আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা জনগণের নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা—এই দুই বিবেচনায় মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটিকে কি আমরা একটি ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখব?
একটি রাষ্ট্রে মানুষ তখনই নিজেকে নিরাপদ মনে করে, যখন সে বিশ্বাস করে যে তার কোনো বিপদে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে। আর এই বিশ্বাস তখনই তৈরি হয়, যখন সে সত্যিই রাষ্ট্রকে পাশে পায়। রাষ্ট্র কীভাবে এই কাজ করে? কেউ জোর করে কারও জমি, বাড়ি বা সম্পত্তি দখল করতে গেলে রাষ্ট্রের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা ঠেকায়। অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানে কেউ ভাঙচুর করতে গেলে পুলিশ এসে বাধা দেয় এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু বাংলাদেশে যেন এখন আর এই নিয়ম কাজ করছে না। মানুষ তাই নিজেকে কোনোভাবেই নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
মিরপুরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে (রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার) গভীর রাতে হামলা, লুটপাট এবং পরে ভারী যন্ত্র দিয়ে পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটিকে রেড লাইন হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে। জনগণের নিরাপত্তার বোধকে এই ঘটনা যেমন নাড়া দিয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলার সময় পুলিশকে জানানো হয়েছিল। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও হামলাকারীদের ঠেকাতে পারেনি আর স্থাপনাটিও রক্ষা করা যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা, এ ঘটনার সঙ্গে সরকারি দলের লোকজন এবং একজন সংসদ সদস্যের (ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি) জড়িত থাকার অভিযোগ শক্তভাবে উঠেছে।
এরপর ধারাবাহিকভাবে আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর আদাবর এলাকায় ভবন দখলের চেষ্টা, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় শতাধিক লোক নিয়ে জমি দখলের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কাছাকাছি সময়ে ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় যে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় ও ব্যর্থ মনে হয়েছে, সেই পুলিশকেই আমরা অবশ্য জাসদ কার্যালয়ে ভিন্ন ভূমিকায় দেখতে পেলাম। বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা সেখানে জমায়েত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযোগ তোলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে শত শত মানুষকে আটক করে পরিচয় যাচাই করেছে, কাউকে কাউকে গ্রেপ্তারও করেছে।
জাসদের অফিসের ঘটনায় পুলিশ বাহিনী কার্যত বিএনপি ও যুবদল কর্মীদের সহায়ক বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে। দেখা যাচ্ছে, পুলিশ তার বাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন বা সক্রিয় হওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা ও নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকেই নিরাপদ পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে।
সরকার মনে করে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তিনি মনে করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোবল যে ভেঙে পড়েছিল, তা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং পুলিশ এখন পূর্ণ শক্তিতে কাজ করছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ বাহিনী যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার পুনর্গঠনের কাজটি নিশ্চয় কঠিন। সরকার এ জন্য বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি বা শাস্তির পথ ধরেছে। কিন্তু শুধু এসব করেই বাহিনী পুনর্গঠন বা ভেঙে পড়া মনোবল ফেরানো সম্ভব নয়। পুলিশ যে নিয়ম মেনে যথাযথভাবে কাজ করতে পারবে, সেই রাজনৈতিক নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করাই আসল।
কিন্তু নাগরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তো সরকারের বক্তব্যের মিল হচ্ছে না। ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পুলিশের কেউ কেউ ফ্যাসিবাদী শক্তির সহায়তা করছে। আমরা জানি যে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের সময় অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সরকার পুলিশ বাহিনীর যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে। পুলিশ বাহিনীতে তাদের অনুগত লোক থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দুই বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করেছে।
বর্তমান নির্বাচিত সরকারেরও দায়িত্ব পালনের প্রায় সাড়ে সাত মাস হয়ে গেল। সরকারের এখন বোঝা উচিত, যেকোনো ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে স্বৈরাচারী আমলকে সামনে আনার সুযোগ কিন্তু কমে যাচ্ছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ বাহিনী যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার পুনর্গঠনের কাজটি নিশ্চয় কঠিন। সরকার এ জন্য বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি বা শাস্তির পথ ধরেছে। কিন্তু শুধু এসব করেই বাহিনী পুনর্গঠন বা ভেঙে পড়া মনোবল ফেরানো সম্ভব নয়। পুলিশ যে নিয়ম মেনে যথাযথভাবে কাজ করতে পারবে, সেই রাজনৈতিক নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করাই আসল।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা তখনই নিষ্ক্রিয় থাকেন, যখন তিনি মনে করেন যে এর সঙ্গে প্রভাবশালী কেউ জড়িত আছেন এবং কোনো ব্যবস্থা নিলে তিনি বিপদে পড়তে পারেন। আবার পুলিশ যদি মনে করে যে সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া নিরাপদ ও ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনের জন্য লাভজনক, তাহলে তারা তা–ই করবে। মিরপুরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও জাসদ অফিসের ঘটনায় পুলিশকে যে নিষ্ক্রিয় ও সক্রিয়—দুই ভূমিকায় দেখা গেল, তাকে এভাবে ব্যাখ্যা করলে কি ভুল হবে?
অর্থনৈতিকভাবে দেশের মানুষ অনেক দিন ধরেই চাপে আছে। তেলের দাম হঠাৎ করে এতটা বাড়বে, তা অনেকের কাছেই প্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অনেকেই সচেতন। ইরান যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের বাজার—এসব ব্যাখ্যা যে মানুষের কাছে একদম অগ্রহণযোগ্য, তা–ও নয়। অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে মানুষ অনেক সময় মানিয়ে নেয় বা আপস করে। কিন্তু নিজের বাড়ি, জমি, ব্যবসা, কাজের জায়গা বা নিজের পরিবার ও সন্তানকে নিরাপদ রাখতে না পারার অনিশ্চয়তার সঙ্গে মানুষ কি আপস করতে পারে?
সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের তিনটি শহর—রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুরে দুই দিন কাটিয়েছি। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে কাজের অভাব, আয় কমে যাওয়া বা জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপের কথা শুনেছি। কিন্তু সবার মধ্যে যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ, তা হলো নিরাপত্তাহীনতার বোধ। নিজের বাসায়, কাজের জায়গায় বা রাস্তায় সে বা তার পরিবারের লোকজন নিরাপদ—এমন বিশ্বাস কারও মধ্যে নেই। বিপদে পড়লে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসবে বা এলেও কোনো ভূমিকা পালন করবে, এমন আস্থাও মানুষের নেই।
রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের চার খুনের ঘটনা নিয়ে সেখানকার মানুষের প্রশ্নের শেষ নেই। এই খুনের ঘটনার যে ভাষ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দারা প্রকাশ করেছে, তা তারা বিশ্বাস করে না। জনমনে ওঠা প্রশ্ন বা এ ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য রহস্যভেদ নিয়ে যেন কারও কোনো দায় নেই। এ ধরনের পরিস্থিতি মানুষের মনে উদ্বেগ বাড়ায়, সরকার ও পুলিশের প্রতি আস্থায় চিড় ধরায়।
মিরপুরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং এর পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এখন মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে। তারা দেখতে চাইবে এসব ঘটনার ব্যাপারে সরকার কী ব্যবস্থা নেয়।
বিশেষ করে মিরপুরের ঘটনায় একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠায় সরকার কতটা কী করতে পারবে, সেই সন্দেহ অনেকের মনেই রয়েছে। ঘটনাটির বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ নিতে পারে, সদিচ্ছার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। দেশজুড়ে নিরাপত্তাহীনতার যে বোধ তৈরি হয়েছে, তা কাটানোর একটি উদ্যোগ শুরু হতে পারে এর মধ্য দিয়ে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতার বিবেচনায় আমরা যাকে ‘রেড লাইন’ মনে করছি, সরকার কি আদৌ তা মনে করছে? সরকার কি এই ঘটনাগুলোকে সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করছে? জেগে ওঠার ঘণ্টাধ্বনি হিসেবে দেখছে?
এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক
akmzakaria@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব