যুদ্ধবিরতির পর তেহরানের রাস্তায় ইরানিদের উদ্‌যাপন
যুদ্ধবিরতির পর তেহরানের রাস্তায় ইরানিদের উদ্‌যাপন

মতামত

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে কার লাভ, কার ক্ষতি

ইরান ঘোষণা করেছে, তারা হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দিতে প্রস্তুত। এর আগে তারা বলেছিল, সাময়িক যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে প্রণালিটি তারা খুলবে না। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি এই ঘোষণাকে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট বড় একটি বিজয় হিসেবে দেখেছেন এবং দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সফলভাবে প্রণালিটি আবার খুলেছেন। 

তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—দুই পক্ষের মধ্যে যে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত কীভাবে ফলাফলে পৌঁছাবে? তাদের মধ্যে যে বড় ফারাক রয়েছে, তা কি মেটানো সম্ভব হবে? এবং কি সত্যিই এই যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে পারবে? 

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল ইতিমধ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে ‘মহান বিজয়’ ঘোষণা করেছে এবং শত্রুদের জন্য এটিকে ‘ঐতিহাসিক পরাজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব (যাকে খোদ ট্রাম্প ‘আলোচনার ভালো ভিত্তি’ বলেছেন) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে অনেক উদ্বেগের বিষয় এবং প্রশ্ন রয়ে গেছে। 

প্রথমত, ইরানের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার আছে। মনে রাখার মতো বিষয় হলো, এটি আগের আলোচনার মূল ইস্যু ছিল। সেই আলোচনাগুলো ব্যর্থ হয়েছিল বলেই পরিস্থিতি আজ যুদ্ধের দিকে চলে গেছে। উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়েছেন, ভবিষ্যতের কোনো চুক্তিতে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। কিন্তু তেহরান কোনোভাবেই এই অধিকার ছাড়তে চায় না। তারা বড়জোর সীমিত সময়ের জন্য এই কার্যক্রম স্থগিত রাখতে রাজি হতে পারে। 

আলোচনায় আশা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র চাইবে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা হোক। এ ছাড়া যুদ্ধের সময় জুন ২০২৫-এ সমৃদ্ধকৃত ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সরানো, ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাতলা করা এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখাও আমেরিকার চাওয়া হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে যাওয়ার সম্ভাবনা যতটা সম্ভব কমানো যেতে পারে। তবে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো নতুন যুদ্ধ এড়াতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার স্বীকার করতেও রাজি হতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, ইরানের প্রস্তাবে ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি একেবারেই উল্লেখ নেই। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, লঞ্চার এবং এগুলোর উৎপাদন ক্ষমতায় আক্রমণ করা হয়েছে। এই আক্রমণ তাদের সামর্থ্যকে কমিয়ে দিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ইরান এখনো শত শত ক্ষেপণাস্ত্র এবং লঞ্চার ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলোতে সংরক্ষণ করেছে। অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, এই ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। 

তৃতীয়ত, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত নয়। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো সাম্প্রতিক সপ্তাহে তীব্র হলেও যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত ইরান তার কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বজায় রেখেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সমালোচনা বেড়েছে। নতুন একটি মার্কিন বয়ান তৈরি হয়েছে। নতুন বয়ান বা ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের শাসনব্যবস্থা পতনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে টেনে এনেছে। এটি ইসরায়েলের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগের কারণ। এর কারণ, এটি মার্কিন জনমতের ওপর প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য সমর্থন জোগাড় করা কঠিন করে তুলছে। 

যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন উল্লেখ করা হয়নি। তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যা সাধারণ জনগণকে শাসন পরিবর্তনের সুযোগ দেবে। নাগরিকেরা তাদের খারাপ অবস্থার প্রতিবাদে সড়কে নেমেছে সত্যি, কিন্তু শাসকেরা বিক্ষোভকারীদের দমন করার ক্ষমতা হারিয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। 

এ ছাড়া যদি যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে, তবে এটি শাসকদের জন্য একপ্রকার জীবনরেখা হিসেবে কাজ করবে। নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া এবং ইরানের জমা থাকা অর্থসম্পদ মুক্ত করার বিষয়টি হয়তো অর্থনীতিকে তাৎক্ষণিকভাবে ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে না। কারণ, সমস্যা মূলত কাঠামোগত। প্রশাসনিক ত্রুটি ইরানকে ঘিরে রেখেছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠন এবং ব্যবস্থাপনায় শাসনব্যবস্থার কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে। 

চতুর্থত, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য একটি বড় লক্ষ্য পূরণ করেছে। নির্বাচিতভাবে প্রণালি বন্ধ করার মাধ্যমে তারা বিশ্ব জ্বালানিবাজারে প্রভাব ফেলেছে এবং যুদ্ধকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করেছে। সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময় ইরান ও ওমানের সালতানাত নৌযান চলাচলের জন্য ফি আদায় করতে পারবে। 

যদি এটি স্থায়ী হয়, তবে ইরানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য সুবিধা হবে এবং হরমুজে একটি নতুন শাসনকাঠামো প্রতিষ্ঠা হবে। এটি ইরানের অবস্থান স্বীকার করবে এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব দেখাবে। 

হরমুজবিষয়ক সমস্যা ট্রাম্পের আলটিমেটাম এবং যুদ্ধবিরতি বিষয়ে ইসরায়েলের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

ইরানের প্রস্তাবে আরও কিছু জটিল বিষয়ও আছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা অপসারণের দাবি, আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার বোর্ডের প্রস্তাব বাতিলের দাবি এবং সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের দাবি (যার মধ্যে লেবাননও রয়েছে)। যদিও এই দাবিগুলো শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হবে বলে খুব কমই আশা করা যায়, তবু আলোচনার ভিত্তি হিসেবে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

এই যুদ্ধবিরতিকে ৪০ দিনের লড়াইয়ের পরও তেহরানে বিজয়বোধের প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সমালোচনা বেড়েছে। নতুন একটি মার্কিন বয়ান তৈরি হয়েছে। নতুন বয়ান বা ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের শাসনব্যবস্থা পতনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে টেনে এনেছে। এটি ইসরায়েলের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগের কারণ। এর কারণ, এটি মার্কিন জনমতের ওপর প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য সমর্থন জোগাড় করা কঠিন করে তুলছে। 

ড. রাজ ঝিম্মেট ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের ইরান অ্যান্ড দ্য শিয়া অ্যাক্সিস প্রোগ্রামের পরিচালক

ওয়াই নেট গ্লোবাল থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত