
প্রতিটি রাষ্ট্র ও তার নাগরিকের মধ্যে একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি থাকে। নাগরিক আইন মেনে চলবেন; রাষ্ট্র তাঁকে নিরাপত্তা দেবে এবং অপরাধের শিকার হলে প্রতিকারের পথ খুলে দেবে। আজকের বাংলাদেশে অনেক মানুষের কাছে সেই চুক্তি ক্রমে অর্থহীন হয়ে উঠছে। অপরাধ ও হয়রানির শিকার হয়েও তাঁরা প্রতিকার পাচ্ছেন না; কখনো মনে হচ্ছে রাষ্ট্র দায়িত্ব পালনে অক্ষম, কখনো মনে হচ্ছে অনাগ্রহী। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভুক্তভোগীকে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশে এসবই এখন ‘নরমাল’।
সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্রে রাতের অন্ধকারে কয়েক শ লোক হামলা চালাল। নিরাপত্তারক্ষীদের বেঁধে রেখে ওষুধ, টিকা ও যন্ত্রপাতি নিয়ে গেল। এরপর ভারী যন্ত্র এনে ভবন ভেঙে ফেলল। পুলিশ খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছেছিল। তবু লুটপাট ও ভাঙচুর থামেনি।
কয়েক দিনের ব্যবধানে ঢাকার ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা হলো। ভাঙচুরের পর সালমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে পরিহাসের সুরে বললেন, চিন্তার কিছু নেই, বাংলাদেশে এসবই এখন ‘নরমাল’।
এই ‘নরমাল’ কথাটির মধ্যেই আমাদের সবচেয়ে বড় বিপদ। মানুষ যদি ধরে নেয় সংঘবদ্ধ লোক এসে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলবে, পুলিশ উপস্থিত থেকেও তা ঠেকাতে পারবে না, আর পরে কয়েকজনকে লোকদেখানো গ্রেপ্তার দেখিয়ে বলা হবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে সে আর কী আশা করবে?
আমি এ অবস্থাকে বলতে চাই ‘আশার ঘাটতি’, ইংরেজিতে ‘হোপ ডেফিসিট’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো প্রতিষ্ঠিত সূচক হিসেবে কথাটি ব্যবহার করছি না; বাংলাদেশের বর্তমান অভিজ্ঞতা বোঝাতে একটি নাম দিচ্ছি। বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—এসবও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশায় আঘাত করে। কিন্তু এখানে ঘাটতিটি আরও গভীর—মানুষ বিশ্বাস হারাতে শুরু করে যে আইন মেনে, অভিযোগ জানিয়ে কিংবা প্রতিবাদ করে অবস্থার বদল ঘটানো সম্ভব নয়।
গণতন্ত্রের ঘাটতি, আশার ঘাটতি
আমরা গণতন্ত্রের ঘাটতি বা ‘ডেমোক্রেসি ডেফিসিট’-এর কথা শুনেছি। নির্বাচন বা প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকলেও নাগরিকের মতামত ও প্রয়োজন যদি ক্ষমতার সিদ্ধান্তে যথাযথ স্থান না পায়, জবাবদিহি যদি দুর্বল হয়, সেখানে গণতন্ত্রের ঘাটতি থাকে।
আশার ঘাটতি কিছুটা ভিন্ন। নির্বাচন আছে, সরকার আছে, আইনও আছে; তবু বিপদে পড়লে আইন ও বিচারব্যবস্থা তাঁর পাশে দাঁড়াবে—সাধারণ নাগরিকের সেই বিশ্বাস নেই। ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না, সে প্রশ্নেও আস্থা নেই। মানুষ বিচার চাওয়া বন্ধ করেনি, কিন্তু বিচার পাওয়া যাবে, সেই বিশ্বাস হারাতে শুরু করেছে।
চলতি আশাহীনতার কেন্দ্রে রয়েছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং তা রোধে প্রশাসনের ব্যর্থতা। উদ্বেগ যে শুধু উপরিউক্ত দুটি ঘটনার কারণে তৈরি হয়েছে, তা নয়। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে, এ বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে অন্তত ৩০০টি গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতার ঘটনায় ১৪২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সংস্থাটি রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৪৮টি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষের বড় অংশে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার তথ্যও তাদের প্রতিবেদনে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে, সে প্রশ্ন আরও জরুরি হয়ে ওঠে।
ঘরের ভেতরের নিরাপত্তাও এ আলোচনার বাইরে নয়। একই সংস্থার হিসাবে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গার্হস্থ্য সহিংসতায় ৩২০ নারী নিহত হয়েছেন; আগের বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল ১৬৬। গার্হস্থ্য সহিংসতার কারণকে এককথায় ‘আশাহীনতা’ বললে অপরাধীর দায় এবং নারীর প্রতি বৈষম্য আড়াল হয়। কিন্তু নির্যাতনের শিকার একজন নারী যদি বিশ্বাস না করেন যে পরিবার, পুলিশ বা বিচারব্যবস্থা তাঁকে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে, তাঁর জীবনে আশার ঘাটতি কতটা ভয়াবহ, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
রাষ্ট্রের দায় কোথায়
সুশাসনের জন্য প্রশাসনের সক্ষমতা চাই, সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর সদিচ্ছাও চাই। বড় ঘটনার পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার বা কোনো কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না। যাঁরা হামলাকারীদের জড়ো করেছেন এবং যাঁরা তাঁদের থামাতে পারতেন অথচ থামাননি, তাঁরা যদি আড়ালেই থাকেন, তাহলে মানুষের মনে এ ধারণাই বদ্ধমূল হয় যে ক্ষমতাবানের সঙ্গে বিবাদে পড়লে আইন বইয়ে আছে, তার পাশে নেই।
রাড্ডার ঘটনাটি এ সংকট স্পষ্ট করে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিম্ন আয়ের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল। জমি নিয়ে বিরোধের কথা আগে থেকেই জানা ছিল। হামলার রাতে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। প্রাথমিক পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, পুলিশ উপস্থিত থাকার সময়ও মালপত্র সরানো হচ্ছিল, কিন্তু তারা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার কথা স্বীকার করেছেন; তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন, তদন্ত কি শুধু তাঁর গাফিলতিতে থামবে? কারা লোক জড়ো করল, কারা ভারী যন্ত্র আনল, কারা হামলার পরিকল্পনা করল—এসবের উত্তরও চাই। একজন সংসদ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে; তিনি তা অস্বীকার করেছেন। অভিযোগটির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ক্ষেত্রেও পুলিশ জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, চাঁদাবাজির নির্দিষ্ট অভিযোগ করা হলে পুলিশ তা তদন্ত করবে। সেই অভিযোগ তদন্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন সন্দেহ নেই। কিন্তু হামলা ও ভাঙচুর ঠেকানোর দায়িত্ব এবং অপরাধের খবর পেয়ে তদন্তের সুযোগ কেবল আক্রান্ত ব্যক্তি লিখিত মামলা নিয়ে থানায় হাজির হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে যদি মানুষের মনে হয়, অভিযোগের কাগজ না এলে রাষ্ট্রের হাত বাঁধা, সেই ধারণা দূর করার দায়িত্ব সরকারের।
বাংলাদেশের আইনে প্রতিরোধের যথাযথ জায়গা রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৯ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের ভূমিকার কথা আছে; ১৫০ ধারায় এমন অপরাধের পরিকল্পনার খবর যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর বিধান রয়েছে। ১৫৭ ধারা অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে সন্দেহের ভিত্তি থাকলে প্রাপ্ত তথ্য বা অন্য সূত্রের ভিত্তিতেও পুলিশ তদন্তে এগোতে পারে। তাই প্রশ্নটি করতেই হয়—মানুষকে সুরক্ষা দিতে যদি পুলিশকে অপরাধ ঘটে যাওয়া আর লিখিত মামলা হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়, তাহলে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’ বলতে ঠিক কী বোঝায়?
আশা কীভাবে ফেরে
ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে পেডাগজি অব হোপ বইয়ে লিখেছিলেন, ন্যূনতম আশাটুকু না থাকলে সংগ্রামই শুরু করা যায় না। আশা মানে সব ঠিক হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নয়। আশা মানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে কিছু বদলানো সম্ভব, এই বিশ্বাসটুকু।
সেই বিশ্বাস ধরে রাখার দায়িত্ব কেবল ভুক্তভোগীর নয়। সংবাদমাধ্যম ঘটনার অনুসরণ করবে; নাগরিক সংগঠন নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের দাবি ধরে রাখবে; সাধারণ মানুষও সাক্ষ্য সংরক্ষণ ও যাচাই করে তথ্য প্রকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ কাজে শক্তিশালী হাতিয়ার বা টুল হতে পারে। জুলাই গণজাগরণের সময় তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। এ দেশের মানুষ দেখিয়েছে, একসঙ্গে দাঁড়ানোর শক্তি তার আছে। ‘বাংলাদেশে এসবই নরমাল’—এই বাক্য শেষকথা হতে দেওয়া যায় না। আজ আমাদের প্রথম প্রতিবাদ হোক এই দাবি—নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়, বিচার কোনো সৌভাগ্য নয়; দুটিই নাগরিকের অধিকার।
হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব