
বাংলাদেশে কেন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রয়োজন, তা নিয়ে লিখেছেন নাদিম মাহমুদ
১৯০৯ সালে জার্মানির শেষ সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেমের উপদেষ্টা ও রাজদরবারের গ্রন্থাগারের পরিচালক আডলফ হারনাক রাজসভায় সম্রাটকে বোঝান যে জার্মানিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টিকে থাকতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি স্বাধীন ‘গবেষণাপ্রতিষ্ঠান’ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা বিশ্ববিদ্যালয় ও একাডেমির কাজের পরিপূরক হবে। তিনি সম্রাটকে জার্মান বিজ্ঞান সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
হারনাকের প্রস্তাবের পরের বছর, ১৯১০ সালের ১০ অক্টোবর বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেম বিজ্ঞান গবেষণার জন্য একটি নতুন প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা দেন। তাঁর নামের সঙ্গে মিল রেখে সেই প্ল্যাটফর্মের নাম হয় ‘কাইজার ভিলহেম সোসাইটি’।
হারনাকের দেওয়া এই সোসাইটির মূল দর্শনই ছিল যে এটি কেবল বিশুদ্ধ মৌলিক গবেষণায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করবে, যেখানে পড়ানোর কোনো দায়িত্ব থাকবে না। রাষ্ট্র ও শিল্প খাতের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত হবে এই ইনস্টিটিউট, যেখানে স্বনামধন্য বিজ্ঞানীরা নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে অত্যাধুনিক গবেষণা করবেন।
এরপর একে একে সোসাইটিতে যোগ দেন আলবার্ট আইনস্টাইন, অটো হান, লিজ মাইটনার, ফ্রিটস হেবার ও ম্যাক্স প্লাংকের মতো বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীরা। অল্প দিনেই এই ইনস্টিটিউটের সুখ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে গোটিঙেনে ‘কাইজার ভিলহেম সোসাইটি’ নোবেলজয়ী বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাংকের নামে নতুন করে নামকরণ করা হয়, ‘ম্যাক্স প্লাংক সোসাইটি’, যার অধীনে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অতি সুপরিচিত ‘ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট’ পরিচালিত হয়ে আসছে।
কাইজার ভিলহেম সোসাইটি প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর, জাপানে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি এইচি শিবুসাওয়া ১৯১৩ সালে একদল ধনী ব্যবসায়ী ও সমাজপতিকে সেই সময়ের অতি জনপ্রিয় গবেষক জোকিচি তাকামিনের অ্যাড্রেনালিনের স্ফটিক পৃথক্করণ আবিষ্কারের গল্প শোনাতে এক সেমিনারে আমন্ত্রণ জানান। সেই সেমিনারে তাকামিনে জার্মানির কাইজার ভিলহেমের প্রসঙ্গ তুলে আনেন।
হারনাকের মতো তিনিও জাপানের সেই ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের বোঝান যে জার্মানি ইতিমধ্যে কাইজার ভিলহেম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছে, যুক্তরাষ্ট্রে রকফেলার ইনস্টিটিউট ও কার্নেগি ইনস্টিটিউশন রয়েছে এবং ফ্রান্সে রয়েছে ইনস্টিটিউট পাস্তুর। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে জাপানেরও নিজস্ব একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়া প্রয়োজন।
এই আলোচনার ঠিক চার বছর পর, ১৯১৭ সালের ২০ মার্চ শিবুসাওয়া ও বিভিন্ন গবেষণা ক্ষেত্রের নেতৃবৃন্দ মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রিকেন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে জাপানে তো বটেই, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা ইনস্টিটিউট, যেখানে দেশি ও বিদেশি গবেষকেরা নিরলসভাবে গবেষণা করে যাচ্ছেন।
শুধু রিকেন কিংবা ম্যাক্স প্লাংক সোসাইটি নয়, এসব গবেষণাগারকে অনুসরণ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় কাইস্ট (কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি), চীনা বিজ্ঞান একাডেমি (সিএএস), ভারতের টিআইএফআর কিংবা টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, ইসরো, যুক্তরাজ্যের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউট, যুক্তরাষ্ট্রের স্ক্রিপস, হাওয়ার্ড হিউজ মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট, অ্যালেন ইনস্টিটিউট, সিঙ্গাপুরের এ-স্টারের মতো বড় বড় গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে গবেষকেরা প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম থেকে দূরে থেকে শুধু গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন।
ওপরের এই আলোচনার কারণ হলো, বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে শিক্ষা ও গবেষণা যেভাবে তলানির দিকে যাচ্ছে, তাতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের অন্তত এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার তৈরি প্রয়োজন, যেটি হবে আমাদের হৃৎপিণ্ড। অর্থাৎ উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো এই গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা আমাদের চেয়ে শত বছর আগে অনুভব করলেও, আমাদের দেশের জন্মের ৫৫ বছরেও কোনো শাসকগোষ্ঠীর ভাবনার মধ্যে এটি পড়েনি। ফলে অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির পরও আমাদের উচ্চশিক্ষার মানের কোনো চোখে পড়ার মতো উন্নতি হয়নি। যদিও ষাটের দশক থেকে আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বা আইসিডিডিআরবির মতো একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তবু আন্তর্জাতিক বাজারে টিকতে হলে আমাদের মৌলিক ও ফলিত গবেষণার জন্য আরও শক্তিশালী গবেষণাগার থাকতেই হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন আমাদের একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার প্রয়োজন? কারা সেখানে গবেষণা করবে? কীভাবে এই প্রতিষ্ঠান অর্থসহায়তা পাবে? পাঠক এসব নিয়ে চলুন একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন প্রকৌশল, ন্যানোপ্রযুক্তি ও জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে যেসব দেশ এগিয়ে থাকবে, তারাই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশ যদি এখনই এই প্রতিযোগিতায় বিনিয়োগ শুরু না করে, তাহলে আগামী কয়েক দশকে প্রযুক্তিগত পরনির্ভরতা আরও গভীর হবে।
বর্তমানে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে বাজারে নিজেদের টিকে থাকতে হলে অবশ্যই জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকতেই হবে। এ কথা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই যে আমাদের মতো ছোট দেশগুলো যদি নিজেদের মেলে ধরতে চায়, তবে তার গবেষণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতা দিয়ে সম্ভব। তাইওয়ানের মতো ছোট একটি দেশ বা প্রদেশ আজ প্রযুক্তির উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে। যে দক্ষিণ কোরিয়া পঞ্চাশের দশকে আমাদের মতো অবস্থানে ছিল, সেই দেশটি বিজ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে আজ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হয়েছে। ফলে যে দেশ নিজস্ব সমস্যার সমাধান নিজে খুঁজে বের করতে পারে, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্ঞানভান্ডারে অবদান রাখতে পারে, সেই দেশই দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকে ও এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য তাই অন্তত একটি বিশ্বমানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের নিরিখে প্রয়োজন।
প্রতিটি দেশ যখন নিজেদের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানের বাইরে একটি স্বতন্ত্র গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে—যেখানে গবেষকেরা ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষার খাতা দেখা বা প্রশাসনিক কাজের চাপ ছাড়াই কেবল নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করতে পারেন।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন অধ্যাপককে একই সঙ্গে ক্লাস নিতে হয়, পরীক্ষা নিতে হয়, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, আবার গবেষণাও করতে হয়। ফলে কোনো কাজেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এর বিপরীতে একটি স্বাধীন গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষকদের কেবল গবেষণায় নিমগ্ন থাকার সুযোগ দেয়, যা মৌলিক আবিষ্কারের সম্ভাবনা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন প্রকৌশল, ন্যানোপ্রযুক্তি ও জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে যেসব দেশ এগিয়ে থাকবে, তারাই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশ যদি এখনই এই প্রতিযোগিতায় বিনিয়োগ শুরু না করে, তাহলে আগামী কয়েক দশকে প্রযুক্তিগত পরনির্ভরতা আরও গভীর হবে।
ধরুন, ওষুধ উৎপাদনে আমাদের দেশ অনেক এগিয়ে। গরিব দেশ হওয়ায় মেধাস্বত্ব কেনার ছাড় থাকায় অনায়াসে এ দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে আয় করছে, কিন্তু কেউ গবেষণায় ব্যয় করছে না। ফলে ভবিষ্যতে এই মেধাস্বত্ব কেনার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে, আমাদের বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে সেসব ওষুধের মেধাস্বত্ব কিনতে হবে। এখন যদি আমাদের ছেলেমেয়েরা দেশেই ওষুধশিল্প গবেষণায় এগিয়ে থাকত, তাহলে নিশ্চয় ভবিষ্যতে এই সমস্যার কিছুটা হলেও লাঘব হওয়ার সুযোগ থাকত।
আমরা যদি সাম্প্রতিক কালে ডেমোগ্রাফের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছর অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান এবং তাঁদের একটি বড় অংশই উচ্চশিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণ শেষে আর দেশে ফেরত আসছেন না। মানে মেধা পাচার হচ্ছে বছরের পর বছর, রিভার্স ব্রেন ড্রেন করার চেষ্টা কেউ করেনি। এর অন্যতম কারণ হলো, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে সেকেলে ও স্বজনপ্রীতি, এবং গবেষণার সীমিত সুযোগ।
এখন আমাদের ভেতর নিশ্চয় প্রশ্ন তৈরি হবে, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার তৈরি করতে হলে যে বিপুল অঙ্কের টাকার প্রয়োজন তা কোথা থেকে আসবে? কীভাবে সেই অর্থ গবেষণাগারে ব্যবহার করা হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে আমাদের একটি বিষয় আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। ধরুন, বাংলাদেশে পদ্মা সেতু তৈরি হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে কোনো একটি বড় সেতু তৈরি করতে হবে। তাহলে এই যে সেতু তৈরি করতে হবে, তার নকশা প্রণয়ন, প্রজেক্ট মূল্যায়ন কিংবা ভৌত অবকাঠামোর বাস্তবিক নিরীক্ষা করার জন্য কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করে বিদেশি কোনো গবেষক, প্রতিষ্ঠানের কাছে ধরনা দিতে হবে। এসব কাজ করার সক্ষমতা যদি আমাদের সেই ইনস্টিটিউট থেকে হয়, তাহলে সেই অর্থ কি আর বিদেশে যাবে? কিংবা ধরুন, দেশে প্রতিবছর নানা টিকা ক্রয় করতে হচ্ছে, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। তারা টিকা ক্রয়ে মিলিয়ন ডলার আয় করছে। এখন আমাদের এমন একটি ইনস্টিটিউট যদি থাকে, যেখানে গবেষকেরা গবেষণার পাশাপাশি নিজস্ব ফ্যাসিলিটি তৈরি করে টিকা উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয়, তাহলে নিশ্চয় এই অর্থ দেশেই থাকবে?
এই দুটি কেবলই উদাহরণ দিলাম। এ দেশের অনেক শিক্ষিত মানুষ মনে করে, গবেষণার অর্থ ঢালার মানে হচ্ছে অপচয়। এরা অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল প্রত্যাশা করে। কিন্তু বাস্তবে গবেষণার ফলাফল ধীরগতিতে আসে। গবেষণায় অর্থ ব্যয় করে কখনো কোনো দেশ দেউলিয়া হয়ে যায় না, দেউলিয়া হয় মৌলিক জ্ঞানের অভাবে, সঠিক সময়ে সঠিক ব্যয়ের অভাবে।
কাইজার ভিলহেম সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল মূল চালিকা শক্তি। এ দেশের অনেক রাষ্ট্রীয় অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের খরচ এ দেশের মানুষ জানতে পারে না। কিন্তু আমরা যদি এমন কোনো গবেষণাগার তৈরি করি, যেখানে রাষ্ট্রের বাজেটের শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশও যদি বরাদ্দ করা হয়, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে হবে শক্তিশালী জ্ঞান ও গবেষণা তৈরি উত্তম আশ্রয়স্থল। রাজনৈতিক প্রভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বাইরে গিয়ে গবেষণাগারটির আয়-ব্যয়ের জবাবদিহি থাকবে জনগণের কাছে।
দীর্ঘমেয়াদি ও স্বায়ত্তশাসিত অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে বছরভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের অনিশ্চয়তা থাকবে না এবং রাজনৈতিক প্রভাব ন্যূনতম থাকবে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগ ও পদোন্নতি হতে হবে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক, জ্যেষ্ঠতা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, তথ্যভান্ডার ও প্রকাশনা-অ্যাকসেস নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গবেষকেরা বৈশ্বিক মানে কাজ করতে পারেন।
সরকারি অর্থায়ন না পেলেও দূরদর্শী শিল্পপতিরা একত্র হয়ে তহবিল গঠন করতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে পারে, বিশেষত যদি তারা দেখে যে এই গবেষণার ফল তাদের নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের আয়ের একটি অংশ গবেষণাগারের ফান্ডে জমা দিতে হবে।
এর ফলে সরকার তাদের ট্যাক্স কিছু শিথিল করে দিতে পারে। এ ছাড়া বিদেশে অবস্থানরত সফল বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে, যা অনেক দেশেই প্রবাসীদের মাধ্যমে গবেষণা তহবিল গঠনের একটি প্রমাণিত মডেল। গবেষণালব্ধ পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বাহ্যিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমাবে।
শুধু অর্থ থাকলেই একটি বিশ্বমানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার তৈরি করতে হলে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা থাকাই বাঞ্ছনীয়। প্রয়োজন এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানটি মুক্ত থাকবে এবং নিয়োগ-পদোন্নতি হবে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক। হারনাকের সেই ‘নীতি’ ছিল সেরা বিজ্ঞানীদের স্বাধীনতা দিয়ে গবেষণায় সহায়তা করা আজও বিশ্বের প্রতিটি সফল গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তবে মনে রাখতে হবে, এ দেশের রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি আমাদের ধ্বংস করছে, তবে এসব লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বাইরে সম্পূর্ণ একাডেমিক স্বাধীনতার আঁতুড়ঘর হিসেবে এমন ইনস্টিটিউট হতে হবে, যার গবেষকদের বেতনকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তাবলয় থাকবে স্বতন্ত্র।
প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বায়ত্তশাসিত অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে বছরভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের অনিশ্চয়তা থাকবে না এবং রাজনৈতিক প্রভাব ন্যূনতম থাকবে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগ ও পদোন্নতি হতে হবে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক, জ্যেষ্ঠতা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, তথ্যভান্ডার ও প্রকাশনা-অ্যাকসেস নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গবেষকেরা বৈশ্বিক মানে কাজ করতে পারেন। চতুর্থত, প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে দেশে ফেরার পথ সহজ করতে হবে। পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সংযোগ জোরদার করতে হবে, যাতে গবেষণার ফলাফল বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য হয়।
এসব করার সদিচ্ছা যদি সরকারের কখনো তৈরি হয়, তবে এ দেশে নতুন নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হবে, বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
মতামত লেখকের নিজস্ব