
কুয়ালালামপুর, ২২ জুন ২০২৬: সোমবার সকালে পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পেরদানা পুত্রা’য় এক দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি নানা কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বিএসএস জানায়, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টায় দুই দেশের প্রতিনিধিদল বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসার আগে, পেরদানা পুত্রার পঞ্চম তলায় দুই নেতা একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। যাঁরা এই দুই নেতার জীবনের চড়াই-উতরাই এবং কুয়ালালামপুর শহরটির সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক বিষাদের যোগসূত্র সম্পর্কে অবগত, তাঁদের কাছে এই বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন ও গভীর।
তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে এক অদ্ভুত সমান্তরাল মিল রয়েছে। দুজনেই নিজ নিজ দেশে একসময় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গণ্য হচ্ছিলেন এবং ঠিক এই সম্ভাবনার কারণেই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন।
আনোয়ার ইব্রাহিমকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল ব্যালটের মাধ্যমে নয়, বরং কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী করে। তারেক রহমানও কারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
দুজনেই যথাক্রমে দীর্ঘ নির্বাসনে এবং কারাগারে থেকে কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে নিজেদের পুনর্গঠিত করেছেন। আজ দুজনেই নিজ নিজ দেশের শাসনের শীর্ষে আসীন—তাঁদের এই অর্জন সব দুর্ভোগ ও প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অনন্য নজির।
২০০৭ সালের ‘১/১১’–এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারান্তরালে ও রিমান্ডে থাকাকালীন তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ৫৫৪ দিন বন্দী থাকার পর যখন তিনি জামিনে মুক্তি পান, তখন তিনি গুরুতর অসুস্থ ও শয্যাশায়ী। চিকিৎসার জন্য পরে তিনি লন্ডনে চলে যান।
দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটান তিনি, যা একাধারে ছিল তাঁর আশ্রয় ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকেও কারাবাস, গুরুতর অসুস্থতা ও কঠোর রাজনৈতিক বিধিনিষেধ সহ্য করতে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল তারেক রহমানের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে। রাজনীতি থেকে দূরে থাকা, ক্রিকেটপ্রেমী শান্ত স্বভাবের এই মানুষটি জরুরি অবস্থার সময় মায়ের সঙ্গে গ্রেপ্তার হন।
পরে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়ায় আসেন এবং কুয়ালালামপুরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নির্বাসিত জীবন কাটাতে থাকেন। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি এই কুয়ালালামপুরের ইউনিভার্সিটি অব মালায়া মেডিক্যাল সেন্টারে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ যে কুয়ালালামপুর শহর তাঁর বড় ভাইয়ের রাষ্ট্রীয় সফর উপলক্ষে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় সেজেছে, সেই শহরই কেড়ে নিয়েছিল তাঁর ছোট ভাইয়ের প্রাণ। অসুস্থ ছেলের মৃত্যুর সময় পাশে থাকার অনুমতি পাননি খালেদা জিয়া; জীবিত সন্তানের বদলে তাঁর কাছে পৌঁছেছিল ছেলের মরদেহ।
আনোয়ার ইব্রাহিমের গল্পটিও যেন একই আখ্যানের প্রতিচ্ছবি। একসময় প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় নেতা আনোয়ারকে ১৯৯৮ সালে আকস্মিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, যা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করার পর তাঁর বিরুদ্ধে সমকামিতা ও দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়—যাকে তিনি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। প্রায় দুই দশক ধরে একাধিক বিচার ও কারাবাসের মুখোমুখি হন তিনি। সুঙ্গাই বুলোহ কারাগারে বন্দী থাকার সময় হেফাজতে তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। চোখে আঘাতের চিহ্নসহ তাঁর সেই ছবি মালয়েশিয়ার ইতিহাসে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্যতম কালো অধ্যায় হয়ে আছে।
তবে আনোয়ার এই প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এই কঠিন পরীক্ষা স্বাধীনতা ও ন্যায়ের প্রতি আমার আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করেছে।’ ২০১৮ সালে তিনি রাজকীয় ক্ষমা লাভ করেন এবং ২০২২ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। বিশ্বরাজনীতিতে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে অন্যতম ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই দুই নেতার রাজনৈতিক লড়াইয়ের পেছনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দুজন অসাধারণ নারী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান—যিনি একজন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ—দীর্ঘ বছরের নির্বাসন, আইনি নিপীড়ন ও মানসিক চাপ সহ্য করেছেন এক অনন্য মায়ায় ও দৃঢ়তায়। ২২ জুন সকালে পেরদানা পুত্রায় যখন আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর পাশেই ছিলেন ডা. জুবাইদা রহমান।
অন্যদিকে আনোয়ার ইব্রাহিমের স্ত্রী দাতুক সেরি ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলও এক লড়াকু ব্যক্তিত্ব। পেশায় চিকিৎসক এই নারী স্বামীর কারাবাসের সময় মালয়েশিয়ার বিরোধী দল ‘পার্টি কেদিলান রাকয়াত’ (পিকেআর)-এর হাল ধরেন এবং বছরের পর বছর নিপীড়নের মুখেও আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রাখেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। আজ পুত্রজায়ায় তিনি ডা. জুবাইদা রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
দুই দেশের দুই রাষ্ট্রনেতা ও তাঁদের পরিবারের এই চিত্র—কুয়ালালামপুরের সকালের রোদে দাঁড়িয়ে থাকা চারজন মানুষ—আসলে রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রত্যয়ের এক জীবন্ত প্রতীক।
ইতিহাস সব সময় নিজেকে সংশোধন করে না। তবে যখন করে, তখন তা এক পরম তৃপ্তি দেয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কুয়ালালামপুরের সংবর্ধনা দেখে যে কারও মনে হতে পারে, যে শহরটি একদা তাঁর পরিবারের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল, আজ তা রাষ্ট্রীয় সম্মানের সর্বোচ্চ অর্ঘ্য দিয়ে যেন সেই ক্ষতে প্রলেপ দিল।
আনিস আহমেদ প্রতিষ্ঠাতা ও গ্রুপ সিইও, এমজিএইচ গ্রুপ
মতামত লেখকের নিজস্ব