
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুর ওপর যে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে, তা কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা আইনশৃঙ্খলার প্রাত্যহিক ভাঙাগড়ার হিসাব নয়। এটি মূলত আমাদের চেনা সমাজ-কাঠামোর চরম নৈতিক ধস, মনস্তাত্ত্বিক বিকার এবং এক গভীর আত্মিক দেউলিয়াত্বের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ।
ঘটনার পর শিশুটির বাবার সেই তীব্র, নিস্পৃহ উচ্চারণ, ‘বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না’—আসলে কোনো সাময়িক ক্ষোভের কথা নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি এক অশনিসংকেত। সমকালীন চিন্তা, মনস্তত্ত্ব, সমাজদর্শন এবং আধ্যাত্মিকতার আলোকে এই ট্র্যাজেডি দেখে আমরা আজ কিছু গভীর ও অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হয়েছি।
প্রতিদিনের সংবাদপত্রে ক্রমাগত নৃশংসতার খবর পড়তে পড়তে নাগরিক সমাজ এখন একধরনের মনস্তাত্ত্বিক জড়তায় আক্রান্ত। অন্যায় দেখতে দেখতে তা যখন আমাদের চোখ-সওয়া হয়ে যায়, তখন সমাজের সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতাটাই ভেঙে পড়ে। আট বছরের শিশুটির এই মর্মান্তিক পরিণতি আসলে আমাদের সেই অসারতা ভাঙারই এক সংকেত।
ডিজিটাল যুগের এক অদ্ভুত সংকট হলো, এখানে যেকোনো মানবিক ট্র্যাজেডি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব দ্রুত একটি সাময়িক ‘ইভেন্ট’ বা জনপ্রিয় কনটেন্টে পরিণত হয়। পল্লবীর শিশুটি হত্যার পর ফেসবুক বা অন্যান্য ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্ম ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। কিন্তু এই ক্ষোভের আয়ু অল্পদিন। স্ক্রিনের অবিরত নতুন নতুন তথ্যের ভিড়ে কিছুদিনের মধ্যেই আমরা আরেকটি নতুন বিষয় নিয়ে মেতে উঠি এবং পুরোনো নির্মমতাকে ভুলে যাই। এই ভার্চ্যুয়াল প্রতিবাদ অনেক সময় আমাদের নিজেদের ভেতরের আসল কাঠামোগত দায় থেকে একধরনের ছদ্ম-মুক্তি দেয়। কিন্তু অপরাধের সংস্কৃতিকে আড়াল করে দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগও করে দেয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের ‘সহানুভূতির ক্লান্তি’। প্রতিদিনের সংবাদপত্রে ক্রমাগত নৃশংসতার খবর পড়তে পড়তে নাগরিক সমাজ এখন একধরনের মনস্তাত্ত্বিক জড়তায় আক্রান্ত। অন্যায় দেখতে দেখতে তা যখন আমাদের চোখ-সওয়া হয়ে যায়, তখন সমাজের সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতাটাই ভেঙে পড়ে। আট বছরের শিশুটির এই মর্মান্তিক পরিণতি আসলে আমাদের সেই অসারতা ভাঙারই এক সংকেত।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, এই অপরাধ একজন মানুষের চরম মানসিক বিকৃতি ও ব্যক্তিত্বের ভয়াবহ স্খলনকে নির্দেশ করে। যখন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মনে একটি অবোধ শিশুর অসহায়ত্ব ও আর্তনাদ ন্যূনতম দয়া বা অপরাধবোধ জাগাতে ব্যর্থ হয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের চারপাশেই এমন কিছু মানুষরূপী দানব তৈরি হচ্ছে, যারা ভেতর থেকে পুরোপুরি আবেগহীন ও মৃত।
আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক চিন্তায় এ ধরনের অপরাধকে কেবল আদিম লালসা হিসেবে দেখা হয় না। এটি আসলে চরম দুর্বল ও অরক্ষিত একটি সত্তার ওপর নিজের বিকৃত নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার এক পৈশাচিক প্রদর্শন। সমাজ যখন ব্যক্তিকে সুস্থ উপায়ে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশের পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন এই বিকৃতমনা মানুষগুলো সমাজকাঠামোর সবচেয়ে দুর্বল অংশের (বিশেষ করে শিশু ও নারী) ওপর নিজের সমস্ত ক্ষোভ ও বিকৃতির হিংস্র বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
দার্শনিক আলোচনা বাদ দিলেও আমাদের সমাজে ‘মন্দের স্বাভাবিকীকরণ’ এখন এক চাক্ষুষ সত্য। যখন কোনো সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তখন অপরাধীর মনে এই ধারণার জন্ম হয় যে সে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাবে। খুনি সোহেল রানা যে ঠান্ডা মাথায় অপরাধ করার পর আত্মগোপনের চেষ্টা করেছে, তা এরই প্রমাণ যে এই অপরাধীরা আমাদের ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে কতটা নিশ্চিত।
আমাদের আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষকে আত্মিক সত্তা হিসেবে না দেখে একধরনের ‘ভোগের বস্তু’ হিসেবে দেখতে শেখাচ্ছে। পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিক শিক্ষার এই চরম অভাব যখন সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষের চোখ থেকে অপর মানুষের পবিত্রতা ও মর্যাদার বোধ হারিয়ে যায়। শিশুটিকে নিজের বিকৃত ইচ্ছার বস্তু বানানো সেই মানবিকতারই চূড়ান্ত অবমাননা।
ধর্মের মূল সুর যখন কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে আটকে থাকে এবং অন্তরের নৈতিকতা বা আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটে না, তখন সমাজ আত্মাহীন হয়ে পড়ে। ইসলামের মূল দর্শন হলো মানুষের জান ও মালের হেফাজত। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, একটি নিষ্পাপ প্রাণ হত্যা করা মানে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) সারা জীবন শিশুদের প্রতি যে সর্বোচ্চ স্নেহ ও নিরাপত্তার কথা বলেছেন, পল্লবীর শিশুটির ওপর হওয়া পৈশাচিকতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি কেবল মহাপাপ নয়, এটি স্রষ্টার সুন্দর সৃষ্টির ওপর শয়তানের নিকৃষ্টতম থাবা।
একইভাবে সনাতন ধর্মে কন্যাশিশুকে পরম পবিত্রতার প্রতীক মনে করা হয় এবং অহিংসাকেই বলা হয়েছে পরম ধর্ম। বৌদ্ধধর্মের ‘করুণা’ ও খ্রিষ্টধর্মের ‘নিষ্পাপ আত্মাকে ভালোবাসা’র যে শাশ্বত দর্শন, এই অপরাধী তা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে নিজেকে প্রকৃতির চোখে অভিশপ্ত করে তুলেছে। পরকালের জবাবদিহি ও কর্মফলের অমোঘ বিধান থেকে এই খুনিদের নিষ্কৃতি নেই।
কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা বাহ্যিক বড় বড় অবকাঠামো কোনো সমাজকে সভ্য করে তোলে না, যদি না সেখানে একটি আট বছরের শিশু রাতে নিরাপদে ঘুমাতে পারে। শিশুটির বিদেহী আত্মা আজ আমাদের সামষ্টিক প্রগতির সমস্ত অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে গেছে।
খুনি সোহেল রানা দোষ স্বীকার করেছে। আমরা দাবি জানাই, কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই দ্রুততম সময়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত আমাদের এই ক্ষোভ যেন সাময়িক ট্রেন্ডে হারিয়ে না যায়। পল্লবীর শিশুটির পরিবারকে ন্যায়বিচার এনে দেওয়া এবং সমাজ থেকে এই মনস্তাত্ত্বিক বিকার দূর করাই হোক আমাদের আজকের সম্মিলিত শপথ। নিষ্পাপ শিশুটির আত্মার চিরশান্তি কামনা করি। এই পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে জানাই তীব্র ধিক্কার!
আহমদ এনায়েত মনজুর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, পূবালী ব্যাংক পিএলসি
মতামত লেখকের নিজস্ব