শীতের তীব্রতা জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ঠান্ডাজনিত রোগে অনেক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি, অনেকে মারাও গেছেন। এ পরিস্থিতে নতুন করে হানা দিয়েছে ‘নিপাহ ভাইরাস’। একটার পর একটা দুর্যোগ যেন লেগেই আছে। তবে নিপাহ ভাইরাস নিয়ে ভয় নয়, দরকার সচেতনতা। এই ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়, এ থেকে প্রতিরোধের উপায় আমাদের জানতে হবে এবং অন্যদের জানাতে হবে।
নিপাহ ভাইরাস একটি মারাত্মক ও সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মানুষ ও প্রাণী উভয়ের জন্যই অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ফলখেকো বাদুড়। বাদুড়ের লালা বা মূত্রে দূষিত ফল কিংবা খেজুরের কাঁচা রস গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ এতে সংক্রমিত হতে পারে। এ ছাড়া সংক্রমিত প্রাণী বা মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায়।
নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগের নানা লক্ষণ রয়েছে। নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমিত হলে প্রথম দিকে রোগীর হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও বমি ভাব দেখা দেয়। ধীরে ধীরে রোগীর মধ্যে দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট এবং অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব লক্ষ করা যায়। রোগের অবস্থা গুরুতর হলে মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, ফলে বিভ্রান্তি, অচেতনতা, খিঁচুনি এবং কখনো কোমায় চলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই রোগ প্রাণঘাতী হতে পারে। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে নির্দিষ্ট কোনো টিকা বা কার্যকর ওষুধ এখনো নেই। তাই এর চিকিৎসা মূলত লক্ষণভিত্তিক ও সহায়ক।
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় সাধারণত জ্বর কমানোর ওষুধ, শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন দেওয়া এবং শরীরের পানিশূন্যতা দূর করার ব্যবস্থা করা হয়। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে তাকে আইসিইউতে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মস্তিষ্কে প্রদাহ বা খিঁচুনি দেখা দিলে সেগুলোর জন্য আলাদা চিকিৎসা করা হয়।
এ ছাড়া রোগীর সংক্রমণ যেন অন্যদের মধ্যে না ছড়ায়, সে জন্য রোগীকে আলাদা রাখা এবং চিকিৎসক ও সেবাদানকারীদের যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধের জন্য সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক ফলখেকো বাদুড় হওয়ায় বাদুড়ের লালা বা মূত্রে দূষিত কোনো ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে খেজুরের কাঁচা রস পান করা সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা উচিত। ফল খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। বর্তমানে শীতের সকালে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া খুবই জনপ্রিয় শখ। বিপুলসংখ্যক মানুষ তা করে থাকেন; বিশেষত তরুণেরা, যা নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি হাজার গুণে বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য খেজুরের কাঁচা রস পান থেকে বিরত থাকতে হবে।
সংক্রমিত ব্যক্তি বা প্রাণীর খুব কাছাকাছি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। রোগীর সেবা দেওয়ার সময় মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার এবং হাত পরিষ্কার রাখা জরুরি। হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা ও নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
এ ছাড়া নিপাহ ভাইরাস সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগী শনাক্ত করে আলাদা রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করাই এ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ভয় নয়, সচেতনতাই বাঁচাতে পারে এই ভয়াবহ ভাইরাস থেকে। তাই নিজেও সচেতন হতে হবে এবং অন্যদের সচেতন করতে হবে।
সেঁজুতি মুমু শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।