সাইদুর রহমান
সাইদুর রহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিদায় ঘরছাড়া সাংবাদিক সাইদুর রহমান

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইদুর রহমান মারা গেলেন। হাসপাতাল থেকে তাঁর লাশ এনে নগরের দরগাপাড়ায় বাসার সামনে এনে রাখা হলো।

সেদিন রাজশাহীতে ভ্যাপসা গরম। কয়েকটা মাছি এসে ভোঁ মেরে চলে গেল। জানাজা হবে বিকেলে। এতক্ষণ কীভাবে লাশ রাখা হবে? কয়েকজন সাংবাদিক চেষ্টা করছিলেন খাটিয়ার নিচে বরফ দেওয়া যায় কি না।

রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন চেষ্টা করছিলেন একটা অ্যাম্বুলেন্সে পাওয়া যায় কি না। সুবিধা করতে না পেরে তাঁরা কয়েকজন ছুটে গেলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে। তিনি তৎক্ষণাৎ একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিলেন। সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চলে এলেন।

এই সাইদুর রহমান ছিলেন রাজশাহীর একটি বনেদি পরিবারের সন্তান। নানা মাদার বখশ অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হলও রয়েছে।

বাবা আইনজীবী আতাউর রহমান বড় রাজনীতিক ছিলেন। তিনি জেলা ন্যাপের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করলে তাঁকে রাজশাহীর গভর্নর করা হয়েছিল। আর মা বেগম মনোয়ারা রহমান ছিলেন ভাষাসৈনিক।

মেধাবী শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান উচ্চতর পড়াশোনার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে অন্য কোনো কাজে যোগ দেননি। আশির দশকে দৈনিক করতোয়া পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত ভোরের কাগজ–এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মৃত্যুর আগের কয়েক বছর ধরে তিনি সভাপতি ছিলেন।

সাইদুর রহমান বিয়ে করেননি। সাংবাদিকতা শুরু করার পর থেকে তাঁর ঠিকানা হয়ে উঠেছিল রাজশাহী প্রেসক্লাব। বেশির ভাগ সময় প্রেসক্লাবে, আবাসিক হোটেলে এবং মৃত্যুর আগের তাঁর বন্ধুর ভাইয়ের বাসায় ছিলেন। সেখান থেকেই গত রোববার তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনির রোগে ভুগছিলেন। তা ছাড়া আরও কিছু শারীরিক সমস্যা ছিল।

তাঁর না ছিল সংসার, না ছিল বৈষয়িক চিন্তা। সারা জীবন লেখালেখি করেছেন মানুষের জন্য। জিরো পয়েন্টে গলা ফাটিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। আর টাকাপয়সা যা উপায় করেছেন, সব রেখে গেলেন জনকল্যাণে।

সাইদুর রহমানের ক্ষুরধার মেধা ছিল। রাজশাহী শহরের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ফোন নম্বর মুখস্থই রাখতেন। জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে বলা শুরু করতেন। তাঁর কাছে হাতেখড়ি নিয়ে অনেকেই বড় সাংবাদিক হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশের বাইরে থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালাহউদ্দিন সুমন লিখেছেন, সাইদুর রহমান তাঁর সাংবাদিকতার গুরু ছিলেন। ছাত্রাবাসে জায়গা না পেয়ে ছয় মাস তাঁর সঙ্গে প্রেসক্লাবেই কাটিয়েছেন। তাঁর বাসার খাবার ভাগ করে খেয়েছেন। এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে।

প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য খুবই চেষ্টা করতেন। সুস্থ থাকার জন্য তালিকা মেনে খাওয়াদাওয়া করতেন। মনে আছে, একবার সংবাদ সম্মেলন শেষে আমাকেও সুস্থ থাকার একটি রেসিপি বলে দিয়েছিলেন। সেটা অবশ্য পরে আর মানা হয়নি। তবে আমার সমস্যা শুনে মসুরের ডালটা খেতে নিষেধ করেছিলেন। আমি এখনো সেটা মেনে চলি।

ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের আনাগোনা কমতে থাকে। কিন্তু সাইদুর রহমান প্রেসক্লাব ছাড়েননি। বিভিন্ন দিবসে প্রেসক্লাবের বাইরে মাইক লাগিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। অন্তত সেই দিন রাজশাহী শহরের মানুষকে তিনি জানান দিতে পারতেন, রাজশাহীতে প্রেসক্লাব রয়েছে।

আর কোনো কিছুর প্রতিবাদ জানাতে রাজশাহী শহরের জিরো পয়েন্টে মানববন্ধনের ইতিহাস বলে শেষ করা যাবে না।

তবে এক সময় মতের মিল না হওয়ায় রাজশাহী প্রেসক্লাব থেকে বের হয়ে একদল সাংবাদিক রাজশাহী মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাব গঠন করেছিলেন। ।

তাঁর জানাজার আগে শহরের অনেক সাংবাদিক জড়ো হয়েছিলেন। কথায়–কথায় জানা গেল, ঘরছাড়া সাংবাদিক সাইদুর রহমান তাঁর জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে জনকল্যাণে ট্রাস্ট গঠন করে গেছেন। কথাটা শুনে কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গেলাম।

সাইদুর রহমান আজীবন একজন বাউন্ডুলে। মতের মিল না হওয়ার কারণে অনেকের সঙ্গেই বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ তাঁর সম্বন্ধে মন্দ কথাও বলেছেন, কিন্তু কোনো দিন জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা সভায় অনুপস্থিত থাকেননি। সেখানে যা বলে আসতেন, তা–ই নিয়ে নিউজ করে সবাইকে মেইলে পাঠিয়ে দিতেন। অসুস্থতার কারণে শুধু সর্বশেষ সভায় তিনি যেতে পারেননি। একই কারণে মাসখানেক থেকে প্রেসক্লাবেও আসতে পারেননি।

সাইদুর রহমানের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান করে গেছেন তাঁর বোন আফরোজি রহমান খেলনাকে। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। ঘরছাড়া সাংবাদিক সাইদুর রহমান কী সঞ্চয় করে গেছেন, জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, তাঁরা বেশি সময় পাননি। মাস দুয়েক আগে বোধ হয় বোর্ডের একটি সভা করেছেন। তখন যেটুকু জানতে পেরেছেন, রাজশাহী শহরে সাইদুর রহমানের ১০ কাঠা জমি আছে। রাজশাহী নওগাঁর মধ্যে চলাচলকারী একটি বাস আছে। আর বিভিন্ন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করা একটা মোটা অঙ্কের টাকা আছে।

তবে তিনি আক্ষেপ করে বললেন, যে ব্যবসায়ীদের কাছে এই টাকা বিনিয়োগ করা আছে, তাঁদের কাউকে তিনি হাসপাতালে বা সাইদুর রহমানের মরার পর দেখেননি।

এ কথা শুনে মনে হলো, আহা রে সাংবাদিক! তাঁর না ছিল সংসার, না ছিল বৈষয়িক চিন্তা। সারা জীবন লেখালেখি করেছেন মানুষের জন্য। জিরো পয়েন্টে গলা ফাটিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। আর টাকাপয়সা যা উপায় করেছেন, সব রেখে গেলেন জনকল্যাণে। এখন একটাই শুধু খটকা লাগছে, যাঁদের কাছে সেই টাকা আছে, তাঁরা টাকাগুলো ট্রাস্টে জমা দেবেন তো!

  • আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী