পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো জনগোষ্ঠীর গো হত্যা উৎসবের উৎপত্তি নিয়ে একটি মিথ প্রচলিত আছে। এই মিথ কেবল ধর্মীয় আচার ব্যাখ্যা করে না, বরং ভাষা হারানো ও জ্ঞানচ্যুত হওয়ার এক গভীর প্রতীকী ইতিহাসও ধারণ করে।
কথিত আছে, জগৎ সৃষ্টির পর থুরাই বা ঈশ্বর প্রতিটি জনগোষ্ঠীর কাছে গরুর মাধ্যমে জীবনযাপনের বিধিবিধান ও বর্ণমালাসংবলিত ধর্মগ্রন্থ পাঠিয়েছিলেন। গরু প্রথমে পৌঁছায় বাঙালিদের কাছে। সেখানে ঘোষণা করা হয়, বছরে একবার আগাছা তুলতে হবে এবং তিনবার ফসল ফলাতে হবে।
এরপর ধর্মগ্রন্থ মুখে করে গরু পর্বতের দিকে রওনা দেয়। দুপুরের দিকে ক্ষুধার্ত হয়ে সে গ্রন্থটি গলাধঃকরণ করে ফেলে। ম্রোদের কাছে পৌঁছে ঈশ্বরের বাণী গুলিয়ে ফেলে ঘোষণা করে, বছরে তিনবার আগাছা তুলতে হবে এবং একবার ফসল ফলাতে হবে। বিভ্রান্ত ও অসন্তুষ্ট ম্রোরা ঈশ্বরের কাছে অভিযোগ জানায়। সমন জারি হলে গরু স্বীকার করে যে সে ধর্মগ্রন্থ খেয়ে ফেলেছে এবং ম্রোদের যা বলেছে, তা মিথ্যা।
ঈশ্বর ক্রুদ্ধ হয়ে গরুটিকে শাস্তি দেন। সেই শাস্তির ফলেই নাকি গরুর ওপরের দাঁত ভেঙে যায়। ম্রোদের আদেশ দেওয়া হয়, গরুকে খুঁটিতে বেঁধে নাচতে নাচতে বলি দিতে এবং তার পেট চিরে ধর্মগ্রন্থ উদ্ধার করতে। কিন্তু গ্রন্থ ইতিমধ্যে হজম হয়ে গেছে। ফলে ম্রোরা হারায় তাদের ধর্মগ্রন্থ ও বর্ণমালা। এই মিথ অনুসারে, ধর্মগ্রন্থ হারানোর বেদনাই গো হত্যা উৎসবের ঐতিহাসিক স্মৃতি হয়ে আছে। অর্থাৎ একটি আচার এখানে ভাষা ও জ্ঞানের ক্ষতির প্রতীক।
এই লোককাহিনির বিপরীতে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে আবির্ভূত হন এক ঐতিহাসিক চরিত্র, যিনি ম্রো সমাজে ভাষা ও ধর্মীয় পুনর্জাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর নাম মেনলে।
১৯৬২ সালে বান্দরবান পার্বত্য জেলার চিম্বুক পাহাড়সংলগ্ন পোড়া গ্রামে মেনলের জন্ম। শৈশবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল না। পরে কাতং ম্রোর কাছে মারমা ভাষায় পড়তে শেখেন। ১৯৮০ সালে সুয়ালক এলাকায় সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আবাসিক বিদ্যালয়ে ১৮ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। বয়সের কারণে কর্তৃপক্ষ অনীহা দেখালে তিনি অনশনধর্মী প্রতিবাদে অবতীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত ভর্তি হন।
ধ্যানচর্চা ছিল মেনলের জীবনের অংশ। ১৯৮৪ সালে বিদ্যালয় ত্যাগ করে তিনি গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হন। ১৯৮৫ সালে তাঁর ধর্মপ্রচার শুরু হয়। প্রবর্তিত ধর্মের নাম ক্রামা, যার অর্থ জ্ঞানের সম্মিলন। একই সময়ে তিনি ম্রো ভাষার ৩১ বর্ণের একটি লিপি উদ্ভাবন করেন। ১৯৮৫ সালের ২৫ আগস্ট পোড়া গ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের সমাগমে তিনি নতুন গ্রন্থ ও লিপির ঘোষণা দেন। আবেগাপ্লুত সেই মুহূর্তে ম্রো সমাজ তাঁর প্রবর্তিত লিপি ও ধর্ম গ্রহণ করে। মাত্র দেড় বছরের মধ্যে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কিন্তু ক্রামা ধর্ম দ্রুত ম্রো ও খুমি সমাজে বিস্তার লাভ করে।
পরবর্তী সময়ে একটি ক্রামা কমিটি গঠিত হয়। প্রতিবছর তাঁর গ্রামে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শিষ্যরা ক্রামাধর্ম ব্যাখ্যা করেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ সালে পোড়া গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় ম্রো ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র। তিন বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রামে পাঠানো হয়। অল্প সময়ের মধ্যে বহু গ্রামে ম্রো ভাষা শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৯৪ সালে মেনরুম ম্রো তৈরি করেন প্রথম ম্রো কম্পিউটার সফটওয়্যার। পরে এর নাম হয় রিয়েন। এই লিপিতে রচিত হয় ধর্মীয় গ্রন্থ থুরাই লাং ক্লউমী। অন্যদিকে মেনয়াং ম্রো প্রণয়ন করেন ম্রো ভাষা প্রশিক্ষণ গ্রন্থ। বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটও ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়। ২০০৪ সালে ম্রো বর্ণমালা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটি আর্থিক সহায়তা পায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই প্রকাশিত হয় এবং ২০০৫ সালে তা বিদ্যালয়ে পড়ানো শুরু হয়।
বিশ্বায়নের যুগে ভাষা বিলুপ্তি এক নীরব বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে আট হাজারের বেশি ভাষা রয়েছে, যার বড় অংশ ঝুঁকির মুখে। প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। ভাষা হারানো মানে কেবল শব্দ হারানো নয়, হারিয়ে যাওয়া একটি জ্ঞানতন্ত্র, একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি।
মাতৃভাষায় শিক্ষা কেবল আবেগের প্রশ্ন নয়, এটি শিক্ষাবিজ্ঞানের স্বীকৃত নীতি। ভাষা মানসম্মত শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার মৌলিক উপাদান।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতা এম এন লারমা আদিবাসী ভাষার উন্নয়ন ও মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তৎকালীন মন্ত্রী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত ভাষাগুলোর উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা নেই। যুক্তি ছিল, বাংলা ভাষাই জাতীয় সংহতির মাধ্যম।
ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভান্ডার এবং রাজনৈতিক মর্যাদার প্রশ্ন। মাতৃভাষার স্বীকৃতি ও চর্চা নিশ্চিত করা মানে একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে সম্মান করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা তাই কেবল একটি অঞ্চলের গল্প নয়। এটি ভাষা, ন্যায় ও বহুত্বের প্রশ্নে সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।
কিন্তু ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করে, যেখানে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার স্বীকৃতি রয়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিতেও মাতৃভাষা শিক্ষার অঙ্গীকার করা হয়। বাস্তবায়নের প্রশ্ন আজও সম্পূর্ণ সমাধান পায়নি। ম্রোদের গরুর মিথ ভাষা হারানোর বেদনার প্রতীক। মেনলের আবির্ভাব সেই হারানো লিপি পুনরুদ্ধারের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রীয় নীতির সীমাবদ্ধতা ও সমাজের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগের এই দ্বৈত ইতিহাস আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়।
ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভান্ডার এবং রাজনৈতিক মর্যাদার প্রশ্ন। মাতৃভাষার স্বীকৃতি ও চর্চা নিশ্চিত করা মানে একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে সম্মান করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা তাই কেবল একটি অঞ্চলের গল্প নয়। এটি ভাষা, ন্যায় ও বহুত্বের প্রশ্নে সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।
পাহাড়ের গন্ডি পেরিয়ে মেনলের ক্রামা ধর্ম আর ম্রো বর্ণমালার সুসমাচার ছড়িয়ে পড়েছে সমতলেও।
এমনকি স্থান পেয়েছে বাংলা কবিতায়ও। আশির দশকের কবি হাফিজ রাশিদ খানের কবিতায় ক্রামা দর্শনের স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে এভাবে:
মহামতি মানুষের অপর নাম ম্রো
প্রভু থুরাই কল্যাণ করো
জগতের
মানুষের
সকলের
শিশ্নের বীর্যজিভ
যোনির রজস্বিতায়
অপরাধী অপরাধী আজ ….
পাড়ার নাচের ঘরে পড়শিজনের ভিড়ে
প্রাণী দিতে হবে বলি
সদকার প্রয়োজনে
দেখবে আকাশ দিনের ধারালো চোখে
ক্রামাদি-বিশ্বাসী দুজন যুবক-যুবতী
কান্নায়-কান্নায় শ্লোক
উচ্চারণ করি:
মানুষ হব না আর
জন্মান্তরে
ম্রোরা হবো না কভু…
(মানুষ হব না আর ম্রো হব না, আদিবাসী কাব্য ১৯৯৭)
যেহেতু বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজগুলোর টিকে থাকার মূল ভিত্তিই হলো ভাষা, একটি বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে আদিবাসীদের ভাষাগুলো যাতে টিকে থাকতে পারে, তার জন্য রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরী করতে হবে।
মং সিং ঞো আদিবাসী লেখক
ই–মেইল: mongsingneo@yahoo.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব