মতামত

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অ্যাক্রিডিটেশন সনদ লাভের উপযোগিতা কী

উচ্চশিক্ষা একটি জাতির বৌদ্ধিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। সমকালীন বিশ্বব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষার পরিধি যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

এই প্রেক্ষাপটে ‘অ্যাক্রিডিটেশন’ বা ‘স্বীকৃতি’ শব্দটি উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে এক অপরিহার্য বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাধারণ অর্থে অ্যাক্রিডিটেশন হলো একটি উচ্চশিক্ষালয় বা তার অধীন পরিচালিত কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রমের গুণগত মান যাচাইয়ের একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। যখন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কিছু বৈশ্বিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা, অবকাঠামো, গবেষণা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা পর্যালোচনা করে সন্তোষজনক রায় দেয়, তখনই সেই প্রতিষ্ঠান অ্যাক্রিডিটেশন সনদ লাভ করে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এই মানদণ্ড নির্ধারণ ও তদারকির দায়িত্ব পালন করছে ‘বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই সনদ অর্জন কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব, গ্রহণযোগ্যতা এবং উৎকর্ষের চূড়ান্ত মাপকাঠি।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অ্যাক্রিডিটেশন সনদ লাভের সবচেয়ে বড় উপযোগিতা হলো শিক্ষার গুণগত মান সুনিশ্চিত করা। একটি উচ্চশিক্ষালয় যখন এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, তখন তাকে তার পাঠ্যক্রম বা কারিকুলামকে সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী পরিমার্জন করতে হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা এমন জ্ঞান অর্জন করে, যা কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং কর্মমুখী ও প্রায়োগিক।

অ্যাক্রিডিটেশন প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের যোগ্যতা, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। ফলে ল্যাবরেটরি সুবিধা, লাইব্রেরির আধুনিকায়ন এবং গবেষণার পরিবেশ উন্নত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। এটি পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের একটি সমৃদ্ধ ও আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করে। যখন কোনো প্রোগ্রাম অ্যাক্রিডিটেশন লাভ করে, তখন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা নিশ্চিত হতে পারেন যে এ প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড বজায় রাখতে সক্ষম।

​শিক্ষার্থীদের পেশাগত জীবনে অ্যাক্রিডিটেশন সনদের প্রভাব অপরিসীম। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে চাকরির বাজার এখন আর নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশি-বিদেশি বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর ডিগ্রির চেয়ে ওই ডিগ্রির ‘অ্যাক্রিডিটেশন স্ট্যাটাস’ বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

একজন নিয়োগকর্তা যখন দেখেন যে প্রার্থী একটি অ্যাক্রিডিটেড বিভাগ থেকে পাস করেছে, তখন তার কাছে ওই প্রার্থীর দক্ষতা ও শেখার মান নিয়ে কোনো সংশয় থাকে না। বিশেষ করে প্রকৌশল, চিকিৎসা এবং ব্যবসায় শিক্ষার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পেশাজীবী সংস্থাগুলোর অ্যাক্রিডিটেশন ছাড়া পেশাগত লাইসেন্স পাওয়া অনেক দেশেই অসম্ভব।

উদাহরণস্বরূপ, বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা বা গবেষণার জন্য যখন কোনো শিক্ষার্থী আবেদন করেন, তখন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রথমেই যাচাই করে দেখে যে শিক্ষার্থীর মূল প্রতিষ্ঠানটি অ্যাক্রিডিটেশন প্রাপ্ত কি না। যদি না থাকে, তবে অনেক সময় শিক্ষার্থীর ক্রেডিট গ্রহণ করা হয় না বা তাকে অতিরিক্ত কোর্স করতে হয়। তাই ডিগ্রির আন্তর্জাতিক পাসপোর্টের মতো কাজ করে এই সনদ।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অ্যাক্রিডিটেশনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এটি মূলত একটি আয়নার মতো কাজ করে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতাগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। অ্যাক্রিডিটেশন লাভের প্রক্রিয়ায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ‘সেলফ-অ্যাসেসমেন্ট’ বা আত্ম-মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা এমনকি সাবেক শিক্ষার্থীদের মতামত গ্রহণ করা হয়।

​অ্যাক্রিডিটেশন কেবল একটি সনদ নয়, এটি একটি নিরন্তর অগ্রযাত্রার নাম। একবার সনদ পেয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নির্দিষ্ট সময় পরপর আবার মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়। এই তদারকি ব্যবস্থার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি পজিটিভ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এক বিভাগ অন্য বিভাগের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করে, এক বিশ্ববিদ্যালয় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে মান উন্নত করার প্রতিযোগিতায় নামে। এই সুস্থ প্রতিযোগিতা সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গতিশীল করে তোলে।

এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রশাসনিক ও একাডেমিক ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার করতে পারে। একটি অ্যাক্রিডিটেড বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিকভাবেই মেধাবী শিক্ষক এবং গবেষকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। মানসম্পন্ন শিক্ষকমণ্ডলী থাকলে সেখানে গবেষণার মান বৃদ্ধি পায়, যা পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে সামনের সারিতে নিয়ে আসে। আধুনিক বিশ্বে র‍্যাঙ্কিং ও অ্যাক্রিডিটেশন একে অপরের পরিপূরক।

​আর্থিক ও কাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অ্যাক্রিডিটেশন একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা যখন কোনো প্রজেক্ট বা গ্র্যান্ট প্রদান করে, তখন তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অ্যাক্রিডিটেশন প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচন করে।

এর কারণ হলো, তারা নিশ্চিত হতে চায় যে তাদের অর্থ একটি সুশৃঙ্খল এবং মানসম্মত পরিবেশে ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে অ্যাক্রিডিটেশন লাভের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ড ভ্যালু বা প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে একটি বড় বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন সচেতন, তারা ভর্তির আগেই দেখে নেয় সংশ্লিষ্ট বিভাগটির অ্যাক্রিডিটেশন আছে কি না। এর ফলে মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা এবং রাজস্ব আয় স্থিতিশীল থাকে, যা দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিষ্ঠানের টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করে।

জাতীয় পর্যায়ে অ্যাক্রিডিটেশনের গুরুত্ব আরও সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে, সেখানে শিক্ষার মান বজায় রাখা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। অ্যাক্রিডিটেশন প্রক্রিয়া এই মানহীনতার লাগাম টেনে ধরে। এটি উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। যেসব প্রতিষ্ঠান কেবল মুনাফার উদ্দেশ্যে কোনোমতে ডিগ্রি প্রদান করে, তারা অ্যাক্রিডিটেশনের কঠোর মানদণ্ডে টিকতে পারবে না।

ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র মানহীন শিক্ষার অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়। একটি দেশ যখন দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির চিন্তা করে, তখন সেই জনশক্তির ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকা বাধ্যতামূলক। অ্যাক্রেডিটেশন প্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েটরা যখন বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে, তখন দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও সম্মান বৃদ্ধি পায়। এটি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মেধাবী ও দক্ষ নাগরিক তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করে।

​অ্যাক্রিডিটেশন কেবল একটি সনদ নয়, এটি একটি নিরন্তর অগ্রযাত্রার নাম। একবার সনদ পেয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নির্দিষ্ট সময় পরপর আবার মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়। এই তদারকি ব্যবস্থার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি পজিটিভ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এক বিভাগ অন্য বিভাগের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করে, এক বিশ্ববিদ্যালয় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে মান উন্নত করার প্রতিযোগিতায় নামে।

এই সুস্থ প্রতিযোগিতা সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গতিশীল করে তোলে। এর মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন, কারণ তাঁরা জানেন যে তাঁদের পারফরম্যান্সের ওপরই প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি নির্ভর করছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অ্যাক্রিডিটেশন সনদ লাভ করা বিলাসিতা নয়, বরং আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে এটি একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। এটি শিক্ষার্থীকে দেয় বৈশ্বিক ক্যারিয়ারের চাবিকাঠি, নিয়োগকর্তাকে দেয় যোগ্য কর্মীর নিশ্চয়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেয় আন্তর্জাতিক মর্যাদা।

মানহীন উচ্চশিক্ষা কেবল বেকারত্বের হার বাড়ায়, কিন্তু অ্যাক্রিডিটেশন প্রাপ্ত মানসম্মত উচ্চশিক্ষা একটি জাতিকে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল নির্ধারিত নির্দেশাবলি মেনে নিজেদের প্রস্তুত করা এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘ মেয়াদে একটি সমৃদ্ধ ও মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অ্যাক্রিডিটেশনের কোনো বিকল্প নেই। উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে এই স্বীকৃতিই হোক আমাদের আগামী দিনের পথচলার পাথেয়।

  • আলমগীর মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক