
হোয়াইট হাউস যখন ঘোষণা করল যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, তখন ধারণা করা হয়েছিল যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো কোনো বড় ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। কিন্তু বুধবার ২০ মিনিটেরও কম সময়ের বক্তব্যে ট্রাম্প কেবল সেই কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করলেন, যা তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে বলে আসছেন।
বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছিল ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধের সমাপ্তি অথবা স্থল অভিযানের মতো কোনো কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেবেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট শেষ পর্যন্ত কেবল পুরোনো কড়া বুলি শুনিয়েই ক্ষান্ত হলেন। আল–জাজিরার প্রতিবেদনে ট্রাম্পের সেই ভাষণের মূল দিকগুলো উঠে এসেছে।
নিজের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট মূলত চারটি পরিচিত যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এই যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল, যুদ্ধে ইতিমধ্যে জয় অর্জিত হয়েছে, লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এবং খুব শিগগিরই এর সমাপ্তি ঘটবে।
যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে কিংবা ইরানের সঙ্গে তিনি ঠিক কী ধরনের চুক্তি করতে চান, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তিনি দেননি।ট্রাম্প গত ১১ মার্চ বলেছিলেন, যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে। কিন্তু এই ভাষণে নতুনত্ব খুঁজে পাননি বিশেষজ্ঞরা।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিনা আজোদি আল–জাজিরাকে বলেন যে ভাষণের কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য তাঁর নজরে পড়েনি। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সির মতে, ট্রাম্প গত ৩০ দিনে যেসব টুইট করেছেন তার একটি ধারাবাহিক সারাংশ ছিল এই ভাষণ। এটি প্রমাণ করে যে যুদ্ধ নিয়ে তাঁর কাছে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা নেই।
নতুন ঘোষণা না থাকলেও ভাষণের মাধ্যমে ক্লান্ত মার্কিন জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এবং সেটি ব্যবহার করতে পারে, তাই আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই অভিযান প্রয়োজন ছিল।
যদিও ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন যে ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এমনকি তাঁর নিজস্ব গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ডও এর আগে বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে না। তা ছাড়া মার্কিন নৌযান ‘ইউএসএস কোল’-এ এবং হামাসের গত বছরের হামলার সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার কথা ট্রাম্প বললেও সেটির কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
পার্সি উল্লেখ করেন যে খোদ রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও এই যুদ্ধের জনপ্রিয়তা কমছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের সমর্থকেরা এই যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতায় ধৈর্য হারাচ্ছেন, কারণ এর প্রভাব পড়ছে তাঁদের জ্বালানি তেল ও মুদিদোকানের খরচে।
এক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প বলে আসছিলেন যে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার গোপন আলোচনা চলছে। এমনকি ভাষণ দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট তাঁর কাছে যুদ্ধবিরতি চেয়েছেন। কিন্তু ইরান সরাসরি এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প গত বুধবারের ভাষণে আলোচনা বা কূটনীতি নিয়ে কোনো কথা উচ্চারণই করেননি।
বক্তৃতার বেশির ভাগ সময় ট্রাম্প দাবি করার চেষ্টা করেন যে আমেরিকা ইতিমধ্যে যুদ্ধে জিতে গেছে। তিনি বলেন, ইরানের নৌবাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষমতাও শেষ। তবে ট্রাম্পের এই বক্তৃতার কিছু সময় পরই ইরান ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বাহরাইন ও কাতারও ইরানের আক্রমণের হুমকিতে সতর্কসংকেত জারি করে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটে গেছে, কারণ দেশটির আগের প্রভাবশালী নেতারা এখন আর জীবিত নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁর ছেলে মোজতবা এবং দেশটির শাসনব্যবস্থায় তেমন কোনো বড় ভাঙন দেখা দেয়নি।
আমেরিকায় পেট্রলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ট্রাম্প এই দুর্ভোগের জন্য ইরানকে দায়ী করলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করেননি। উল্টো তেল আমদানিকারক দেশগুলোকে এর পাহারায় এগিয়ে আসতে বলেছেন।
ট্রাম্প ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে দেশটির বেসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা ফের উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক আইনে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ হলেও ট্রাম্প সেটিকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে হয় না। বিশ্লেষক সিনা আজোদির মতে, ট্রাম্পের এমন সরাসরি হুমকি আসলে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থারই কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।
আলী হারব ওয়াশিংটনভিত্তিক সাংবাদিক ও লেখক। তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, আরব–যুক্তরাষ্ট্র ইস্যু, মানবাধিকার ও রাজনীতি বিষয়ে লেখালিখি করেন।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত