লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলোতে বাড়তি আসন বসিয়ে চড়া ভাড়া আদায় চলছে
লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলোতে বাড়তি আসন বসিয়ে চড়া ভাড়া আদায় চলছে

কল্লোল মোস্তফার কলাম

লক্কড়ঝক্কড় গণবাসের ভিড়ে এমপিদের গাড়ি–বাসনা

নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্যদের বসার জায়গার ব্যবস্থা করা ও সরকারি কর্মকর্তাদের মতো গাড়ি–সুবিধা দেওয়ার দাবি নিয়ে সম্প্রতি সরগরম হয়ে উঠেছিল জাতীয় সংসদ। এ সময় সংসদ সদস্যদের নিজেদের সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে বেশ আগ্রহী দেখা যায়।

সংসদ সদস্যরা নিজ অর্থে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ বাতিল করলেও সরকারি অর্থে গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা চান, যে গাড়ি কিনে দিতে হলে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে। যদিও তাঁরা মাসে ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতাসহ নানান সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবু ‘মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য’ তাঁদের সরকারি গাড়ি চাই। তবে যে মানুষের সেবার জন্য তাঁদের এত আগ্রহ, সেই মানুষদের যাতায়াত সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তাঁরা আদৌ কিছু ভাবেন কি না, স্পষ্ট নয়।

রাজধানী ঢাকার কথাই ধরা যাক। ঢাকার রাজপথের দিকে তাকালে প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের মিলনস্থল বলে মনে হয়। এখানে একদিকে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও অভিজাতদের ব্যবহৃত সারি সারি প্রথম বিশ্বের দামি গাড়ি। অন্যদিকে তার ঠিক পাশেই ছাল–চামড়া ওঠানো গাদাগাদি করে মানুষভর্তি লক্কড়ঝক্কড় তৃতীয় বিশ্বের বাস।

এ বাসগুলো যে মানুষের চলাচলের অনুপযোগী, তা বহুদিন থেকেই নীতিনির্ধারকদের জানা। ২০১০ সাল থেকে পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাস রাস্তা থেকে উঠিয়ে নেওয়ার আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু গাড়ি চড়া নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার অভাবে আজও ঢাকার রাস্তায় লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলোতে অতিরিক্ত আসন বসিয়ে চড়া ভাড়া আদায় চলছে।

সম্প্রতি প্রথম আলোয় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে, ঢাকা থেকে নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের ৩০ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ। মেয়াদ থাকা বাসগুলোরও অবস্থা তেমন ভালো নয়। বাসের ভাড়া নির্ধারণের সময় রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ অর্থ হিসাব করা হলেও বাস্তবে মালিকেরা রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে অর্থ ব্যয় করেন না। ফলে ছালবাকল ওঠা, রংচটা, লক্কড়ঝক্কড় বাসের ময়লা-ছেঁড়া আসনেই গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয় মানুষকে। যে বাসে নিয়মানুযায়ী ৩০ আসন থাকার কথা, সেখানে আসন থাকে ৩৬টি। দুই আসনের মাঝখানে ন্যূনতম ২৬ ইঞ্চি জায়গা রাখার নিয়মও মানা হয় না। সব মিলিয়ে বাসগুলোতে দুই পা মেলে ঠিকঠাক বসারই উপায় থাকে না। গরমের দিনে ঘামে ও বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। এত কষ্ট সহ্য করতে রাজি থাকার পরও প্রয়োজনের সময় বাস পাওয়া ও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বাসে ওঠানামা এবং ভেতরে গাদাগাদি করে যাতায়াত করা এক বীভৎস অভিজ্ঞতা।

শুধু বাসগুলোর কাঠামোই যে খরাপ তা নয়, ঢাকার বাস চলাচলের অনুমোদন থেকে শুরু করে এর পরিচালনপদ্ধতি পুরোটাই সমস্যাজনক। বর্তমানে ৩০০ কোম্পানির অধীনে চার হাজার মালিকের প্রায় সাত হাজার বাস ঢাকায় চলাচল করে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রুটে বাস পরিচালনার প্রধান শর্ত হলো রাজনৈতিক প্রভাব।

এই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই পরিবহনব্যবস্থায় কোনো সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যথাযথ ফিটনেস সনদ না থাকা বাসের মালিকেরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানিতে বাস ভাড়া দিয়ে পুলিশ ও বিআরটিএর কার্যকর পদক্ষেপ এড়াতে সক্ষম হন।

ক্ষমতাসীন বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে গণপরিবহনব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়ন, অধিকতর কার্যকর ও সহজলভ্য করা এবং বাস রুট রেশনালাইজেশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অতীতে নীতিনির্ধারকদের অবহেলা ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধার কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গণপরিবহনব্যবস্থার মানোন্নয়ন সফল হয়নি। এখন দেখার বিষয় বিএনপি সরকার গণপরিবহনের মানোন্নয়নে কতটা দক্ষতা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়।

এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো সাধারণত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাস কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ও বাসমালিক সমিতির নেতৃত্বেও পরিবর্তন ঘটে। আগে যেসব কোম্পানি ও সমিতি আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ছিল, সেগুলো এখন বিএনপি-সম্পৃক্ত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

এভাবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে প্রভাবশালীরা বাস রুটের অনুমোদন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন বাসমালিককে সেই রুটে বাস চালানোর সুযোগ প্রদান করে—যা পুরো ব্যবস্থাকে একটি ভাড়াভিত্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত লুণ্ঠনমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিণত করেছে।

এই ব্যবস্থায় বাসের মালিকেরা আবার চুক্তির ভিত্তিতে পরিবহনশ্রমিকদের হাতে বাস তুলে দেন। দিন শেষে মালিককে দেওয়ার জন্য জমার টাকা, জ্বালানি খরচ, টোল, চাঁদা ও ঘুষের ব্যবস্থা করার পর যা থাকে, তা ভাগাভাগি করে নেন চালক ও তাঁর সহকারী। এই টাকা তোলার জন্য চালকেরা কোনো নিয়ম মানেন না। আসনসংখ্যার বেশি যাত্রী পরিবহন, জায়গায় জায়গায় থেমে যাত্রী ওঠানো–নামানো, বাড়তি ভাড়া আদায় থেকে রেষারেষি করে বেপরোয়া গতিতে বাস চালানো—সবই চলে।

এভাবে ফিটনেসবিহীন বাসের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের ফলে যাত্রীরা আরামদায়ক বাসযাত্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যানজট ও পরিবেশ দূষণ বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও জখম হওয়ার ঘটনা। অন্যদিকে এই অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার সুযোগে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলে মালিক-শ্রমিক সমিতি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, পুলিশ, বিআরটিএর কর্মকর্তাসহ স্বার্থান্বেষীরা। পরিবহনব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যার টেকসই সমাধানের পথে বর্তমান ব্যবস্থার এই সুবিধাভোগীরাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ঢাকার যানজট ও যাতায়াত সমস্যার সমাধান করতে হলে বাসব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই। ঢাকার যানজটের সমস্যা নিরসনে তৈরি সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) বলা হয়েছে, বাস বর্তমানে যেমন যাত্রী চলাচলের প্রধানতম বাহন, ভবিষ্যতেও তা–ই থাকবে। এমনকি সাতটি এমআরটি-বিআরটি তৈরির পরও এগুলো সব মিলিয়ে ২০ শতাংশের বেশি যাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। এ কারণে আরএসটিপিতে বাসব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে বাসের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়েছে এবং এ জন্য তিন থেকে পাঁচটি কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

অথচ বিগত সময়ে বাসব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর মতো মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ কাজটি না করেই ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো ব্যক্তিগত গাড়িবান্ধব ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মানুষ বাসের বদলে ব্যক্তিগত গাড়িসহ ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে, যা যানজট সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। কারণ, ৪০ থেকে ৫০ জন মানুষ পরিবহন করে একটি বাস রাস্তার যতটুকু জায়গা দখল করে, ততটুকু জায়গা দখল করে দুটি ব্যক্তিগত গাড়িতে মাত্র চার–পাঁচজন মানুষ যাতায়াত করে। ফলে অবস্থা এ রকম দাঁড়িয়েছে যে মাত্র ৯ শতাংশ যাত্রী পরিবহনকারী ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তার ৭০ শতাংশ দখল করে থাকে, আর অধিকাংশ যাত্রী পরিবহনকারী বাসের জন্য থাকে রাস্তার মাত্র ১৫ শতাংশ।

এই অস্বাভাবিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হলে বাস পরিচালনা ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক করতে হবে। অর্থাৎ একটি পথে শুধু একটি কোম্পানির, একই রঙের বাস চলবে। এই কোম্পানিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিআরটিসির যথাযথ অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো বেসরকারি কোম্পানি একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। বাসগুলো হতে হবে মানসম্পন্ন ও আরামদায়ক।

এতে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত হবে, ফলে ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট যানবাহন দিয়ে ঢাকার রাস্তা ভরে যাওয়া বন্ধ হবে। শ্রমিকদের হাতে চুক্তির ভিত্তিতে বাস তুলে দেওয়ার বদলে তাঁদের জন্য মাসিক বেতন, বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এতে বাসগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র রাস্তায় আড়াআড়িভাবে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা ইত্যাদি বন্ধ হবে এবং যানজট কমে আসবে। ঢাকার পর গণপরিবহনের এই মডেল পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রামসহ সব ঘনবসতিপূর্ণ নগরে বাস্তবায়ন করতে হবে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে গণপরিবহনব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়ন, অধিকতর কার্যকর ও সহজলভ্য করা এবং বাস রুট রেশনালাইজেশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অতীতে নীতিনির্ধারকদের অবহেলা ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধার কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গণপরিবহনব্যবস্থার মানোন্নয়ন সফল হয়নি। এখন দেখার বিষয় বিএনপি সরকার গণপরিবহনের মানোন্নয়নে কতটা দক্ষতা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়।

  • কল্লোল মোস্তফা লেখক ও গবেষক। নির্বাহী সম্পাদক, সর্বজনকথা

  • মতামত লেখকের নিজস্ব