
যে যুদ্ধ ঠেকাতে উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বিপুল বিনিয়োগ করেছিল, শেষ পর্যন্ত সে যুদ্ধই শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্যোগে শুরু হওয়া সংঘাতের অভিঘাত এখন সরাসরি পড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। প্রতিদিনই তাদের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা চলছে।
গত কয়েক মাসে সুদান ও দক্ষিণ ইয়েমেনের সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব কার্যত বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উপসাগরের দেশগুলো একধরনের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও ক্ষুব্ধ। কারণ, তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই এই সংঘাত শুরু হয়েছে। সামনে কী ঘটবে, তা নিয়েও রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
উপসাগরজুড়ে অবকাঠামো ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলা কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৯১ সালের আগে কুয়েত ছিল দ্রুত উত্থানশীল একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র। কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সেই অবস্থান আর পুরোপুরি ফিরে পায়নি দেশটি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে ইরান শুধু জ্বালানিবাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে চায় না, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইছে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয়টি দেশের সামনে এখন সহজ কোনো পথ নেই। দ্রুত কূটনীতির পথে হাঁটলে এমন এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকি রয়েছে, যিনি যুদ্ধে পূর্ণ বিজয় চান। আবার এতে এমন এক শাসনব্যবস্থাকেও বৈধতা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা নজিরবিহীন মাত্রায় জিসিসি দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে। ফলে নিজেদের অঞ্চলেই বড় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা হারানোর হতাশা বাড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে।
এই হতাশা থেকেই জল্পনা উঠেছে—সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব বা কাতারও সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রায় প্রতিদিনই, বিশেষ করে ইসরায়েলি সূত্রে এমন দাবি শোনা যাচ্ছে, যদিও তা দ্রুত অস্বীকার করা হচ্ছে। এই জল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানি হামলা প্রতিহত করে তারা শক্ত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাই কেউ কেউ মনে করেন, আমিরাত চাইলে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনে নতুন করে প্রতিরোধের বার্তা দিতে পারে। তবে ঝুঁকি বিবেচনায় দেশটির নেতৃত্ব এখনো সতর্ক।
সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে কম হামলার শিকার হয়েছে এবং তথ্য প্রকাশেও সংযত থেকেছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের জিসিসির নেতৃত্বস্থানীয় শক্তি মনে করায় তারা সেই ভূমিকা প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজতে পারে। আদর্শ পরিস্থিতিতে তাদের উদ্যোগ কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলতে পারে। কিন্তু সৌদি সামরিক শক্তির ব্যাপ্তি বিবেচনায় বোঝা যায়, কেন ইসরায়েল তাদের এই যুদ্ধে দেখতে আগ্রহী।
এ মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর অগ্রাধিকার হলো ইরানের হামলা থামানো, বাণিজ্যিক পথ খুলে দেওয়া এবং জ্বালানি উৎপাদন স্বাভাবিক করা। একই সঙ্গে তাদের আশঙ্কা—যদি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এই সংঘাত থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে, তবে তা আরও সাহসী হয়ে উঠতে পারে এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পারে।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও আবার মাথাচাড়া দিতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় অংশীদার হতে চায়। ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় উপসাগরীয় অংশগ্রহণ চান, তাহলে কোনো কোনো নেতা এটিকে প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেও দেখতে পারেন। একটি দেশ হামলা শুরু করলে অন্যদের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে এ মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর অগ্রাধিকার হলো ইরানের হামলা থামানো, বাণিজ্যিক পথ খুলে দেওয়া এবং জ্বালানি উৎপাদন স্বাভাবিক করা। একই সঙ্গে তাদের আশঙ্কা—যদি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এই সংঘাত থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে, তবে তা আরও সাহসী হয়ে উঠতে পারে এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পারে।
এ কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব এমন কোনো সমাধানই সমর্থন করবে, যা ভবিষ্যতে ইরানের হামলার ঝুঁকি বাস্তবভাবে কমাবে। কূটনীতি ব্যর্থ হলে তারা এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে অন্য বিকল্পও বিবেচনা করতে পারে। নিকট ভবিষ্যতে সবচেয়ে সম্ভাব্য কৌশল হলো ‘কৌশলগত ধৈর্য’। পরিহাসের বিষয়, এই পথ বহুদিন ধরে ইরানই অনুসরণ করেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব যুদ্ধের গতিপথ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং দেখবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোনো সুসংগঠিত কৌশল আছে কি না।
যদি মনে হয় নির্ণায়ক বিজয় কাছাকাছি, তবে তারা আকাশশক্তি বা অন্য সামরিক সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটে যোগ দিতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় গড়ায়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পথে এগোবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র মুখ রক্ষা করে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় অঞ্চল একটি স্থিতিশীল বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে যে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিল, তা ক্ষয়ে যাবে। আবার জিসিসি দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনীতির দিকে ঠেলে দেয়, সেটিও বিপজ্জনক নজির হতে পারে। কারণ, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরান তখন জিসিসি দেশগুলোতে হামলাকেই হাতিয়ার করতে পারে।
অন্য একটি বিকল্পও রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আংশিকভাবে শিথিল করা। অতীতে উপসাগরীয় দেশগুলো চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে এমন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে। বেইজিংও বর্তমান সংকট সমাধানে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে চীনের মূল লক্ষ্য জ্বালানি আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। বড় নিরাপত্তা বিনিয়োগ বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ভূরাজনৈতিক সংঘাতে না গিয়েও সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। ফলে আঞ্চলিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে না পড়া পর্যন্ত চীন তার অবস্থান বদলাবে—এমন সম্ভাবনা কম।
এ মুহূর্তে তাই উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি সামরিক আক্রমণ বা দ্রুত শান্তি চুক্তি—দুটোরই সম্ভাবনা সীমিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট কৌশল না থাকলে উপসাগরীয় দেশগুলো ধীরে ধীরে নিজেরাই পরিস্থিতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে।
ডন অ্যাভিভ ইন্টারফর ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্যাম ওরবি একই প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ