লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সিংগিমারী নদীতে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। এখানে নদীটি অবৈধ দখলে আছে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সিংগিমারী নদীতে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। এখানে নদীটি অবৈধ দখলে আছে।

মতামত

লালমনিরহাটের ২৫টি নদীই সংকটাপন্ন

২০২৫ সালে বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের করা তালিকা অনুযায়ী লালমনিরহাটে নদীর সংখ্যা ১৬। সেগুলো গিদারি, চেনাকাটা, টেংরামারী, মরাসতী, রত্নাই, ভাটেশ্বরী, স্বর্ণামতী, সতী, সানিয়াজান, সিংগীমারী, সুতী, কালীবাড়ি, কোটেশ্বর,খাটুমারা, সাঙ্গুলী ও খেংটি। এই তালিকার বাইরে আমি যে নদীগুলো দেখেছি, সেগুলো সাকোয়া (দহগ্রাম), সাকোয়া (সদর), চুঙ্গাদারা, বুকশুইল্যা, ডারাবিল, বুড়াধরলা, ঝিনাইকুড়ি, পানাকুড়ি এবং মালদহ আছে।

এ হিসাবে লালমনিরহাটে নদীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫টি। এর মধ্যে ১০টি আন্তসীমান্ত নদী। ভারতের সঙ্গে আন্তসীমান্ত নদীগুলো তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, সুতী, গিদারী, টেংরামারী, সাঙ্গুলী, খেংটি, সাকোয়া (দহগ্রাম) এবং মালদহ আন্তসীমান্ত নদী।

এগুলোর মধ্যে তিস্তা নদীর অবস্থা কমবেশি সবারই জানা। উজানের দেশ ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে নদীটি চরম সংকটাপন্ন। এ নদীর ভাঙনে দিশাহারা তিস্তাপারের মানুষ। অযত্নে থাকায় তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে সামান্য পানিতে বন্যাও ভাসিয়ে নিয়ে যায় কৃষকের ফসল। তিস্তা নদীর জন্য না আছে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিদেশীয় ব্যবস্থা, না আছে নিজ দেশীয় ব্যবস্থা।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ আনুকূল্যে ভাঙন রোধে সামান্য কিছু কাজ এ বছর হচ্ছে। এ নদীর ভাঙন এবং বন্যা থেকে রক্ষা পেতে যে মহাপরিকল্পনা গণদাবিতে পরিণত হয়েছে, তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তিস্তা সুরক্ষায় মহাপরিকল্পনার আশায় তিস্তাপারের মানুষ আশায় বুক বেঁধে আছে।

তিস্তা নদীর আন্তশাখা নদী সতী। অর্থাৎ তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে তিস্তায় মিলিত হয়েছে। সতী নদীর বর্তমান অবস্থা ভয়াবহ। নদীটি দখল হতে হতে এখন প্রায় মরি মরি অবস্থা। নদীটি সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নদীটিকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। মরাসতীর অবস্থাও তথৈবচ। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে আছে সিংগীমারী নদী।

তিস্তার পানি একতরফা নির্বিঘ্নে প্রত্যাহার করার পর এবার চোখ পড়েছে জলঢাকা নদীতে। ভারতের জলঢাকা তথা বাংলাদেশের ধরলা নদীর পানি তারা প্রত্যাহার করে নিয়ে যাবে তিস্তা নদীতে। যে সংযোগ খালের মাধ্যমে নিয়ে যাবে, সেই খালের কাজ শুরু হওয়ার কথা শুনেছিলাম বছর তিনেক আগে। কাজ শেষ হয়েছে কি না, জানি না। বাংলাদেশের এখন থেকে এর প্রতিবাদ জারি রাখা প্রয়োজন। নয়তো এ নদীর পানি প্রত্যাহার করলেও কিছু করার থাকবে না।

লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী স্থলবন্দরের দিকে যাওয়া পথে বেশ কয়েক কিলোমিটার এ নদী পাশ দিয়ে সড়ক চলে গেছে। নদীটি পাটগ্রামে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত রচনা করেছে। নদীটির ডান তীরের দিকে ভারত। ভারতের চা–বাগান চোখে পড়ে। পাটগ্রাম বাসস্ট্যান্ডের কাছে এ নদীতে ব্যাপক দখল আছে। পুরোনো দখলের সঙ্গে নতুন দখলও দেখা যায়। নদীতে করা হয়েছে ময়লার ভাগাড়। এই ময়লায় ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে নদী আর ভরাট হওয়া অংশে চলছে দখল। সবার চোখের সামনে সিংগীমারী নদীর অবৈধ দখল দেখার যেন কেউ নেই। নদীটিতে বর্ষা মৌসুমে তীব্র স্রোত থাকে। শুষ্ক মৌসুমেও স্বচ্ছ পানির একটি প্রবাহ থাকে। নদীটি ছোট হলেও দেখতে সুন্দর।

ধরলা নদী লালমনিরহাটের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। নদীটিতে ভাঙন আছে। ধরলা বাংলাদেশে দুবার প্রবেশ করেছে। একবার বুড়িমারী স্থলবন্দরের পাশ দিয়ে প্রবেশ করে ভারতে চলে গেছে। পাটগ্রাম দিয়ে আবারও বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি কুড়িগ্রাম জেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ধরলা নদীর ওপর দিয়ে ব্রিটিশ আমলে রেল যোগাযোগ ছিল। এখনো সদর উপজেলায় ধরলাপাড়ে যেতে পুরোনো স্টেশন চোখে পড়ে। দূর থেকে রেলের একটি সেতু দেখা যায়। যদিও সেই রেলসেতু ধরলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। 

ধরলা নদীতে বাংলাদেশে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় খননের কাজ করছে। এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। এই কাজে নদীর তেমন কোনো কল্যাণ হয়েছে বলে মনে হয় না। ভারতে এ নদীর নাম জলঢাকা। বাংলাদেশের উজানে ভারত সব আন্তসীমান্ত নদীর পানি প্রত্যাহার করতে চায়। তিস্তা নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করা ছিল ভারতের সেই চাওয়ার একটি পরীক্ষামূলক কাজ।

তিস্তার পানি একতরফা নির্বিঘ্নে প্রত্যাহার করার পর এবার চোখ পড়েছে জলঢাকা নদীতে। ভারতের জলঢাকা তথা বাংলাদেশের ধরলা নদীর পানি তারা প্রত্যাহার করে নিয়ে যাবে তিস্তা নদীতে। যে সংযোগ খালের মাধ্যমে নিয়ে যাবে, সেই খালের কাজ শুরু হওয়ার কথা শুনেছিলাম বছর তিনেক আগে। কাজ শেষ হয়েছে কি না, জানি না। বাংলাদেশের এখন থেকে এর প্রতিবাদ জারি রাখা প্রয়োজন। নয়তো এ নদীর পানি প্রত্যাহার করলেও কিছু করার থাকবে না।

লালমনিরহাটে বাস্তবে এমন একটি নদীও নেই, যে নদীটির অবস্থা ভালো আছে। এগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটির অবস্থা খুবই খারাপ। লালমনিরহাটের নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জেলা নদী রক্ষা কমিটি একটি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে পারে। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নদীগুলোর স্বাস্থ্য ঠিক রাখা সম্ভব। জেলা নদী রক্ষা কমিটি কি এই উদ্যোগ গ্রহণ করবে?

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক