
‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ?’ বলে গলা ফাটানো অঞ্জন দত্তর জন্য এক রকম মায়াই হচ্ছে।
‘স্টার্স্টিংয়েই ওরা এগারো শ দেবে, তিন মাস পরে কনফার্ম’ মার্কা সাদামাটা স্যালারির চাকরি পেয়ে লোকটা আনন্দের চোটে বছরের পর বছর ‘টু ফোর ফোর ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইন’ নম্বরে ফোন করে মিস বেলা বোসের কান ঝালাপালা করে ফেলছেন।
অথচ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় চাকরিটা, মানে রাষ্ট্রপতির রুচিশীল, রাজকীয়, রুদ্ধশ্বাস দায়িত্ব অবলীলায় ছেড়ে দিয়েছেন জনাব মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।
কিছুদিন আগে তিনি বিদেশে দেহপরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর দেহে একটা অসুখ ধরা পড়ে। সেই অসুস্থতার কারণে তিনি দেশের স্বার্থে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন।
চুপ্পুর অসুখটা বাতিল বস্তাপচা খুঁজলি-পাঁচড়া, ডায়রিয়া, আমাশয়, হুপিংকাশির মতো গরিবি গন্ধমাখা গৎবাঁধা ছোটলোকি অসুখ না। এটি অভিজাত ঘরানার অসুখ। করপোরেট ক্লাসের ক্লাসি কন্ডিশন। নাম ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’।
এই অসুখের কারণে তিনি ফট করে ফিট পড়েন। আবার চট করে চেতনায় ফেরেন। যে সময়ে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন, সে সময়ের কথা হুঁশ ফিরলে মনে থাকে না।
অটোনোমিক নিউরোপ্যাথির মতো ব্যারাম নিয়ে রাষ্ট্রপতির মতো অটোনমাস বডির দায়িত্বে থাকা কাজের কথা না। সেই কারণে চুপ্পু চুপকে চুপকে ইস্তফা দিয়েছেন।
সুলিখিত ইস্তফাপত্রে চুপ্পু বলেছেন, ‘আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানিং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন।’
মূলত সে কারণে তাঁর এই ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাক্টিভ’ ডিসিশন।
রাষ্ট্রপতির চাকরিটা পেতে চুপ্পুকে আবেদন করতে হয়নি, কোনো লবিং করতে হয়নি, কারও সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতায়ও যেতে হয়নি। নিজের নিয়োগপ্রাপ্তির ইতিবৃত্ত বর্ণনা করতে গিয়ে চুপ্পু একাধিকবার এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। সেসব বক্তব্য ইউটিউবে দেখা যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরপর চুপ্পু বলেছিলেন, ‘কপালে যে আল্লাহ এত বড় জিনিস লিখে রাখছে, এটা কেমন করে বলব বলেন? আমার আব্বা আম্মাও জীবিতকালীন কখনো দোয়া করেননি যে আমার ছেলে রাষ্ট্রপতি হবে। কারণ তাঁরাও কল্পনা করতে পারেননি, তাঁদের ছেলে রাষ্ট্রপতি হবে।’
চুপ্পুর বাবা-মা এবং তাঁর নিজের পক্ষে যে সাফল্য কল্পনায় আনাও সম্ভব ছিল না, সেই সাফল্য তাঁর বাবা মা দেখে যেতে পারেননি।
চুপ্পুর এই ‘বাজান দেইক্ক্যা গ্যালা না মুই অইলামডা কী’ দশার মতো অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভালো করে জানতেন, গোলমাল থেকে ‘গোল’টা বাদ দিয়ে নিজের বশ মানা ‘মাল’টা নিতে হয়।
এই মর্মান্তিক আক্ষেপ এই অধমের লেখা গল্পের ছিরু মোল্লা চরিত্রটির কথা মনে করিয়ে দেয়।
গল্পে ঘটনাক্রমে ইউপি ইলেকশনে দাঁড় করানো হয় হতদরিদ্র ছিরু মোল্লাকে। ভোট শেষে দেখা যায় ছিরু বিপুল ভোটে জিতেছে। জনতা ছিরুকে কাঁধে তুলে বিজয় মিছিল করতে থাকে। পথের পাশেই বাপের কবর দেখে জনতার কাঁধে চেপে থাকা ছিরু বলে ওঠে, ‘নামাও! বাপজানের কব্বরের কাছে মোরে এট্টু নামাও!’
নামানো হলো। ছিরু কবরের ওপর শুয়ে বিকট চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘ওরে বাজান দেইক্ক্যা গ্যালা না মুই অইলামডা কী?’
গত তিনমাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সালাম করতে গেলে উনি আমার সালাম নিতেন না। আমি দেখতাম যে, উনার চরণের ধুলা আমি পাই না। আমার মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল।সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
চুপ্পুর এই ‘বাজান দেইক্ক্যা গ্যালা না মুই অইলামডা কী’ দশার মতো অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভালো করে জানতেন, গোলমাল থেকে ‘গোল’টা বাদ দিয়ে নিজের বশ মানা ‘মাল’টা নিতে হয়।
অ্যাবসোলিউট অনুগত মাল চেনার জন্য শেখ হাসিনাকে আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতো বিচক্ষণ লোকেরও পরামর্শ নিতে হয়নি। কারও সাথে আলাপ না করেই তিনি চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি বানানোর কথা ভেবেছিলেন। চুপ্পু পরে তা খোলাখুলি বলেছিলেন।
চুপ্পু বলেছিলেন, ‘গত তিনমাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সালাম করতে গেলে উনি আমার সালাম নিতেন না। আমি দেখতাম যে, উনার চরণের ধুলা আমি পাই না। আমার মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল। আমি সালাম করতে গেলেই উনি “না, থাক থাক” বলে পা সরিয়ে নিতেন। কিন্তু সে সময়ই রাষ্ট্রপতি হিসেবে উনার মনের মধ্যে আমার নাম প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল এবং সে জন্যই যে উনি আমার সালাম নেওয়াটা বিব্রতকর মনে করতেন, এটা তো পরে বুঝলাম। আগে তো বুঝতাম, উনি আমার ওপর বিরক্ত।’
রাজনীতিতে আলসারের মতো বাসা বাঁধা কদমবুসি কালচার যে ফায়দাবিহীন কায়দা নয়; কদমবুসি যে ক্যারিয়ার কামানোর কঠিন কৌশল; তা চুপ্পু জানতেন।
বিচারক থাকা অবস্থা থেকে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক, এস আলম গ্রুপের কোম্পানির পরিচালক ও এস আলম গ্রুপের দখল করা ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি পর্দার আড়ালে থেকে ঝড় তুলতেন। কিন্তু মুখে বলতেন না। তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি নিজের মুখে ঝড় তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর চুপ্পু পাবনায় এক জনসমাবেশে যান। সেখানে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছিল। তিনি ভাষণ দেওয়া শুরু করার পর ঝড় উঠল।
শামিয়ানা উড়ে যাওয়ার অবস্থা দেখে দ্রুত রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ শেষ করার জন্য অনুরোধ করতে একজন এসএসএফ সদস্য এলেন।
চুপ্পু তাঁকে বললেন, ‘কী হয়েছে? কী সমস্যা?’ এসএসএফ সদস্য বললেন, ‘ঝড় উঠেছে।’ চুপ্পু ধমক দিয়ে বললেন, ‘ঝড় উঠছে উঠুক! তো কী হয়েছে? আমিই তো ঝড় উঠাচ্ছি এখানে।’
আসলেই বিচার বিভাগ, প্রশাসন, দুদক, ব্যাংকিং খাত—কোথায় তিনি ঝড় ওঠাননি?
বিচারক থাকাকালে তাঁর নামের চেয়ে বদনাম রটেছিল বেশি।
পরে দুদকের কমিশনার হওয়ার পর সেই বদনাম আরও বেড়েছিল। ওই সময় এস আলমের কবজা করা দুটি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি।
বাজারে এই কথা চালু আছে যে, তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার পেছনে এস আলমের তাবিজ–তদবির কাজ করেছে। সেই জোরেই তিনি ঝড় তুলেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মহাঝড়ে আওয়ামী সরকার লন্ডভন্ড হলো। সবাই নাই হয়ে গেলেন।
বঙ্গভবন নামক ‘সোনার খাঁচায়’ বসে চুপ্পু জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।
কিন্তু কয়েক মাস পরই বললেন, হাসিনার পদত্যাগের কথা তিনি শুনেছেন, কিন্তু পদত্যাগপত্র তাঁর কাছে নেই। তাঁর একেক সময় একেক কথার ঝড় দেখে অনেকে তাঁর পদত্যাগ চাইলেও তিনি চাকরি ছাড়লেন না। কেমনে কেমনে জানি পরিস্থিতি ম্যানেজ করে ফেললেন।
কিছুদিন আগে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকার সময় চুপ্পু দিল্লিপ্রবাসী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে পত্রিকায় খবর বের হয়।
এরপরই চুপ্পু তাঁর শোয়া থেকে দাঁড়ানো অবস্থায় যাওয়ার সময়কালীন মাথায় চক্কর মারা রোগটি সামনে এনে পদত্যাগ করেন।
অনেকে প্রশ্ন করছেন, চুপ্পুর বিগত দিনের ঝড় ওঠানো কাজকর্মের জন্য তাঁর বিচার কী করা যাবে?
চুপ্পুর দাবি, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর বিচার করা যাবে না। এটি হলো রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালনের সময় করা সব কাজের দায়মুক্তি।
কিন্তু যদ্দুর জানি, দুবাইয়ে টাকা পাচার, মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’-এই সব অভিযোগের দায়মুক্তি ৫১ অনুচ্ছেদ দেবে না।
ফলে চুপ্পুর এই পদত্যাগ সত্যিই ‘নাইস’, নিঃসন্দেহে ‘অ্যাট্রাক্টিভ’, কিন্তু নিঃশব্দে নিঃশেষ নয়।
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক।
ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com
* মতামত লেখকের নিজস্ব।