
গত সপ্তাহে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম ছিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির পরাজয় নিয়ে। নির্বাচনে মমতার বহুদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি (যে দলের নেতৃত্বে আছে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ) তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।
বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী নতুন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। এক সময় তিনি মমতারই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। সেই মমতাকে হারিয়ে তিনি এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রধান নেতা।
যদিও মমতার পতন হঠাৎ ঘটেনি—দীর্ঘদিনের প্রকাশ্য পক্ষপাতমূলক শাসনের গল্প যেন আগেই এই পরিণতি লিখে রেখেছিল। তবু একটি প্রকাশ্য হিন্দুত্ববাদী দলের হাতে তাঁর পরাজয় অনেকের কাছে, বিশেষত বাংলাদেশে একধরনের সতর্কসংকেত হয়ে এসেছে। অনেকে মনে করছেন, এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি সরকার আসবে, যা কেন্দ্রে থাকা গেরুয়া সরকারের প্রতিচ্ছবি হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো: ভারতের একটি রাজ্যের সরকার পরিবর্তন কি সত্যিই বাংলাদেশের জন্য কোনো ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে?
একটি তথাকথিত সংখ্যালঘুবান্ধব ও ধর্মনিরপেক্ষ সরকার থেকে এমন একটি দলে ক্ষমতা হস্তান্তর, যারা প্রকাশ্যে হিন্দুত্বকে তাদের আদর্শ বলে ঘোষণা করে এবং সংখ্যালঘুদের (প্রধানত মুসলমানদের) জন্য খুব বেশি জায়গা রাখে না—এটি কি বাংলাদেশের জন্য কোনো গুরুতর পরিণতি বয়ে আনবে? গত ১৫ বছরে মমতা ব্যানার্জি কি সত্যিই ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নতিতে কোনো নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছিলেন?
দুঃখজনক হলেও সত্য, ওপরের কোনোটিই নয়। এসব আশঙ্কা মূলত একটি ভুল ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছে যে ভারতের একটি রাজ্যের সরকার পরিবর্তন মানেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন, যার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও পড়ে। বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এমন নয়।
বাংলাদেশে একটি দীর্ঘস্থায়ী ভুল ধারণা হলো, ভারত মানেই পশ্চিমবঙ্গ। কারণ, আমাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ স্থলসীমান্ত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এবং ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ও যাতায়াতের বড় অংশই এই রাজ্যের মাধ্যমে হয়। ফলে অনেকের কাছে পশ্চিমবঙ্গই ভারত এবং সেখানকার সরকারই যেন ভারতের সরকার।
একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন যে পশ্চিমবঙ্গ একটি রাজ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কী করতে পারে আর কী পারে না। উদাহরণস্বরূপ, দুই বাংলার মানুষের যতই ইচ্ছা থাকুক না কেন, ভারতীয় কেন্দ্র সরকারের অংশগ্রহণ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ একতরফাভাবে বাংলাদেশ–পশ্চিমবঙ্গ সাংস্কৃতিক বা বাণিজ্যচুক্তি করতে পারে না।
রাজনৈতিক কারণে মমতা ব্যানার্জির পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের প্রকাশ্য তোষণ—যারা তাঁর ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচিত—এটিকে বাংলাদেশপ্রেম বলে ভুল করা ঠিক নয়। তিনি তিস্তা চুক্তি নিয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের সঙ্গে কঠোর লড়াই করেছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মমতার পতনে পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি সরকার আসবে, যা বাংলাদেশবিরোধী বা বাংলাদেশবান্ধব হবে। আমাদের আনন্দিত বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় হলো এই মৌসুমে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দলের ধারাবাহিক সাফল্যের একটি অংশ। বর্তমানে ভারতের ২৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ১৬টিতে বিজেপি বা তার জোটের সরকার, যার ৪টি বাংলাদেশের প্রতিবেশী (আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর ও অরুণাচল)। ১৯৮৪ সালে যাত্রা শুরু করা একটি দলের জন্য এটি বিস্ময়কর সাফল্য। এই সাফল্যের মূল কারণ হলো হিন্দুত্ববাদের প্রচার, যা ধর্মের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় হিন্দু সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে। হিন্দুত্ব সাংস্কৃতিক না ধর্মীয়—এ বিতর্কে আমি যেতে চাই না।
তবে যা স্পষ্ট, তা হলো ভারতের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার ধীরে ধীরে ক্ষয় এবং ধর্মীয় শক্তির উত্থানই বিজেপির উত্থানের প্রধান কারণ। আজকের ভারত আর নেহরু বা গান্ধীর ভারত নয়। আজকের ভারত অনেক বেশি সাভারকর বা শ্যামাপ্রসাদের কল্পিত ভারতের মতো—একটি হিন্দু আদর্শ ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র।
বিজেপির শক্তির মূল হলো হিন্দুত্ব ও ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’, যা ভারতের বৈচিত্র্যময় ভোটারদের এক ছাতার নিচে এনেছে। ঐতিহ্যগত জাতপাতভিত্তিক ভোটের ধারা ভেঙে একটি অভিন্ন হিন্দু পরিচয় গড়ে তুলতে দলটি সফল হয়েছে।
কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ—এসবকে তারা ‘সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ’ হিসেবে তুলে ধরে, যা তাদের মূল ভোটারদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এর ফলে উত্তর-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্ব পর্যন্ত ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ডানপন্থী ভোটারদের সমর্থন বেড়েছে। আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মণিপুরের মতো দূরবর্তী রাজ্যেও বিজেপি আসন জিতেছে, যেখানে একসময় দলটির অস্তিত্বই ছিল না। কারণ, দেশটি ক্রমে মোদি ও তাঁর দলের প্রচারিত জাতীয়তাবাদী পরিচয় গ্রহণ করেছে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে দূরে সরে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষয়—বিশেষত বিজেপির উত্থানের পর—একটি বাস্তবতা। আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক—সব দিক থেকেই এর প্রমাণ রয়েছে। তবে এই ক্ষয় শুরু হয়েছিল বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগেই। কিন্তু গত দুই দশকে বিজেপির প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ প্রবণতা তীব্র হয়েছে।
সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণাবাচক বক্তব্য বেড়েছে, যার ৯৮ শতাংশ মুসলমানদের লক্ষ্য করে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনার ৮৮ শতাংশই ঘটেছে বিজেপি বা তার মিত্রদের শাসিত রাজ্যে। এর সঙ্গে বেড়েছে গণপিটুনি ও সহিংসতা, যা অনেক সমালোচকের ভাষায় ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ তৈরি করেছে। বিজেপি ‘সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধারণা প্রচার করে, যা তাদের মতে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ‘ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষতা’র বিপরীত, যেখানে সংখ্যালঘুদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হতো।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় বাংলাদেশকে সরাসরি উদ্বিগ্ন করার মতো কিছু নয়। তবে ভারতের বহু রাজ্যে বিজেপির সাফল্য এবং হিন্দুত্বের উত্থান, যা ভারতীয়দের জন্য একটি সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় হিন্দু পরিচয়কে জোরদার করে, এটি অবশ্যই আমাদের নজরে রাখা উচিত।
বিজেপি সরকার প্রতিবেশী রাজ্যগুলো থেকে মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মতো চরম পদক্ষেপ নেবে—এমন আশঙ্কা কম। কিন্তু ভারতের ভেতরে এমন কোনো বক্তব্য বা পদক্ষেপ যদি নেওয়া হয়, তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের রক্ষণশীল বা ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রতিফলিত হতে পারে।
পদার্থবিজ্ঞানের নীতি অনুযায়ী, প্রতিটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। নতুন নেতৃত্ব যদি তাদের ভোটারদের খুশি করতে বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে কোনো উগ্র বক্তব্য দেয়, তার প্রতিক্রিয়া সীমান্তের এপারে অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। তাই উভয় পক্ষেরই উচিত রাজনৈতিক বক্তব্যে সংযম দেখানো এবং এমন কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া, যা গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
ভারতের একটি রাজ্যের শাসন পরিবর্তন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বদলে দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমরা অবশ্যই খেয়াল রাখি, কে প্রতিবেশী রাজ্যগুলো শাসন করছে; কারণ, রাজনৈতিক নেতৃত্বই দুই দেশের সম্পর্কের মানবিক মাত্রাকে প্রভাবিত করে। রাষ্ট্রনেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক জটিলতা সহজেই সমাধান করতে পারে।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী সাবেক সরকারি কর্মকর্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব