১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া

মতামত

খালেদা জিয়া যেভাবে দেশের অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের নীরব স্থপতি

খালেদা জিয়া বলতেই সংগত কারণে জনমনে যে ছবি ভেসে ওঠে, তা একজন আপসহীন রাজনৈতিক নেত্রীর; যিনি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক দুর্দমনীয় কণ্ঠস্বর। সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী দশকগুলোর ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক। তাঁর শালীনতা ও শিষ্টাচার অনন্য। আপামর জনতা তাঁর দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদী চিন্তাচেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁকে সর্বাধিক নির্বাচনী জয়ের রেকর্ডে ভূষিত করেছে।

আরেক খালেদা জিয়ার কথা বলাও জরুরি। তিনি এক দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের স্থপতি। সেই রূপান্তরের নাম—ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষপীড়িত, কৃষিনির্ভর সমাজ থেকে রপ্তানি, অভিবাসন ও শিল্পায়নের পথযাত্রা। এই যাত্রা কোনো নাটকীয় ঘোষণার ফল ছিল না; ধাপে ধাপে ঘটে যাওয়া কাঠামোগত পরিবর্তনের সমষ্টি। তিনি কাজ করেছেন নীরবে, নিভৃতিতে; স্তুতির বন্যায় নয়।

যে নেতারা নিজেরাই তাঁদের সাফল্য নিয়ে কথা বলেন না, ইতিহাস সাধারণত তাঁদের প্রতি নির্মম হয়। আর পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির কাঠামোয় একজন নারীর ক্ষেত্রে এই নির্মমতা আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে তাঁর সবচেয়ে স্থায়ী অবদান—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের নীরব বিনির্মাণ।

দারিদ্র্য হ্রাস: যে প্রবৃদ্ধি সমাজের নিচ স্তর পর্যন্ত পৌঁছেছিল 

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রথমবার এক নিরেট দরিদ্র দেশে সরকার গঠন করেন। তখন মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। ১৯৯৬ সালে তাঁর প্রথম মেয়াদ শেষে এই দারিদ্রের হার নেমে আসে ৫৩ দশমিক ১ শতাংশে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের চক্র থেকে মুক্তি লাভ করে।

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের দ্বিতীয় মেয়াদে এই পরিবর্তন আরও গভীরে প্রোথিত হয়। মাত্র পাঁচ বছরে ১ কোটি ২০-৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বেরিয়ে আসে। দুই মেয়াদ মিলিয়ে মোট ১ কোটি ৬০ থেকে ৮০ লাখ মানুষের জীবনে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। এটি এক ঐতিহাসিক সাফল্য। চীনের দারিদ্র্য বিমোচনের রেকর্ড জানা থাকলেও খালেদা জিয়ার সাফল্য অনুচ্চারিত রয়েছে।

এই দারিদ্র্য হ্রাসকে কেবল সংখ্যার হিসাবে দেখা হয়, তবে তাঁর রাজনৈতিক তাৎপর্য অধরাই থেকে যায়। বাংলাদেশের মতো একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে দারিদ্র্য কেবল আয়ের অভাব নয়; এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের প্রশ্ন। খালেদা জিয়ার শাসনকালে যে পরিবর্তনটি ঘটেছিল, তা ছিল রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির এক মৌলিক পরিবর্তন—রাষ্ট্র নিজে সর্বত্র উপস্থিত থাকবে না; কিন্তু মানুষকে কাজে, বাজারে ও চলাচলের সুযোগ করে দেবে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি কোনো নব্য উদারবাদী তত্ত্বের অনুকরণ ছিল না, আবার কোনো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাবাদও নয়। এটি বাংলাদেশের বাস্তবতার ভেতর জন্ম নেওয়া এক বাস্তববাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কৌশল। রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা তাঁর জানা ছিল; আবার এটাও তিনি জানতেন, কোন দরজাগুলো খুলে দিলে সমাজ নিজেই গতিশীল হয়ে উঠবে। এ কারণেই খালেদা জিয়ার আমলে প্রবৃদ্ধি কেবল ওপরের স্তরে আটকে থাকেনি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বেড়ে যাওয়ায় সমাজের অবহেলিত মানুষ প্রবৃদ্ধির ভাগীদার হয়েছিল। 

পাটের স্মৃতি পেরিয়ে শিল্পসমাজের ভিত্তি

অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের জন্য অন্যান্য শর্তের পাশাপাশি শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি অপরিহার্য। খালেদা জিয়া পাটশিল্পের নিম্নগামিতার স্মৃতিতে আচ্ছন্ন অর্থনীতির উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই তৈরি পোশাক খাত ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রধান ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়।

প্রথম মেয়াদে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় তিন গুণ বাড়ে। মোট রপ্তানিতে এই খাতের অংশ ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশে। দ্বিতীয় মেয়াদে পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ বাড়ে। রপ্তানি বৈচিত্র্যের ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়। ‘মাল্টিফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট’–এর অবসান ঘিরে যখন অনেকেই বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ধসের আশঙ্কা করছিলেন, তখনো এই খাত টিকে যায়। ২০০৬ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক মোট রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশে পৌঁছায়। অন্যান্য শিল্পের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

নারীর শ্রমবাজারে প্রবেশ এই শিল্পের সবচেয়ে গভীর সামাজিক প্রভাব। লাখ লাখ গ্রামীণ নারী প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক খাতে নগদ আয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। পরিবার, গ্রাম ও সমাজের ক্ষমতার সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে। এই পরিবর্তন কোনো নারী-উন্নয়ন প্রকল্পের ফল ছিল না; এটি ছিল অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের এক গভীর সামাজিক ফলাফল।

খালেদা জিয়ার শাসনকালে সামরিক হস্তক্ষেপের স্মৃতি তখনো তাজা, গণতন্ত্র ভঙ্গুর আর আন্তর্জাতিক দাতাদের চাপ প্রবল ছিল। এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন অর্জন, কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া। তিনি নিয়ন্ত্রণের বদলে মানুষের জন্য, শ্রমের জন্য, পুঁজির জন্য চলাচলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন।

খালেদা জিয়ার সবচেয়ে কম স্বীকৃত অথচ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অবদান হলো প্রবাসী আয় অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণ। ১৯৯১ সালে যেখানে প্রবাসী আয় ছিল মাত্র ৭৬৪ মিলিয়ন ডলার। মিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে ১৯৯৬ সালে দেশে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আগমনের মধ্য দিয়ে বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করে। ২০০১-০৬ সালে বেড়ে হয় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শ্রম রপ্তানির উল্লম্ফনে মাত্র পাঁচ বছরে প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটে।

প্রবাসী আয় গ্রামীণ বাংলাদেশে এক অদৃশ্য কল্যাণরাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করে। ভোগ, বাসস্থান, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে প্রাণ সঞ্চার করে। আজকের বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভিত্তি তখনই গড়ে উঠেছিল। বিশেষত পতিত সরকার অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ফেলে পালালেও প্রবাসী আয় অর্থনীতিতে অক্সিজেন জুগিয়ে যাচ্ছে।

১৯৯০-৯১ সালে কৃষির অংশ ছিল জিডিপির ৩০ শতাংশ আর শিল্পের ২১ শতাংশ। ২০০৬ সালে এসে শিল্পের অংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ শতাংশে, কৃষি নেমে আসে ২০ শতাংশে। ইতিহাসে প্রথমবার শিল্প কৃষিকে ছাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে।

এই রূপান্তরে ক্ষুধার্তের সংখ্যা বাড়েনি। খাদ্যসহায়তার ওপর ঐতিহাসিক নির্ভরতা আর নেই। ধানের উৎপাদন বেড়েছে, খাদ্যনিরাপত্তা সংহত হয়েছে। শিল্প বেড়েছে, একই সঙ্গে বোরো ধানের উৎপাদন বাড়ায় দানাদার শস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। এই ভারসাম্য কোনো কাকতাল নয়; এটি নীরব কিন্তু সুপরিকল্পিত কাঠামোগত পরিবর্তনের ফসল।

রাষ্ট্র, ট্র্যাজেডি ও নৈতিক সত্য

খালেদা জিয়ার শাসনকালে সামরিক হস্তক্ষেপের স্মৃতি তখনো তাজা, গণতন্ত্র ভঙ্গুর আর আন্তর্জাতিক দাতাদের চাপ প্রবল ছিল। এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন অর্জন, কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া। তিনি নিয়ন্ত্রণের বদলে মানুষের জন্য, শ্রমের জন্য, পুঁজির জন্য চলাচলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন।

খালেদা জিয়া ব্যক্তিগত শোকের সীমানায় আবদ্ধ থাকবেন না। তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবচেতনের ভেতর প্রতিধ্বনিত হবেন। যে রাষ্ট্র একজন নাগরিককে কার্যত বন্দী রেখে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, সে রাষ্ট্র নিজেই এক গভীর নৈতিক ও রাজনৈতিক অসুখে নিপতিত। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ কোনো একক মানুষের ট্র্যাজেডি নয়; এটি রাষ্ট্রের ট্র্যাজেডি—যেখানে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তাঁর ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে।

খালেদা জিয়া প্রতাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব, কণ্ঠ রোধ ও সহিংসতার মুখে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক। এই প্রতিরোধ ধীরে ধীরে আরও নীরব, আরও প্রতীকী হয়ে উঠলেও তা সর্বদাই আশা–জাগানিয়া ছিল। সেই নীরব প্রতিবাদই একসময় রূপ নেয় ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের বীজে। প্রগতিশীল উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ভাষায়, 

আমি তো একাই যাত্রা শুরু করেছিলাম গন্তব্যের দিকে,

একজন দুইজন করে এসে শেষে মিছিল হয়ে গেল।

খালেদা জিয়া কোনো স্মৃতি নন। তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আশার মানচিত্রে স্থায়ীভাবে অঙ্কিত এক আলোকবর্তিকা।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারপারসন, উন্নয়ন অন্বেষণ

* মতামত লেখকের নিজস্ব