
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান ড. অ্যালান গ্রিনস্প্যানের বিদায়ী সংবর্ধনায় ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ রসিকতা করে বলেছিলেন যে গ্রিনস্প্যান নাকি একজন ‘রকস্টার’–এর সমতুল্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। গ্রিনস্প্যান ১৯৮৭ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ পেতে না পেতেই একজন রকস্টারের মতোই আলোচনায় চলে এসেছেন। এই খ্যাতি গ্রিনস্প্যান অর্জন করেছিলেন ১৮ বছর স্বাধীন ও বুদ্ধিদীপ্ত নীতিনির্ধারণী সেবা প্রদান করার পর। অন্যদিকে বাংলাদেশের গভর্নর কোনো কাজ শুরু করার আগেই ব্যাপক আলোচনায় চলে এসেছেন।
সেদিন ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি। দিনটি শুরু হয়েছিল অন্যান্য দিনের মতোই, কিন্তু শেষ হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন হিসেবে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ আকস্মিকভাবে বাতিল করে অর্থ মন্ত্রণালয় একই দিনে কিঞ্চিৎ অশ্রুত এক নাম মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।
জনাব রহমান শিক্ষাগতভাবে একজন হিসাববিদ এবং পেশায় একজন পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ী। হিসাববিদ ও ব্যবসায়ী—এমন পরিচয় ধরলে দেশে কমপক্ষে হাজারখানেক মানুষ পাওয়া যাবে, যাঁরা প্রচার ও প্রসারে নতুন গভর্নরের চেয়ে কম যান না। কিন্তু এই সবকিছু ছাপিয়ে মোস্তাকুর রহমানের বড় পরিচয় তিনি বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন কার্যকর সদস্য ছিলেন। লোকে বলাবলি করছে যে সেই পরিচয়ই তাঁকে গভর্নর বানানোর ক্ষেত্রে কোরামিন দিয়েছে।
বিএনপি একটা ভূমিধস জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই সরকারি দল তাদের গভর্নর নিয়োগের ব্যাপারে বিএনপি–ভাবাপন্ন মানুষকে খুঁজবে—এতে আশ্চর্য হওয়ার কী-ই বা আছে? কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে এই দলে কি অর্থনীতিবিদের বড়ই আকাল পড়ে গেল। নেই কি তাদের কোনো ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স বা পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ? যদি বিএনপি হতো এক নবজাত দল, তাহলে নাহয় মেনে নেওয়া যেত।
প্রায় অর্ধশতাব্দী বয়সের একটি দলে বিবেচনার এই দৈন্য কেন? আসলে এটি গুণীশূন্যতার দৈন্য নয়। এটি সরকারি দলের সুচিন্তিত এক পদক্ষেপ। তবে সরকারের এই কাজে চালাকি থাকলেও বিজ্ঞতা কম। এটি প্রচলিত অর্থসংস্কৃতির গড্ডলিকাপ্রবাহে বিএনপির প্রথম আত্মসমর্পণ। ২০১৮ সালের সন্ধ্যাকালীন নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগও একই রুচিতে একজন ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী বানিয়েছিল। কিন্তু চালাকির ফল ভালো হয়নি। কাকতালীয়ভাবে তিনিও ছিলেন একজন তুখোড় হিসাববিদ।
ড. মনসুর ছিলেন একজন শক্ত নিয়ন্ত্রক। কোনো গোষ্ঠীস্বার্থের দায়িত্ব নিয়ে তিনি চেয়ারে বসেননি। হয়তো জনবল প্রশাসনে তাঁর বিচক্ষণতার ঘাটতি ছিল অথবা তিনি সে জায়গাটিতে সুচতুর ছিলেন না। কিন্তু সেটি একজন গভর্নরের আবশ্যক গুণাবলি নয়
বাংলাদেশে কোনো পদধারী মানুষকে সমালোচনা করলে তিনি তা ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে থাকেন। এটি চিন্তার দীনতা। ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন, তখন তিনি আর ব্যক্তি থাকেন না। তাঁর প্রতিটি কর্মই সমালোচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে। নতুন গভর্নর বিষয়টিকে সেভাবে গ্রহণ করলে আলোচনাটি তাঁর জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। তিনি একজন ব্যবসায়ী, যা তাঁর জন্য এক বাড়তি অভিজ্ঞতা। অধিকাংশ গভর্নরেরই ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা থাকে না। কিন্তু তিনি ৮৬ কোটি টাকার একজন ঋণখেলাপিও বটে, যদিও গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে তিনি সেই ঋণের কিয়দংশ পরিশোধ করে ওটিকে ‘নিয়মিত’ ঋণে পরিণত করেছেন।
সংসদের অনেক সদস্য নির্বাচনের আগের সেই ‘সাধু হওয়ার মৌসুমে’ নিজেদের ‘নিয়মিত’ সাজিয়ে নিয়েছেন। তাহলে কি গভর্নর পদায়নে এই দাবার ছক আগেই সাজানো ছিল? সেটি অন্যায়ের কিছু না। কিন্তু সেটি আর্থিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিল কি না—প্রশ্ন সেখানেই। প্রায় পাঁচ শ বছর আগে বৈষ্ণব শ্রীচৈতন্য বলেছিলেন, ‘আপনি আচরি ধর্ম জীবেরে শেখায়।’ নিজে আচরণ না করলে সে বিষয়ে হিতোপদেশ দেওয়া যায় না। নীতি নির্ধারণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন গভর্নর খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কীভাবে শক্ত অবস্থান নেবেন—সেটি তাঁর জন্য যত বেশি দুশ্চিন্তার, বিএনপি সরকারের জন্য সেটি তত বেশি দুর্ভাবনার বিষয়। শতকরা ৪০ ভাগ খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে অর্থনীতি এগোতে পারবে না। এটি এশিয়ার সর্বোচ্চ সংখ্যা এবং বিশ্বের বুকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা, যা যেকোনো সময় পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিতে পারে। এটির বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা না করলে বিএনপিও শেষ পর্যন্ত আরেক শ্রেণির দরবেশ-সমৃদ্ধ দলে পরিণত হবে। বাকি পরিণতির কথা এহেন শুভক্ষণে নাই–বা বললাম।
অর্থনীতিবিদ ও আইনবিদ ড. কেভিন ওয়ার্স সম্ভবত হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী ফেড চেয়ার। তিনি জেরোমি পাওয়েলের স্থলাভিষিক্ত হবেন মে মাসের মাঝামাঝি। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। গভর্নরের ব্যক্তিচরিত্র নিয়েও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ বাদ যায় না। স্ট্যানফোর্ড ও হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকার পরও ওয়ার্সকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় কত বাদানুবাদ চলছে। কংগ্রেসে হবে তুমুল বিতর্ক। কংগ্রেসে অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল প্রেসিডেন্ট তাঁকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান বানাতে পারবেন।
প্রতিটি উন্নত দেশেই গভর্নর নির্বাচন করার ক্ষেত্রে এ ধরনের পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই–বাছাই কেন হয়? কারণ গভর্নরের সততা, দৃঢ়তা, গবেষণা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ওপরই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। এ রকম একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ নির্ধারণে কোনো আকস্মিক চমকের প্রয়োজন ছিল না। সংসদ গঠিত হওয়ার পর সেখানে কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হতে পারত। তত দিন গভর্নর মনসুর দায়িত্ব পালন করে যেতে পারতেন।
বিগত ইউনূস সরকারের প্রায় সব দপ্তরই কর্মকাণ্ডে অদক্ষতার ছাপ রেখেছে। কেবল গভর্নর মনসুরের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই কাজের কাজ কিছু হচ্ছিল। এটি ড. মনসুরের জন্য বিদায়ী সান্ত্বনা নয়। প্রায় প্রতিটি লেখায় বা প্রতিটি আলোচনার প্ল্যাটফর্মে আমি এ কথা বলেছি। তাঁকে যেভাবে অমর্যাদার থিয়েটার করে বিদায় করা হলো, তা সরকারের প্রভাতলগ্নে কোনো শুভ বার্তা নয়। রবীন্দ্রনাথের কথায় ‘রাজা সবারে দেন মান/ সে মান আপনি ফিরে পান’ কথাটি সরকার ভুলে গেল।
সংসদে যাচাই–বাছাই ও বিতর্কের মাধ্যমে কেউ নির্বাচিত হলে পরবর্তী সময়ে যদি গভর্নর ভালো কাজ না–ও দেখাতে পারেন, তাহলে তার পুরোপুরি দায়ভাগ সরকারের থাকে না। এতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। ‘গভর্নর’-এর পদটি নিয়ে ‘এক্সপেরিমেন্ট’ চলে না। এটি হচ্ছে রকেট উৎক্ষেপণের মতো বিষয়। বিজ্ঞানসম্মতভাবে সব দিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিতে হয়। গভর্নর নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে রকম বিচক্ষণতার পরিচয় বিএনপি সরকার দিতে পারেনি।
ধরে নিলাম হিসাববিদ ও ব্যবসায়ী গভর্নর বর্তমান সংকট মোকাবিলার জন্য একজন যোগ্যতম প্রার্থী। সেটি অংশীজনদের বোঝানো বা ‘কনভিন্স’ করার আগেই অনেকটা সামন্তবাদী স্টাইলে বিয়ে হয়ে গেল। পাত্র–পাত্রীর মতামতের কোনো দাম নেই। কাজটি করল এমন একটি দল, যারা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আনবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। অর্থাৎ আরও আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ সৃষ্টি করবে। কিন্তু গভর্নর পছন্দের কাজে তার প্রমাণ মিলল না। নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেধাতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ গড়ার যে প্রতিজ্ঞা উচ্চারিত হয়েছে, গভর্নর নির্বাচনের কাজে সে উচ্চারণের যথার্থ প্রতিফলন ঘটেনি। আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা একজন প্রাজ্ঞ মুদ্রাবাদী অর্থনীতিবিদের আকস্মিক বিতাড়নের মধ্যেও মেধাপ্রেমের ছাপ নেই। সৌজন্যের পরশ অনুপস্থিত।
ড. মনসুর ছিলেন একজন শক্ত নিয়ন্ত্রক। কোনো গোষ্ঠীস্বার্থের দায়িত্ব নিয়ে তিনি চেয়ারে বসেননি। হয়তো জনবল প্রশাসনে তাঁর বিচক্ষণতার ঘাটতি ছিল অথবা তিনি সে জায়গাটিতে সুচতুর ছিলেন না। কিন্তু সেটি একজন গভর্নরের আবশ্যক গুণাবলি নয়। তিনি যে সংস্কার কাজে হাত দিয়ে অহোরাত্রি পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন, তা নিঃসন্দেহে বহু অলিগার্ককে আতঙ্কিত করেছিল। সম্ভবত এই গোষ্ঠীর সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে গভর্নর মনসুর অভিমন্যুর মতো আত্মাহুতি দিলেন। এরপরও সময় দেওয়া যেতে পারত। ডেপুটিরাই ব্যাংক চালাতে পারতেন কিছুদিন। তা না হয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন গভর্নরের আবির্ভাব অর্থজগতে হইচইয়ের জন্ম দেবে বৈকি। এটি স্থিতিশীলতার অনুকূল নয়।
ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব