
দশকের পর দশক ধরে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা একটি সরল ধারণার ওপর নির্ভর করেছেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, অপ্রতিরোধ্য শক্তি দ্রুত প্রয়োগ করা গেলে পারস্য উপসাগরের প্রায় যেকোনো সংকট সমাধান করা সম্ভব।
কিন্তু ইরান বহু বছর ধরে সেই ধারণাকে বাতিল করে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নৌবাহিনী গড়ে তোলেনি, বরং একটি সরু জলপথকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ঝুঁকিতে পরিণত করেছে।
হরমুজ প্রণালির ভেতরে ও আশপাশে ইরানি কমান্ডাররা যা গড়ে তুলেছেন, তা প্রচলিত অর্থে কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নয়। এটি ভিন্ন ধরনের এক কৌশল। প্রায় ২১ মাইল প্রশস্ত এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক–চতুর্থাংশ চলাচল করে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন ইরানের হিসাব-নিকাশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। হরমুজ প্রণালির এই হুমকির কাঠামোটি গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। বিতর্কিত আবু মুসা ও তুনব দ্বীপপুঞ্জ ১৯৭১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে দখল করে ইরান। এরপর আর সেগুলো ফেরত দেয়নি।
১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকটে ব্রিটেন ও ফ্রান্স দেখেছিল, সামরিক সক্ষমতা আর ভূরাজনৈতিক প্রভাব এক জিনিস নয়। সব যুদ্ধে জয়ী হয়েও শেষ পর্যন্ত বড় যুদ্ধে হার মানতে হয়েছিল।
এই দ্বীপগুলো থেকেই ইরান ড্রোনের ঝাঁক মোতায়েন করেছে। এসব ড্রোন কয়েক মিনিটের মধ্যেই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে। ইরানের কাছে বিশটির বেশি ছোট সাবমেরিন রয়েছে। পাশাপাশি তাদের হাতে আছে প্রায় ছয় হাজার নৌ–মাইন।
এ অঞ্চলে চীনা নজরদারি জাহাজও অবস্থান করছে। তারা তাৎক্ষণিক লক্ষ্যভেদ–সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র যে ঐতিহাসিক গোয়েন্দা–সুবিধা ভোগ করত, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে।
এই সামরিক প্রস্তুতির লক্ষ্য সরাসরি নৌযুদ্ধে জয়লাভ নয়। বরং সমগ্র ব্যবস্থাপনাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য কোনো সংঘাত অকল্পনীয়ভাবে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মার্কিন যৌথ বাহিনীর সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন একবার হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সংকটবিন্দু বলে বর্ণনা করেছিলেন। ইরান সেই বর্ণনাকেই নকশা হিসেবে নিয়েছে।
বিশ্বের কৌশলগত জ্বালানি মজুত হয়তো দুই মাস পর্যন্ত ধাক্কা সামাল দিতে পারবে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইন প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল সরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন যায় প্রায় দুই কোটি ব্যারেল।
হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, তেল নিয়ন্ত্রণ মানেই জাতিকে নিয়ন্ত্রণ। এই মন্তব্য সময়ের সঙ্গে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইরানের নেতৃত্ব এই শিক্ষাকে স্পষ্টভাবেই গ্রহণ করেছে এবং তার ওপর ভিত্তি করেই সামরিক মতবাদ গড়ে তুলেছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে চীনের ভূমিকা। বেইজিং কেবল দর্শক নয়। প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৮৪ শতাংশই এশীয় বাজারের জন্য।
চীন একাই তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক–চতুর্থাংশ এই পথের ওপর নির্ভর করে। ইরানি বাহিনীর পাশে চীনা ডেস্ট্রয়ার টহল দেওয়া কোনো আদর্শিক সংহতির প্রকাশ নয়। এটি জাতীয় স্বার্থের প্রকাশ। বেইজিং তার সরবরাহ লাইন রক্ষা করতে চায়, একই সঙ্গে যেকোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের কূটনৈতিক ও সামরিক খরচ বাড়িয়ে তুলতে চায়।
লক্ষ্য কোনো নির্ণায়ক সামরিক সংঘর্ষ নয়। লক্ষ্য আরও ধীর এবং বিপজ্জনক কিছু। অর্থনৈতিক প্রয়োজনের নীরব ও ক্রমবর্ধমান চাপে ওয়াশিংটনকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।
ইতিহাসের প্রতিধ্বনি এখানে স্পষ্ট। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকটে ব্রিটেন ও ফ্রান্স দেখেছিল, সামরিক সক্ষমতা আর ভূরাজনৈতিক প্রভাব এক জিনিস নয়। সব যুদ্ধে জয়ী হয়েও শেষ পর্যন্ত বড় যুদ্ধে হার মানতে হয়েছিল।
১৯৭৩ সালে ওপেক দেখিয়েছিল, এক ব্যারেল তেল এমন কাজ করতে পারে যা কোনো পদাতিক বাহিনী পারে না। স্বীকৃত সীমান্তে একটি গুলিও ছোড়া ছাড়াই পশ্চিমা অর্থনীতিকে নতজানু করা যায়। ইরান সেই দুই শিক্ষাকেই কাজে লাগাচ্ছে। তাদের হিসাব হলো, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি বিঘ্ন এবং বাজার অস্থিরতার আশঙ্কা যেকোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে দ্রুত মার্কিন মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিকল্প নেই, এমন নয়। ইরানের নৌ সম্পদ ধ্বংস করা, ড্রোনের ঝাঁক নিষ্ক্রিয় করা, মাইন পরিষ্কার করা এবং শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালি খোলা রাখার সক্ষমতা এখনো তাদের আছে। জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা এ কথা সতর্কতার সঙ্গে বলেন, এবং তা পুরোপুরি ভুলও নয়।
বিকল্প অবস্থা হতে পারে একটি আলোচনাভিত্তিক সমঝোতা, যা নিখুঁত নয়, সন্তোষজনকও নয়, কিন্তু ইরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সীমিত রেখে বৈশ্বিক বাজার সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় তেলের প্রবাহ বজায় রাখতে পারে।
তেহরান ধীরে ও পরিকল্পিতভাবে যে কৌশলগত ফাঁদ তৈরি করেছে, তা সচেতনভাবেই এমনভাবে সাজানো। এর উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি পরাজিত করা নয়। বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগ ক্রমেই বেশি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ওয়াশিংটন কি এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে ভেবে দেখবে, নাকি আগের মতো পরিচিত শক্তি প্রয়োগের পথেই এগোবে, সেটিই এই দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
ভূগোল নিজে কখনো আলোচনায় বসে না। কিন্তু যারা সেই ভূগোলকে নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসে।
জাসিম আল-আজ্জাবি সাংবাদিক, কাজ করেছেন এমবিসি, আবুধাবি টিভি, আল-জাজিরা ইংলিশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত