ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশে দেশে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশে দেশে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে

মতামত

ট্রাম্প কেন ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র কথা বলছেন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন বাঁচার সবচেয়ে জরুরি নিয়ম একটাই—তাঁর কথা বিশ্বাস করবেন না। তিনি যা বলেন, তা সরলভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি বক্তব্য খুঁটিয়ে যাচাই করতে হয়। অনেকে ভদ্রভাবে বলেন, ট্রাম্পকে নাকি ‘গুরুত্বের সঙ্গে’ নিতে হবে, ‘আক্ষরিকভাবে’ নয়। কথাটা শেষ পর্যন্ত একই। কারণ, ট্রাম্পের কথার ভেতরে সাধারণত সত্য কম, অজুহাত বেশি।

ট্রাম্প যেসব বড় বড় পরিকল্পনার কথা বলেন, সেগুলো ভালো করে দেখলে বোঝা যায়—এগুলো কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নয়, বরং পরিস্থিতি সামলানোর ছোট ছোট চাল। আজ এক কথা, কাল আরেক কথা।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনই তার উদাহরণ। তিনি একসময় ম্যানহাটানের ডেমোক্র্যাট ছিলেন, পরে ফ্লোরিডায় গিয়ে রিপাবলিকান হয়ে যান। যে মানুষ একসময় বারাক ওবামার জন্মসনদ নিয়ে ষড়যন্ত্র ছড়িয়েছিলেন, তিনিই এখন এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশে গড়িমসি করছেন। রিয়েল এস্টেট হোক বা ট্রাম্প ইউনিভার্সিটি—যে উদ্যোগগুলোর তিনি বড়াই করেছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা আর কেলেঙ্কারিতে ডুবে গেছে।

এখন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে তাঁকে কোকেন চক্রের নেতা বলে দাগিয়ে দেন, তখন একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। মাত্র এক মাস আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর প্রধান চিন্তা ফেন্টানিল। এটিকে তিনি ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ বলেছিলেন। কারণ, এই মাদকসহ কৃত্রিম আফিম যুক্তরাষ্ট্রে মোট মাদকজনিত মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী।

ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযান ছিল নিছক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ডেলটা ফোর্সের হেলিকপ্টারসহ দেড় শতাধিক বিমান, বোমা ও বিশেষ বাহিনী। এটাকে আইনশৃঙ্খলা অভিযান না বলে একতরফা সামরিক হামলা বলাই বেশি যুক্তিসংগত।

গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ১১৫ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে শুধু মাদক পাচারের সন্দেহ ছিল। দ্য আটলান্টিক জানিয়েছে, এমন একটি হামলার ভিডিও দেখে ওয়াশিংটনে এক আইনপ্রণেতা প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এসব অভিযানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি একজন কট্টর ডানপন্থী ও বাস্তব রাজনীতিকে সিনেমার মতো দেখেন।

অন্য কোনো দেশ যদি এমন কাজ করত, তবে সেই দেশটিকে দুষ্কৃতি রাষ্ট্র বলা হতো। সেই দেশটির ধনীদের বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না, এটাই আসল দ্বিচারিতা।

তারপরও অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে নাকি কোনো বড় কৌশল খুঁজে পাচ্ছেন। বলা হচ্ছে, পরের ধাপে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখল করবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য আসলে উপনিবেশ গড়া নয়; তারা চায় অন্য দেশগুলো তাদের কথা মেনে চলুক।

ভেনেজুয়েলায়ও নতুন কিছু হয়নি। সেখানে পুরোনো ক্ষমতাবান গোষ্ঠীই রয়ে গেছে, শুধু নেতৃত্বে সামান্য বদল এসেছে। এটি কোনো নতুন সাম্রাজ্যবাদ নয়, বরং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার সস্তা ব্যবস্থা।

ট্রাম্প যে এসব সামরিক অভিযান উপভোগ করেন, তা স্পষ্ট। মার-আ-লাগোতে বসে তিনি মাদুরোর বাড়িতে হামলাকে ‘দারুণ অভিযান’ বলেছেন। নির্বাচনের সময় যদি এতে লাভ হয়, তিনি এমন আরও অভিযান চাইতেই পারেন। কিন্তু পরে সেসব দেশের ধ্বংসস্তূপ সামলানোর দায়িত্ব তিনি নিতে চান না। ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা সবাইকে সে শিক্ষা দিয়েছে।

কারাকাসে হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান—দুটোই ভেঙেছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযান চালানো হয়েছে। অথচ ট্রাম্প আগে কিছু ব্যবসায়ীকে খবর দিয়েছেন, পরে রাজনীতিকদের।

ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলা বা গ্রিনল্যান্ড শাসন করবেন? বরং তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রটাকেই ঠিকভাবে শাসন করতেন, সেটাই বড় কথা হতো। দ্বিতীয় মেয়াদের অনেকটা সময় পার হলেও ‘ট্রাম্পবাদ’ বাস্তবে কেমন, তা যুক্তরাষ্ট্রেই স্পষ্ট নয়।

তার শাসন মানে সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, অপছন্দের শহরে সেনা নামানো, ফেডারেল সরকার অচল করে দেওয়া। চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তও তিনি প্রথম ছয় মাসে পাঁচবার বদলেছেন। এর ফল—তাঁর জনপ্রিয়তা এখন জো বাইডেনের থেকেও কম।

এই অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই ট্রাম্প ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে এ ব্যবস্থায় নতুন কিছু নেই।

যুক্তরাষ্ট্র আগেও বহুবার অন্য দেশের সরকার পরিবর্তন করেছে। চিলি, ব্রাজিল, পানামা তার উদাহরণ। হার্ভার্ডের এক গবেষণা বলছে, ১৮৯৮ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪১ বার সরকার বদলাতে হস্তক্ষেপ করেছে।

নতুনত্ব কেবল এটুকু—আগে এসব কাজকে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র নামে ঢেকে রাখা হতো। আর ট্রাম্প এখন খোলাখুলি টাকা আর চুক্তির কথা বলছেন। তিনি কোনো মতবাদে বিশ্বাসী নন, তিনি সুযোগ দেখেন আর চুক্তি করেন। আজ এক কথা, কাল আরেক কথা—এই হলো ট্রাম্পের নীতি।

কারাকাসে হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান—দুটোই ভেঙেছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযান চালানো হয়েছে। অথচ ট্রাম্প আগে কিছু ব্যবসায়ীকে খবর দিয়েছেন, পরে রাজনীতিকদের।

ভেনেজুয়েলার তেল লুটের কথাও বাস্তবসম্মত নয়। তেলের দাম এখন এত কম যে বড় কোম্পানিগুলোর সেখানে বিনিয়োগের আগ্রহ নেই। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিমাণও এত বেশি, যা যুক্তরাষ্ট্রের সব বড় তেল কোম্পানি মিলেও এক বছরে খরচ করে না।

সব মিলিয়ে এটি কোনো নতুন বিশ্বব্যবস্থা নয়। এটি হলো ধনী ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি বিলিয়নিয়ার, ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী ও ছদ্ম ব্যাংকারদের এক বিশৃঙ্খল জোট, যাদের লক্ষ্য ক্ষমতা নয়, দ্রুত লাভ।

এই চিত্র ভয়ংকর ঠিকই, কিন্তু একে প্রতিরোধ করা অসম্ভব নয়, যদি ইউরোপসহ অন্য দেশগুলো সত্যিই তা চায়।

  • আদিত্য চক্রবর্তী দ্য গার্ডিয়ান–এর কলাম লেখক

  • দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত