
ইরানের পর ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু পাকিস্তান কিনা, তা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত আগ্রাসনের মুখে ইরানের যুদ্ধের ক্ষমতা কমে আসছে। তারপরও দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নাগরিকেরা লড়বেন হয়তো। সেই লড়াই সামনের দিনগুলোতে কী চেহারা নেবে, অনুমান করা দুঃসাধ্য। ইরানের সমর্থক হিজবুল্লাহকে দমনের নামে এ মুহূর্তে লেবানন ধ্বংসে মেতেছে ইসরায়েল। এর মাঝে প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসী অক্ষশক্তি ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইরান এবং সর্বশেষ লেবাননের পর আর কোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তু করবে কি না? বিশেষ করে, এ বিষয়ে পাকিস্তানকে ঘিরে সৃষ্ট গুঞ্জন কতটা বাস্তবসম্মত?
প্রশ্ন হিসেবে এটা অভিনব। কিন্তু জাতিসংঘ এবং ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রায় পুরো অকার্যকারিতার মুখে এ রকম প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বসাও রূঢ় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে—বিশেষ করে যখন বাস্তবেও এ রকম আলামত উপস্থিত।
ইরানে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যৌথ হামলার তিন দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলে যান। তিনি ফেরার পর একদিকে যুদ্ধ শুরু হলো; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে জন্ম হয়েছে পাকিস্তানকে নিয়ে নতুন শঙ্কা ও আঁচ-অনুমান। দুর্ভাবনাটি এই যে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা যদি মুসলমানপ্রধান ইরানকে জায়নিস্টদের চক্ষুশূল করে থাকে, তাহলে একই আক্রোশের শিকার হতে পারে পাকিস্তানও। বিশেষ করে ভারত-ইসরায়েল বন্ধুত্ব যেভাবে গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, তাতে ইসলামাবাদের জন্য দূরবর্তী এক সতর্কবার্তা আছে।
► ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মাঝে ইতিমধ্যে চার দফা বড় যুদ্ধ হয়ে গেছে। পরস্পরকে তারা চিরশত্রু হিসেবে গণ্য করে পারমাণবিক বোমার বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলেছে। ► বিশ্বজুড়ে অন্তত ৯টি দেশে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে। তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও। সে ক্ষেত্রে ইরান বা পাকিস্তানের হাতে একই সমরাস্ত্র প্রযুক্তি থাকলে সমস্যা কোথায়?
গাজা গণহত্যায় নির্মমতার জন্য নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েল যখন বিশ্বজুড়ে চরম নিন্দিত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঠিক তখনই লাল কার্পেট মাড়িয়ে সেই দেশে গেলেন। এটা যতটা না বিশ্বজনমতকে অবজ্ঞা করা, তার চেয়েও বেশি ছিল পাকিস্তানবিরোধী ব্যবহারিক মৈত্রী দৃঢ় করা। মোদির সফরের আগে-আগে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়েছেন ভারতকে কেন্দ্রে রেখে গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে নতুন অক্ষশক্তি গড়তে চায় তেল আবিব। তাঁর ভাষায়, ‘শিয়া অক্ষশক্তি’র মতো ‘সুন্নি অক্ষশক্তি’র বিরুদ্ধেও আঘাত হানব আমরা।
এই বক্তব্যে সরাসরি কোনো দেশের নাম না থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় ভীতি ছড়াচ্ছে তা। কারণ, পাকিস্তানকে নিয়ে তুরস্ক ও সৌদি আরব সামরিক জোট করতে চাইছে কিছুকাল ধরে। নেতানিয়াহুর কাছে এটাই ‘সুন্নি অক্ষশক্তি’!
পাকিস্তান যে ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, সেটা খোদ দেশটির নীতিনির্ধারকেরাও বিভিন্ন সময় বলেছেন। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফও ৩ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, পাকিস্তানকে একটা অনুগত রাষ্ট্র বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে জায়নবাদীদের। ইরানে সফল হওয়ার পর ভারত ও আফগানিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েল সেটা বাস্তবায়ন করতে চাইবে। এ প্রসঙ্গে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার সীমান্তের উল্লেখ করে খাজা আসিফ বলেন, প্রথমোক্ত দেশে জায়নবাদীদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম শেষে কোনো পুতুল সরকার বসলে তার প্রভাব তাঁদের সীমান্তেও পড়বে। এই বক্তব্যে খাজা আসিফ তাঁর দেশের নিরাপত্তায় পারমাণবিক বোমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকারও উল্লেখ করেন।
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে গিয়ে পাকিস্তানে এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ জন মারা গেছেন। নিজ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বিবৃতিও সেখানকার নাগরিক সমাজে বিশেষ মনোযোগ পেয়েছে। বহির্বিশ্বেও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর উদ্বেগ বড় খবর তৈরি করেছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁর শঙ্কা কতটা বাস্তব?
বিশ্বজুড়ে অন্তত ৯টি দেশে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে। তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলও। সে ক্ষেত্রে ইরান বা পাকিস্তানের হাতে একই সমরাস্ত্র প্রযুক্তি থাকলে সমস্যা কোথায়? এ রকম প্রশ্ন যৌক্তিক হলেও তার উত্তর চাওয়া বা দেওয়ার মতো মেরুদণ্ডসম্পন্ন আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা এখন আর নেই। বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ঠিক করে দেবে কার কাছে কী ধরনের অস্ত্র কতটা থাকতে পারবে বা আদৌ থাকতে পারবে কি না। পছন্দ-অপছন্দের এই সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও দাপট বেশি ইসরায়েলের। তারা চায় মুসলমানপ্রধান কোনো দেশের হাতে পারমাণবিক প্রযুক্তি না থাকুক।
তাদের এই চাওয়ার নিজস্ব অনেক ব্যাখ্যা আছে। সেসবের সারকথা, মুসলমানপ্রধান এমন কোনো দেশ তারা দেখতে চায় না, যারা আরব ভূমিতে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ কায়েমে বিরোধিতা করতে পারে। মুসলমানপ্রধান কোনো দেশের হাতে এ রকম প্রযুক্তি থাকলে সেটা একই ধর্মাবলম্বীদের অন্যান্য দেশের কাছেও যেতে পারে বলে তাদের দাবি। ইসরায়েলের এই দুই বিবেচনার সঙ্গে ভারতের আরএসএস-বিজেপি পরিবারের সায় আছে। সে জন্যই নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ নিয়ে দুবার ইসরায়েল গেলেন।
পাকিস্তানের সঙ্গে নিজেদের ঐতিহাসিক বিবাদ ও শত্রুতার সমীকরণে ভারতের এখনকার শাসকেরা ইসারায়েলকেও টেনে আনতে চায়। বিষয়টা উল্টোভাবেও বলা যায়, পারমাণবিক প্রযুক্তি বিষয়ে ইসরায়েল নিজের আন্তদেশীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়াদিল্লির সঙ্গে মৈত্রীর সুযোগ দেখছে। এভাবেই পাকিস্তানের জন্য নতুন এক দুর্ভাবনার জায়গা তৈরি হচ্ছে—খাজা আসিফ যে কথা খোলামেলা বলে ফেললেন।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর শঙ্কা পুরোনো কিছু খবরাখবরের আলোকেও যৌক্তিক মনে হয়। ১৯৮১ সালেও একবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ রকম খবর ফাঁস হয়েছিল, পাকিস্তানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে যৌথভাবে হামলা চালাতে ভারতকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে ইসরায়েল—যেভাবে তারা সেই সময় ‘অপারেশন ব্যাবিলন’ নাম দিয়ে ইরাকের একটা রিঅ্যাক্টর ধ্বংস করেছিল। ইসরায়েল-ভারতের সেই সময়কার আলাপ-আলোচনা-উদ্যোগ নিয়ে ২০০৮ সালে ক্যাথরিন স্কট-ক্লার্ক এবং এড্রিয়ান লেভি বইও লিখেছিলেন।
পাকিস্তান-ইসরায়েল দূরত্ব তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি। প্রতিবেশী নয় তারা। জায়নবাদীরা যদি পরিকল্পিত বৃহত্তর একটা রাষ্ট্র গঠন করতে চায়ও—যেমনটি এখন বেশ আলোচিত, তাতে পাকিস্তান সরাসরি আক্রান্ত হবে না। ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ধারণায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ফিলিস্তিনের ভূমির পাশাপাশি সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও জর্ডানের এলাকা। ওই কল্পিত ভূমির অনেক স্থানে ইসরায়েলের শাসকেরা ইতিমধ্যে রাজনৈতিক-সামরিক নিয়ন্ত্রণও কায়েম করেছে। এসব দেশের স্থলভূমিতে ইহুদি বসতি স্থাপন শুরু হয়নি বটে, কিন্তু আকাশসীমায় ইসরায়েলকে বাধা দেওয়ার অবস্থায় নেই আর তারা।
সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননের নিত্যদিনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনে পাকিস্তান কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি ইসরায়েলের। সেই সুযোগও নেই। তারপরও পাকিস্তানকে নিয়ে তেল আবিবের উদ্বেগের একটা কারণ হয়তো এই যে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্প কোনো না কোনো সময় মুসলমানপ্রধান আরব বিশ্বে আত্মরক্ষার সম্মিলিত এক তাগিদ তৈরি করতে পারে। সেই সময় পাকিস্তানের যুদ্ধশক্তি তেল আবিবের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সম্প্রতি পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি আরব মিলে যে সামরিক জোট গড়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেটা ইসরায়েলকে ভাবিয়ে তুলছে। গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তিকে সম্ভাব্য ওই জোটের অংশ আকারে দেখছে ইসরায়েল।
পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্র করে তুলতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ায় নয়াদিল্লির নেতৃত্বও নিরঙ্কুশ হয়। পাকিস্তানের পর ইসরায়েলের জন্য সর্বশেষ দুর্ভাবনা হতে পারে কেবল তুরস্ক। মোদি-নেতানিয়াহুর উদীয়মান আদর্শিক পথনকশা সৌদি আরবের জন্যও দূরবর্তী এক সতর্কসংকেত।
ইরানের পর এ রকম কথিত ‘সুন্নি জোট’ তাদের ভবিষ্যতে চাপে ফেলতে পারে বলে ইহুদি জেনারেলদের অনুমান। সম্প্রতি ইসরায়েলে আমেরিকান ইহুদি নেতাদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও সম্ভাব্য ওই ত্রিদেশীয় জোটকে নিজেদের ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ বলে উল্লেখ করেন। সেখানকার দৈনিকগুলোতে সম্ভাব্য এই জোটকে ‘ইসলামি ন্যাটো’ বলেও অভিহিত করা হচ্ছে।
ভারতের বর্তমান সরকারের জন্য জায়নবাদীদের এ রকম ভাবনা বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। আরএসএস পরিবারের শাসনামলে ভারতকে পাশে পেয়ে ইসরায়েলের শাসকেরা খুবই উজ্জীবিত। মোদির ‘ইসরায়েল-ভারত-ইউরোপ করিডর’ প্রস্তাব নিয়েও ইহুদি নেতৃত্ব বেশ উৎসাহী। ২৫ ফেব্রুয়ারির সফরকালে মোদি যখন হামাসের প্রতিরোধযোদ্ধাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করছিলেন, তখন ইসরায়েলের নেসেটে তুমুল হাততালি পড়ছিল।
ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মাঝে ইতিমধ্যে চার দফা বড় যুদ্ধ হয়ে গেছে। পরস্পরকে তারা চিরশত্রু হিসেবে গণ্য করে পারমাণবিক বোমার বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলেছে। বিধ্বংসী অস্ত্রের এ রকম বিশাল মজুত এবং পরস্পরকে নির্মূলের প্রাত্যহিক বাসনায় জ্বালানি জুগিয়েই উভয় দেশের মূলধারার রাজনীতি টিকে আছে। ঠিক এই পটভূমিতে নয়াদিল্লি ও তেল আবিব এমন এক সম্পর্কের সম্ভাবনা দেখছে, যেখানে তারা উভয়ে লাভবান হতে পারে। সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে তাড়ানো এবং ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর ইসরায়েলের জন্য আপাতত আশপাশের অঞ্চলে নিরাপত্তা হুমকি বলে কিছু নেই। কিন্তু কোনো উপায়ে যদি সব মুসলমানপ্রধান দেশকে পারমাণবিক প্রযুক্তিশূন্য করা যায়, সেটা তার জন্য বাড়তি স্বস্তির বিষয় হতে পারে।
আবার, ভারতের সশস্ত্র বাহিনী চারটি যুদ্ধেও পাকিস্তানকে চূড়ান্ত কাবু করতে না পেরে ইসরায়েলের মাঝে এমন এক সমরবাদী বন্ধুকে দেখছে, যে তাকে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে বিজয়ী করতে পারে।
এবার ইসরায়েলের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে মোদি বলছিলেন, ‘তোমরা হলে পিতা, আমরা মাতা।’ এটাই হয়তো হিন্দুত্ববাদী আদর্শের সঙ্গে জায়নবাদের মিলনে নতুন সেই কল্পিত সমরবাদের ডাক, যা একদিকে আরব ভূমিতে দখলদার সংস্কৃতির অন্ধ স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় অনুরূপ নীতিচর্চার ইঙ্গিতবহ। মোদির ওই উক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ধর্মীয়-জাতিবাদী আগ্রাসনকে এই অঞ্চলেও টেনে আনার বার্তা আছে। হয়তো বাংলাদেশেও তার আঁচ লাগতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে ইসলামাবাদ স্বঘোষিত এই ‘পিতা-মাতা’দের পরবর্তী লক্ষ্য।
পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্র করে তুলতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ায় নয়াদিল্লির নেতৃত্বও নিরঙ্কুশ হয়। পাকিস্তানের পর ইসরায়েলের জন্য সর্বশেষ দুর্ভাবনা হতে পারে কেবল তুরস্ক। মোদি-নেতানিয়াহুর উদীয়মান আদর্শিক পথনকশা সৌদি আরবের জন্যও দূরবর্তী এক সতর্কসংকেত। কারণ, আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিসরে ভারতীয়দের বিপুল উপস্থিতি রয়েছে, যাদের মোদির সঙ্গে মৈত্রীকালে ইসরায়েল ভূরাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে গণ্য করছে।
পাকিস্তান ছাড়া পারমাণবিক শক্তিধর অন্য কোনো দেশের বোমা নিয়ে ইসরায়েলকে কখনো দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতাকে কখনো ধর্মীয়ভাবে ব্যাখ্যা করা হয় না। তাদের বোমাকে কেউ খ্রিষ্টান বোমা বলে না। ভারতের বেলাতেও সে রকম ঘটেনি। কিন্তু পাকিস্তানের বেলায় ‘ইসলামিক বোমা’ কথাটি জুড়ে দেওয়া হয়।
পাকিস্তান এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করার পর ভারতের বর্তমান শাসকেরা ইসরায়েল থেকে নানা ধরনের সামরিক প্রযুক্তি আয়ত্ত করার ওপর বেশ জোর দিচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের মতো দক্ষিণ এশিয়াতেও আন্তরাষ্ট্রীয় সামরিক ভারসাম্যহীনতাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। মোদির এবারের ইসরায়েল সফরের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যুদ্ধসক্ষমতা বাড়ানোর উপায় খোঁজা। সফরের মধ্য দিয়ে ভারতে ইসরায়েলের এমন সব সামরিক প্রযুক্তি আসার পথ খুলছে, যেসবের ছাড়ে বহুকাল শেষোক্ত দেশ রাজি ছিল না। তার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের বিখ্যাত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আয়রন বিম’ এবং ‘আয়রন ডোম’।
ভারত সরকার সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহে তাদের নতুন উদ্যোগকে বলছে ‘মিশন সুদর্শন চক্র’; যাতে কেবল প্রতিরক্ষা নয়, নতুন প্রজন্মের উন্নত আক্রমণাত্মক মিসাইল প্রযুক্তিও যুক্ত হবে। এই উদ্যোগ নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী তেল আবিব গেলেন। উভয় দেশ এখন এ ধরনের অস্ত্রভান্ডারের যৌথ উন্নয়ন এবং যৌথ উৎপাদনে যাবে বলে প্রচার রয়েছে, যা আদানিদের সঙ্গে ইসরায়েলি এলবিট সিস্টেমের যৌথ ড্রোন প্রকল্পের চেয়েও বহুমুখী কিছু হবে।
উল্লেখ্য, ইসরায়েল-ভারত যৌথ সামরিক উদ্যোগগুলোতে গবেষণা ও উৎপাদনের পাশাপাশি অস্ত্রের সহযোগিতামূলক লেনদেনও যে অন্তর্ভুক্ত গাজা আগ্রাসনে তার নজির মেলে। আল-জাজিরার এক অনুসন্ধানে (২৬ জুন ২০২৪) দেখা যায়, ভারতীয় উৎপাদকেরা (যেমন প্রিমিয়ার এক্সপ্লোসিভ লি.) সেসময় ধারাবাহিকভাবে তেল আবিবকে রকেট ও বিস্ফোরক দিয়েছে।
যে ধরনের কূটনৈতিক ‘সমঝোতা’র ভিত্তিতে ইসরায়েল-ভারত এসব যৌথ আয়োজন চলছে, সে রকম সমঝোতা তেল আবিবের সঙ্গে ওয়াশিংটন ও বার্লিনেরও রয়েছে বহু আগে থেকে। ফলে ইসরায়েল-ভারত সামরিক যৌথতায় পশ্চিমা সামরিক প্রযুক্তি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের পুরোনো মৈত্রীও অন্তর্ভুক্ত থাকছে। স্বভাবত ইসলামাবাদের দিকে চ্যালেঞ্জটা বহুমাত্রিক। পাকিস্তানের জন্য বাড়তি উদ্বেগ হলো—দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের মূল মজুদ যেখানে, সেই বেলুচিস্তানেই বর্তমানে গুরুতর আঞ্চলিক বিদ্রোহ চলছে।
● আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব