রবে।
এ অঞ্চলের তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে উপার্জন বৃদ্ধির জন্য বিটিআরসিতে আবেদন করা হয়েছিল। তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁরা মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির কাজটা করতে পারেন মাত্র; কিন্তু নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দক্ষতা বৃদ্ধি ও উপার্জনক্ষম করে গড়ে তোলা তাঁদের কাজ নয়। অথচ মাত্র পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে দুই হাজার তরুণকে স্বাবলম্বী করে কুড়িগ্রামের অর্থনীতিকে অনেকটা বদলে দেওয়া সম্ভব।
২০১৪ সালের একটি পোস্টারে রেল, নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি দেখিয়েছে, সারা দেশের মানুষ যেখানে গড়ে সাড়ে ১২ কেজি মাছ খেতে পারেন, কুড়িগ্রাম জেলার মানুষ সেখানে পান মাত্র ৮ কেজি। এ ছাড়া কুড়িগ্রামের জেলেরা ব্রহ্মপুত্রে মাছ ঘাটতি হওয়ায় আসামে মাছ শিকারে যাচ্ছেন। করোনার সময় ২৬ জন জেলে ভারতে আটকা পড়েছিলেন মাছ মারতে গিয়ে। তাই নদ–নদী ও প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রগুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। এটা নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
ছয় মাস ধরে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বেজার সঙ্গে বেশ কয়েকটি সভা করেছে। তারা ৫০ একর জায়গা চেয়েছে স্কিলস প্রসেসিং জোন করবে বলে। সারা দুনিয়া থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে বিনিয়োগ করবে—নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, প্রি-ফ্যাব হাউজিং, সিক্স-জি ওয়েল্ডিংসহ বিভিন্ন খাতে। সিঙ্গাপুর মানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র হবে।
অর্থনীতিবিদ ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পলিসি অ্যাডভাইজার জিয়া হাসান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমাদের রেডি ডিমান্ড আছে। তিনটি জাপানি প্রতিষ্ঠান অর্থ, প্রযুক্তি ও সেটআপ নিয়ে বসে আছে কার ড্রাইভিং ট্র্যাক করার লক্ষ্যে। ৩০ একর জায়গা লাগবে, বছরে ১০ হাজার ড্রাইভার নিয়ে যাবে। এমওইউ রেডি। জাস্ট জায়গা দেন, তিন মাসের মধ্যে সেটআপ করবে। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানসহ অনেক জাপানি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত।
সেই জাপানি বিনিয়োগকারীরা অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, ‘জায়গা দিন।’ তাঁদের বলা হয়েছে, ‘কালিয়াকৈরে জায়গা দেখেন।’
জিয়া হাসান আরও লিখেছেন, ৩০ একর জায়গা দিলে, ৬ মাসের মধ্যে জাপানি কার ড্রাইভিং ট্র্যাকে ভাষা শেখানোসহ ৩০ হাজার জনবল তৈরি করে নিয়ে যেত। কমপক্ষে পাঁচটি মিটিং ও বারবার দেখা করার পরও কোনো পজিটিভ প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি।
অথচ কুড়িগ্রাম জেলায় কাজটি করা গেলে উত্তরবঙ্গে দারিদ্র্য থাকত? সুনীল গাঙ্গুলীর কবিতা থেকে ধার নিয়ে বলতে হয়, ৫৪ বছর গেল, কেউ কথা রাখে না।
● নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক। ই–মেইল: nahidknowledge1@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব