নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন পলিসি তৈরির মধ্য দিয়ে জনগণের সমর্থন এবং সহানুভূতি প্রাপ্তির প্রবণতা নির্বাচনী প্রচারণার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দেখতে পাচ্ছি, বিভিন্ন সময় বিএনপি তার ৩১ দফার একটি ধারাবাহিক আলোচনা নিয়ে জনসমক্ষে হাজির হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের পলিসি তুলে ধরে।
এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি সাম্প্রতিক সময়ে এই দুটি দল আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করল। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার নিয়ে সব সময়ই জনমনে ব্যাপক আগ্রহ এবং আলোচনা তৈরি হয়, কেননা এর মধ্য দিয়েই একটি রাজনৈতিক দলের উন্নয়ন ভাবনা ও তাদের প্রস্তাবিত নীতির সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে জনগণ বিশদভাবে জানতে পারে।
এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার নিয়ে আলোচনার সঙ্গে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আলোচনা। রাজনৈতিক দলগুলো সেটি কতটা করতে পারল সেটা এক বড় প্রশ্ন হলেও, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার বেশ কিছু ছাপ দেখা যায়, যেখানে মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেখানে জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়ের বিষয়গুলো মূলত রাষ্ট্রের দায় হিসেবে দেখা হয়।
বিএনপির ইশতেহারে সে বিষয়গুলো কেন্দ্রে রেখে উন্নয়নের একটি বিশদ রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সুরক্ষা এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। এর সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, তরুণদের চাহিদা মাথায় রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিস্তারিত পরিকল্পনা, ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে তোলা, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করার মতো বিষয়গুলো আমরা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণার মধ্যে প্রবলভাবে দেখতে পাই।
বিগত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটি শোষণমূলক ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটেছে, যেখানে সমাজের একটি এলিট সুবিধাভোগী অংশের আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারেনি এবং এখনো পারছে না। এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিলুপ্তির জন্য দুই প্রধান দলেরই আরও বিশদ কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে হয়।
অর্থাৎ জনগণের ভালো থাকা কিংবা দেশের উন্নয়নে জনকল্যাণমূলক নীতি তৈরি করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে তারা দেখছে। এখানে কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড, এমনকি কৃষকদের জন্য তাদের ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি, শিক্ষিত তরুণদের জন্য বেকার ভাতা এবং প্রান্তিক পরিবারের নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড প্রচলনের বিষয়টি বিশেষ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে নারীকে নানাভাবে আরও অধস্তনতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে এমন একটি উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। যে প্রতিশ্রুতি সরাসরি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে, যেখানে জনগণের দায়ের চেয়ে রাষ্ট্রের দায় মুখ্য হিসেবে দেখানো হয়।
জামায়াতে ইসলামীর মতো বিএনপি ঋণব্যবস্থা থেকে দূরে থাকছে। কেননা ছাত্রছাত্রী ও কৃষকদের জন্য ঋণ প্রদানের মতো বিষয়গুলোর দায় রাষ্ট্র থেকে মূলত জনগণের ওপরেই বর্তায়।
কেননা ঋণ সহজ শর্তে হোক বা ক্ষুদ্রঋণ হোক জনগণকেই একটা পর্যায়ে তা পরিশোধ করতে হয়, যা আমরা দেখি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে। আধুনিক সমাজব্যবস্থার ঋণের মধ্য দিয়ে কল্যাণের চেয়ে জনগণের জন্য একটি শোষণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ঋণের মধ্য দিয়ে দেশের অনেকেই তার সম্পদের দখলদারি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে, যার মালিক হয়ে পড়ে একপর্যায়ে পুঁজি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। এই ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের দেশে ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রেও আমরা অতীতে পর্যবেক্ষণ করেছি এবং তথাকথিত আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাতেও আমরা দেখতে পেরেছি কী করে ক্ষমতাহীন ঋণগ্রহীতারা ধীরে ধীরে তাঁর সম্পদের মালিকানা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। আবার আমরা সেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এমনটাও দেখেছি, কী করে দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক যাঁরা ঋণখেলাপি হয়ে দিব্যি সমাজের চোখে আদর্শ মানুষের প্রতিচ্ছবি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
তবে বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল এবং ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক, বিচারব্যবস্থা ও দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে দেশের বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে কাজ করে না এবং দুর্নীতি ও জনবান্ধব নীতির অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য আদর্শিকভাবে পুরোপুরি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা বেশ কঠিন। তবে আমরা বিএনপির ইশতেহারে দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থার স্বতন্ত্র স্বাধীনতা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তা যুগান্তকারী একটি বিষয়, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি দীর্ঘ আলোচনার বিষয় ছিল। দুর্নীতি দমন এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য এর বাস্তবায়ন জরুরি একটি বিষয়।
বিগত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটি শোষণমূলক ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটেছে, যেখানে সমাজের একটি এলিট সুবিধাভোগী অংশের আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারেনি এবং এখনো পারছে না। এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিলুপ্তির জন্য দুই প্রধান দলেরই আরও বিশদ কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে হয়। জনগণ বিগত দেড় দশকে যে নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে নির্বাচিত সরকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। জনগণের ভরসার জায়গা যেন নির্বাচিত সরকার নিশ্চিত করতে পারে, সেদিকে আন্তরিকতা না থাকলে ইশতেহারের প্রস্তাবগুলো বিগত সময়ের মতোই কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, যা জনগণের জন্য একটি হতাশার বিষয় হবে।
কল্যাণমুখী ব্যবস্থার হুবহু বাস্তবায়ন এখানে বেশ কঠিন একটি বিষয়, কেননা পশিমা দেশের জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা আমাদের নেই। তবে বাংলাদেশের জন্য কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ব্যবস্থার কিছু উপাদান আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সীমিত পরিসরে কাজ করেছে, যা বিগত সময়ে বেশ ফলপ্রসূ ছিল; যেমন নারীশিক্ষায় বৃত্তি, বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন ইত্যাদি।
সেই দিক থেকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আরও কিছু উপাদান যদি সামনে নিয়ে আসা যায়, যার সঙ্গে বাজারমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমন্বয় সাধন করা যায় তাহলে একটি মিশ্র ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের এবং জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার দিকে যাওয়া অধিক বাস্তবসম্মত।
বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে নানা মত ও নানা ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময়তার একটি অনন্য উদাহরণ। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি কী করে ধর্মীয় চরমপন্থা আমাদের সামাজিক সংহতি এবং সেই বৈচিত্র্যময়তাকে নানাভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্যের বিরুদ্ধে সহিংসতা আমরা দেখেছি। এ প্রসঙ্গে বিএনপির ইশতেহারে স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে ধর্ম-বর্ণ, জাতিগত পরিচিতি, আদর্শিক অবস্থান সত্ত্বেও প্রত্যেক নাগরিক যেন তার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিনা বাধায় উপভোগ করতে পারে। সামাজিক সংহতির এই জায়গাগুলোকে পুনরুদ্ধার করে কীভাবে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে ভরসার একটি সেতু তৈরি করা যায়, সে বিষয়গুলো তাদের ইশতেহারে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে।
যে বিষয়গুলো নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে বিশদ আলোচনা নেই। এখানে উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর প্রতি অনেকের দীর্ঘ আস্থার অভাব এবং ধারণাগত উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময়তা নিশ্চিত ও ধারণ করার ক্ষেত্রে তারা কীভাবে সেই দূরত্বগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে পূরণ করতে পারবে সে বিষয় কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এখানে উদাহরণ হিসবে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামী নারী উন্নয়নে কীভাবে কাজ করবে, সেটি জনমনে একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে থেকে যাবে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা পরিষ্কার নয়।
জুলাই-পরবর্তী সময় আমরা দেখতে পাই সামাজিক সংহতির জায়গায় নানা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা, বাউলদের প্রতি নিগ্রহ এবং নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান মর্যাদাহানিকর আচরণ, ভিন্ন জাতি, ধর্ম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর নানা নিগ্রহের ঘটনা আমাদের সাম্প্রতিক সামাজিক সংহতিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপট একটি আদর্শগত এবং বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি এই বিষয়গুলোর বিস্তারিত আলোচনা জরুরি, যা বিএনপির ইশতেহারে রয়েছে, যা প্রশংসার দাবিদার।
এসব নানা দিক বিবেচনায় বিএনপির এবারের নির্বাচনী ইশতেহারকে বাস্তবসম্মত এবং দেশের প্রান্তিক জনগণের চাহিদাকেন্দ্রিক বলা যায়। ইশতেহারে গবেষণাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাদের ইশতেহার অনেক বেশি জনবান্ধব ও বাস্তবায়নযোগ্য, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। অপর দিকে সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক নীতির বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রস্তাবিত ফ্যামিলি ও ফারমার্স কার্ড ইত্যাদি জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা সর্বজনীন কল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলে না, বরং তারা দরিদ্র, শ্রমজীবী, কৃষক, বেকার ও প্রবীণ জনগোষ্ঠী, নারী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক টার্গেটেড সমাজিক সুরক্ষার কথা বলে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, ইশতেহারের বাস্তবায়নের ক্ষমতা ও এখতিয়ার নির্বাচিত সরকারের হাতে এবং তা নির্ভর করে তাদের আন্তরিকতার ওপর। রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেমনটি আমরা দলগুলোর ইশতেহারে দেখতে পাই।
আমরা যখন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছি, তখন যাঁদের হাত ধরে আমরা এই দেশ গড়ব, তাঁদের সেই কথা ও কাজের মধ্যে যখন দেশের মানুষ মিল খুঁজে পাবে, তখনই তাঁদের প্রতি তারা তাদের আস্থার প্রমাণ দেবে। সর্বোপরি বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত জনগণের হাত ধরে থাকার প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকে, তাহলে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে ইতিবাচক না দেখার কোনো কারণ নেই।
বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব