প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

মতামত

রাউজান: ঐতিহ্যের জনপদে কেন এত খুনোখুনি

চট্টগ্রামের রাউজান—নামটি উচ্চারণ করলেই ইতিহাস, ঐতিহ্য আর গৌরবের এক বিস্তৃত ভূগোল চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এই মাটিতে জন্ম নিয়েছেন মাস্টারদা সূর্য সেন, যিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক অনন্য নায়ক। এই জনপদই জন্ম দিয়েছে কবি নবীনচন্দ্র সেনের মতো সাহিত্যিককে। এই ভূখণ্ডের জাতীয় রাজনীতিতে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এই রাউজান থেকে উঠে এসেছেন।

রাউজান কেবল কৃতী সন্তানের জন্যই নয়, এর ঐতিহ্যও বহুস্তরীয়। প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, শতাব্দীপ্রাচীন মসজিদ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দীর্ঘ ইতিহাস—সব মিলিয়ে এটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। এখানে ইতিহাস নিছক অতীত নয়; এটি এখনো জীবন্ত, মানুষের জীবনযাপন ও চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

সাড়ে পাঁচ শ বছর আগে এখানে বাঙালি বসতির পত্তনের সময় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তারা অনুরক্ত ও অনুগত থেকেছে। ইতিহাস থেকে আমরা জানি, পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীর কবি শ্রীকর নন্দীর পূর্বপুরুষেরা রাউজানের সুলতানপুরের বাসিন্দা ছিলেন।

আরাকানরাজদের পৃষ্ঠপোষকতায় যাঁরা কাব্য রচনায় সেকালে যশস্বী হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবার আগে যে নামের কথা বলতে হয়, তিনি হলেন দৌলত কাজী। তাঁর জন্ম সপ্তদশ শতাব্দীতে রাউজানের সুলতানপুর গ্রামের কাজীবাড়িতে।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলে রাউজানের আরেক কৃতী সন্তান বাংলা কাব্যে–সাহিত্যে চট্টগ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছেন নবীনচন্দ্র সেন। তাঁকে মহাকবি নামে আখ্যায়িত করা হয়। রাউজানের নোয়াপাড়ার এই কবির ‘পলাশির যুদ্ধ’, ‘কুরুক্ষেত্র’, ‘ক্লিওপেট্রা’ ইত্যাদি রচনা খুব বিখ্যাত। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রাউজানে বেড়াতে গিয়ে কাব্য রচনা করেছেন।

শত শত বছরের ঐতিহ্যের সেই রাউজান কিন্তু আজ অন্য এক কারণে আলোচনায়—রক্তের দাগে, আতঙ্কের ছায়ায়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে এই উপজেলা হয়ে উঠেছিল স্থানীয় এমপির নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে ভয়ংকর এক সন্ত্রাসী জনপদ। চব্বিশের জুলাইয়ের পর সেখানে যে পরিবর্তন আসার কথা ছিল তা আসেনি। বরং এক রাজনৈতিক প্রভাব শক্তিহীন হওয়ার পর নতুন রাজনৈতিক প্রভাবে নতুন মাত্রায় রক্তপাত শুরু হয়েছে।

গত ২০ মাসে রাউজানে ২২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৬টি রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; বরং ট্রমায় কবলিত হওয়া কিছু পরিবারের সদস্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর হাহাকার তুলে ধরে। আর মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আতঙ্কের কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়। সর্বশেষ বিএনপির কর্মী কাউসারুজ্জামানের নির্মম হত্যাকাণ্ড আবারও সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—রাউজান কি ধীরে ধীরে সহিংসতার এক স্থায়ী ভূখণ্ডে পরিণত হচ্ছে?

গত ২০ মাসে রাউজানে ২২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৬টি রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; বরং ট্রমায় কবলিত হওয়া কিছু পরিবারের সদস্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর হাহাকার তুলে ধরে। আর মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আতঙ্কের কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়। সর্বশেষ বিএনপির কর্মী কাউসারুজ্জামানের নির্মম হত্যাকাণ্ড আবারও সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—রাউজান কি ধীরে ধীরে সহিংসতার এক স্থায়ী ভূখণ্ডে পরিণত হচ্ছে?

কাউসারুজ্জামান কোনো প্রভাবশালী নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কৃষক, একজন পিতা, একজন স্বামী। পরিবারের ভাষ্যমতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই তাঁর ‘অপরাধ’। এই বয়ান সত্যতা যাচাইয়ের বিষয় হলেও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না—রাউজানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

যেকোনো বিচারে কারও মত-পথ-চিন্তাচেতনা নিজের পছন্দ না হলে তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। হত্যার শিকার তিনি যে–ই হোন, হয়তো আইনের চোখে তিনি অপরাধী ছিলেন, হয়তো মানুষের ওপর জুলুম–নির্যাতন করেছেন, কিন্তু তাঁর তো রয়েছে আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার। আমরা কেউ তো নিজেরা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারি না।

এই সহিংসতার ধারাবাহিকতা নতুন নয়। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক আমলেই রাউজান ছিল ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আধিপত্যের লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিএনপির শাসনামলে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও দখলদারত্বের অভিযোগ যেমন ছিল, তেমনি আওয়ামী লীগ আমলেও বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন ও সহিংসতার নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি দলভিত্তিক নয়, এটি কাঠামোগত এবং দীর্ঘদিনের।

তবে সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহতা সংখ্যায় ও ধারাবাহিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই এতগুলো হত্যাকাণ্ড, এটি একটি গভীর সামাজিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা, যেখানে আহত হয়েছেন শত শত মানুষ।

আরও উদ্বেগজনক হলো বিচারহীনতার প্রবণতা। কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডে এখনো গ্রেপ্তার হয়নি কেউ। এই বাস্তবতা মানুষের মনে আস্থাহীনতা তৈরি করে এবং অপরাধীদের মধ্যে একধরনের দুঃসাহস জন্ম দেয়। যখন শাস্তির নিশ্চয়তা থাকে না, তখন সহিংসতা হয়ে ওঠে ক্ষমতার সহজ ভাষা।

রাউজানের ভৌগোলিক অবস্থান—নদী, পাহাড়, অন্য জেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকা—আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ কোনোভাবেই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে না। মূল সমস্যা নিহিত রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় সহাবস্থানের সীমা ছাড়িয়ে শত্রুতায় রূপ নেয়।

প্রশ্ন হলো, এই রাউজান কি সেই রাউজান, যে একসময় জ্ঞান, সংস্কৃতি আর আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে? যে মাটিতে সূর্য সেনের মতো বিপ্লবী জন্ম নেন, সেখানে আজ যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকে, তাহলে সেটি কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, এটি একটি নৈতিক পরাজয়ও।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ক্ষমতাসীন দল হোক বা বিরোধী দল—সহিংসতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে সবার। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় আধিপত্যের নামে যে সন্ত্রাসী সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা না গেলে এই সহিংসতার চক্র ভাঙা কঠিন হবে।

রাউজানের মানুষকেই ভাবতে হবে, তাঁরা কেমন রাউজান চান? ঐতিহ্যের রাউজান, নাকি আতঙ্কের রাউজান? ইতিহাস বলে, এই জনপদ প্রতিরোধ করতে জানে, প্রতিবাদ করতে জানে। এখন প্রয়োজন সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া। রাউজানকে আবার তার নিজের পরিচয়ে ফিরিয়ে আনা—এটাই এখন সময়ের দাবি।

  • ওমর কায়সার প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক

    মতামত লেখকের নিজস্ব