সমাজে শান্তি বুনতে হলে, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন চাইলে অবশ্যই আদিবাসী নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজে শান্তি বুনতে হলে, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন চাইলে অবশ্যই আদিবাসী নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

মতামত

আন্তর্জাতিক আদিবাসী নারী দিবস কেন পালন করা দরকার

প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ ঘোষিত ৫ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী নারী ও কন্যা দিবস’ পালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর সাধারণ পরিষদ রেজোল্যুশন এ/আরইএস/৮০/১০ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর এই দিবস পালনের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে আমাদের দেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দিবস পালন করা জরুরি বলে মনে করি।  

দিবসটি ঘোষণা করা হয়েছে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রতিফলনের জন্য, যাতে আদিবাসী নারী ও কন্যার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং কল্যাণের জন্য বিশেষ ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে সবাই এগিয়ে আসেন।

বলা হয়েছে, সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত ঐতিহাসিক কাঠামোগত বৈষম্য তাঁদের দারিদ্র্য, অশিক্ষা-নিরক্ষরতা, ভূমি, বন ও সম্পদে তাঁদের অনিশ্চিত বা সীমিত অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চনা, আইনি আশ্রয় না পাওয়া, জোর করে উচ্ছেদ ও পাচার, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অসম অংশগ্রহণ ইত্যাদিতে প্রভাব ফেলেছে।

তাই আদিবাসী নারী ও কন্যার মর্যাদা ও অধিকারের স্বীকৃতি, সমর্থন এবং এখানে বিনিয়োগ শুধু ন্যায্যই নয়, এটি মানুষ ও ধরিত্রীর জন্য টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল ভবিষ্যৎ গঠনের প্রয়োজনীয় শর্ত।

পাশাপাশি জাতিসংঘ বলেছে, আদিবাসী নারী ও কন্যার আনুমানিক সংখ্যা বিশ্বে ১৯ কোটি। তাঁরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দান, পরিবেশ ও প্রথাগত জ্ঞানের রক্ষক, জলবায়ু সহনশীলতা, টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবর্তনের প্রতিনিধি। এসব নারী জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবদান রাখে, ভাষা ও সংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে বহন করে চলে।

অন্যদিকে বহুমুখী বৈষম্য ও অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার কারণে তাঁরা উচ্চ মাতৃমৃত্যুর হার ও শিশুমৃত্যুর হার, প্রসূতি সহিংসতা ও কিশোরী গর্ভাবস্থা ইত্যাদির শিকার হন অনায়াসে। আমাদের দেশে এসব বিষয়ে বিভাজিত কোনো তথ্যই নেই।

ম্যানুয়েল এলিয়াস, ডেভিড স্মিথ/অ্যাডোবি স্টক, লোই ফেলিপে, ইউএন ডেসা এবং কিবে পার্কের তোলা প্রতিকৃতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি

জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসকে সামনে রেখে আমাদের অন্যতম করণীয় হলো, নারী ও কন্যাসন্তানের প্রতি সমাজের বহু পুরোনো নেতিবাচক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সম্মিলিতভাবে কাজ করা। আইনগত ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যবধান কমানোর জন্য অ্যাডভোকেসি, নেতৃত্বের বিকাশ ও নারীর সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বিশেষ আলোকপাত করা।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আদিবাসী দিবসের বাণীতে বলেছিলেন, ‘আদিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেমের রক্ষক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করে। তারপরও আদিবাসী মানুষের অধিকার ও জীবন-জীবিকা নানা হুমকির সম্মুখীন। অন্যান্য অ-আদিবাসী জনগণের তুলনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাতৃ ও শিশু–সংক্রান্ত জটিলতা এবং মৃত্যুহার অনেক বেশি। জাতিসংঘ তার সদস্যরাষ্ট্রগুলো এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অধিকারভিত্তিক আদিবাসী স্বাস্থ্য অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে কাজ করছে। আমাদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদিবাসী নারীরা যেন নিজের শরীর, স্বাস্থ্য ও যত্ন সম্পর্কে অবহিত থাকেন। আসুন আমরা আদিবাসী ধাত্রীদের এবং তাঁদের সম্প্রদায়ের বিকাশে ও উন্নয়নে যা কিছু প্রয়োজন, তা নিশ্চিতকরণে একসঙ্গে কাজ করি।’

তাই আদিবাসী নারী ও কন্যার মর্যাদা ও অধিকারের স্বীকৃতি, সমর্থন এবং এখানে বিনিয়োগ শুধু ন্যায্যই নয়, এটি মানুষ ও ধরিত্রীর জন্য টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল ভবিষ্যৎ গঠনের প্রয়োজনীয় শর্ত।

আমি দুই দশক আগে জাতিসংঘের ফোরামে গিয়ে শুনেছিলাম, আদিবাসী নারীরা পাঁচটি স্তরে বৈষম্যের শিকার হন। এক. আদিবাসী হিসেবে; দুই. নারী হিসেবে; তিন. দরিদ্র নারী হিসেবে; চার. দুর্গম পাহাড়-বনাঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে; এবং পাঁচ. অভিবাসী নারী হিসেবে।

ইউএন উইমেন, ফিমি (ইন্টারন্যাশনাল ইনডিজিনাস উইমেন ফোরাম), আইডব্লিউজিআইএ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিরলস কাজ করছে তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসী নারীর কণ্ঠ জোরালো করার জন্য। তারা বলছে, ‘আমাদের ইতিহাস মরবে না, আমাদের কণ্ঠও স্তব্ধ হবে না।’

সমাজে শান্তি বুনতে হলে, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন চাইলে, আর গ্রহণযোগ্য সংলাপের পরিবেশ ও রিকনসিলেশন আনতে হলে অবশ্যই আদিবাসী নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

  • সঞ্জীব দ্রং কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী। ই–মেইল: sanjeebdrong@gmail.com
    *মতামত লেখকের নিজস্ব