
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে কিছু সংস্কার করা হলেও দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এখনো আগের সরকারের সময়কার ত্রুটিপূর্ণ আইনই ব্যবহার করছে। কখনো কখনো তা ব্যবহার করা হচ্ছে আগের চেয়ে আরও খারাপভাবে।
আজকের এই পর্বে গ্রেপ্তার ও অভিযোগ গঠনের আগের আটক, জামিন না দেওয়ার প্রবণতা এবং আটক বা জামিনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ না থাকার মতো বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের নবগঠিত আইসিটি বর্তমানে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা পরিচালনা করছে।
ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা বারবার দেখানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁদের আদালতের আইন ও প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে।
সম্প্রতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেওয়া এক রায়ে বিচারপতিরা বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন এবং এর কার্যবিধি ‘ন্যায়বিচার ও সুষ্ঠু বিচারের নীতির জীবন্ত প্রতিফলন’।
তাঁরা আরও বলেন, এই আইন শুধু ফৌজদারি বিচারকার্যের মৌলিক শর্ত পূরণই করে না, বরং মানবাধিকার ও ন্যায্যতার এক উন্নত ধারণাও তুলে ধরে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু বাস্তবে আদালতে এই দাবিগুলোর প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না।
নতুন এসব বিচার (যেগুলোর বেশির ভাগই ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনে সরকারের সহিংস দমন–পীড়নের ঘটনাকে ঘিরে) আগের সরকারের সময়কার বিচার থেকে ভিন্ন হওয়ার কথা ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিচালিত আগের বিচারগুলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধ নিয়ে ছিল।
ওই বিচারগুলো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তারা এগুলোকে ‘সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ডের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং ‘আইন ও কার্যবিধির গুরুতর ত্রুটি’ হিসেবে আখ্যা দেয়।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনে। বিশেষ করে অপরাধের সংজ্ঞাগুলো সংশোধন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সংবিধির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়।
তবে আগের আইনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এখনো রয়ে গেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সংবিধির ৫৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউকে গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারি করা যায় কেবল তখনই, যখন প্রি-ট্রায়াল চেম্বার প্রসিকিউশনের দেওয়া প্রমাণ যাচাই করে নিশ্চিত হয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ করেছেন বলে বিশ্বাস করার মতো ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ আছে।
পাশাপাশি গ্রেপ্তারটি ‘প্রয়োজনীয়’ হতে হবে, যেমন তাঁকে বিচারপ্রক্রিয়ায় হাজির নিশ্চিত করা, তদন্তে বাধা বা ঝুঁকি সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখা, কিংবা একই ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাওয়া ঠেকানোর জন্য।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান আইসিটির কার্যবিধিতে গ্রেপ্তারের জন্য এমন কোনো প্রমাণের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়নি।
রুল ৯(১) অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই যদি মনে করেন যে গ্রেপ্তার ‘প্রয়োজনীয়’, তাহলে ট্রাইব্যুনাল পরোয়ানা জারি করতে পারে। কিন্তু ‘প্রয়োজনীয়’ বলতে কী বোঝায়, সেটিও স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
এটি আইসিটির কাঠামোকে উন্নত করার বদলে বরং পিছিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের নিয়মে অন্তত প্রসিকিউশনকে ট্রাইব্যুনালকে বোঝাতে হতো যে গ্রেপ্তার ‘কার্যকর ও সঠিক তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয়’।
সেটিও যথেষ্ট কঠোর মানদণ্ড ছিল না, তবে তা বর্তমান নিয়মের তুলনায় বেশি শক্ত ছিল।
তবে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—যদি আইসিটি এমন কাউকে গ্রেপ্তার করতে চায়, যিনি আগে থেকেই অন্য কোনো মামলায় আটক আছেন, তাহলে ট্রাইব্যুনালকে দেখাতে হয় যে এই আটক ‘কার্যকর ও সঠিক তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয়’।
বাংলাদেশের নিজস্ব ফৌজদারি আইনের সঙ্গে তুলনা করলে এই আটকসংক্রান্ত মানদণ্ডের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়।
সেখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট কাউকে আটক করতে পারেন কেবল তখনই, যখন তিনি নিশ্চিত হন যে তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ ‘মজবুত ও বিশ্বাসযোগ্য’।
ফলে গ্রেপ্তার ও আটকের বিষয়ে আইসিটির নিয়ম শুধু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেই নয়, বাংলাদেশের সাধারণ আইনের মানদণ্ডের নিচে পড়ে।
এই ত্রুটিগুলোর বাস্তব প্রভাব স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদনই খারিজ করেনি।
সম্প্রতি ভিত্তিহীন মনে হওয়া অভিযোগে দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের অনুমোদন দেওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আরও বড় পরিসরে দেখা যাচ্ছে, ট্রাইব্যুনাল বহু মানুষকে মাসের পর মাস অভিযোগ গঠন ছাড়াই আটক রেখেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সম্ভবত পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো সাবেক বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী ৭৫ বছর বয়সী ফারুক খান এবং শেখ হাসিনার সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ৮০ বছর বয়সী ড. তওফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। তাঁদের দুজনকেই ২০ মাস ধরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে।
এই দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগ গঠন ছাড়াই আটক রাখার পেছনে শুধু গ্রেপ্তারের নিয়ম নয়, ট্রাইব্যুনালের জামিন না দেওয়ার প্রবণতাও দায়ী। রোম সংবিধির মতো এখানে জামিন দেওয়ার কোনো স্পষ্ট মানদণ্ড নেই, যা ন্যায্য বিচারের ক্ষেত্রে একটি বড় ঘাটতি।
আইসিটির কার্যবিধির রুল ৯(৬) শুধু বলছে, প্রতি তিন মাসে ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত ব্যক্তির আটকের আদেশ পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো আটক ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়নি।
এই অবস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ রুল ৯(৫)-এর প্রয়োগে দেখা যায়। এই নিয়ম অনুযায়ী, কেউ যদি এক বছর ধরে অভিযোগ ছাড়াই আটক থাকেন, তাহলে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার কথা—যদি না ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ থাকে।
আর এমন পরিস্থিতি থাকলে বিচারকদের তা লিখিতভাবে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এক বছরের বেশি সময় আটক থাকা কাউকেই ট্রাইব্যুনাল মুক্তি দেয়নি। এমনকি কেন তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়নি, সেই ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ সম্পর্কেও কোনো লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, যা নিয়ম অনুযায়ী দেওয়া উচিত ছিল।
ড. তওফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর ঘটনাটি একটি স্পষ্ট উদাহরণ। প্রায় দেড় বছর ধরে আটক থাকার পর তিনি ২০২৬ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদনের কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে সরাসরি তা তিন মাসের জন্য মুলতবি করে দেন।
ফলে এমন একজন ব্যক্তি, যাকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে বা জামিন দেওয়া হয়নি, কিংবা পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে—তার এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো আইনি পথই নেই। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে স্পষ্টভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। রোম সংবিধির ৮২(১) (খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী মুক্তি (জামিন) দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার থাকতে হবে।
আইন ও তার প্রয়োগ—উভয় ক্ষেত্রেই আরেকটি বড় ত্রুটি হলো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তাঁর গ্রেপ্তারের কারণ ও প্রমাণের ভিত্তি জানানো হয় না।
রোম সংবিধি অনুযায়ী, এই তথ্যগুলো গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মধ্যেই উল্লেখ থাকতে হবে এবং তা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জানানো হয়েছে, এটিও নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু আইসিটির কার্যবিধির রুল ৯(৩)-এ বলা হয়েছে, ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার সময়...অভিযোগের একটি কপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দিতে হবে।’
তবে এর সঙ্গে আরও তিনটি শব্দ যোগ করা হয়েছে—‘অর লেটার অন’ (‘অথবা পরে’) যা কার্যত এই বাধ্যবাধকতাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
এর ফলে বাস্তবে দেখা যায়, আইসিটির কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অভিযোগের লিখিত কপি পেতে সপ্তাহ বা মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।
২০২৬ সালের ১৪ মে গ্রেপ্তার হওয়া দুই সাংবাদিক—মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার ঘটনাই এর উদাহরণ। গ্রেপ্তারের দুই মাসের বেশি সময় পরও তাঁরা অভিযোগের কোনো কপি পাননি, এমন বিলম্ব অস্বাভাবিক নয়।
এটি শুধু প্রক্রিয়াগত কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। দ্রুত গ্রেপ্তারের কারণ জানার অধিকার ন্যায্য বিচারের একটি মৌলিক নিশ্চয়তা।
আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ, রোম সংবিধি, এমনকি আওয়ামী লীগ আমলের নিয়মেও এই অধিকার স্বীকৃত ছিল। এটি বর্তমান সরকার এসে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়া নিয়ে লেখালেখি করা ব্যারিস্টার খান খালিদ আদনান বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া উচিত স্পষ্ট বিচারিক মানদণ্ড ও প্রমাণের ভিত্তিতে; কোনো অস্পষ্ট “প্রয়োজনীয়তা”র দাবি দিয়ে নয়।
আর কাউকে আটক করলে তাঁকে দ্রুত ও অর্থপূর্ণভাবে জানাতে হবে কেন তাঁকে আটক রাখা হয়েছে।
গুরুতর অপরাধের বিচার ও ন্যায্য প্রক্রিয়া—এ দুটি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং আইসিটির গ্রহণযোগ্যতা এই দুটির ওপরই নির্ভর করে।’
এই প্রক্রিয়াগত দুর্বলতাগুলো আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে, কারণ, গ্রেপ্তার, আটক বা জামিনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করার কোনো সুযোগ নেই।
১৯৭৩ সালের আইনের ২১ ও ২১এ ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায় বা আদালত অবমাননার সাজা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ নেই।
অর্থাৎ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, অভিযোগ গঠনের আগের আটক বা জামিনের মতো অন্তর্বর্তী (ইন্টারলোকিউটরি) সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আদালতেই আপিল করা যায় না।
ফলে এমন একজন ব্যক্তি, যাকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে বা জামিন দেওয়া হয়নি, কিংবা পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে—তার এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো আইনি পথই নেই।
এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে স্পষ্টভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। রোম সংবিধির ৮২(১) (খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী মুক্তি (জামিন) দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার থাকতে হবে।
এটি বাংলাদেশের নিজস্ব ফৌজদারি আইন থেকেও পিছিয়ে। সেখানে শুধু এক নয়, তিন স্তরের আপিলের সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, আইসিটির সামনে থাকা একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেপ্তার, আটক ও জামিনসংক্রান্ত অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ আইনের অধীন থাকা একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির চেয়েও কম।
আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় তো আরও অনেক কম, যদিও ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা দাবি করেন যে তাদের ব্যবস্থা সেই মানদণ্ড অনুসরণ করে।
এই উদ্বেগগুলো শুধু বিচার শুরুর আগের ধাপেই সীমাবদ্ধ নয়, বিচার শুরু হওয়ার পরের প্রক্রিয়াতেও এর প্রভাব পড়ে।
ডেভিড বার্গম্যান সাংবাদিক। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david.bergman.77377
জাস্টিসইনফো ডট নেট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।
মতামত লেখকের নিজস্ব।