তিন বছরের শিশু কেয়া, তার ‘থ্যালাসেমিয়া মেজর’। এক বছর বয়স থেকে মাসে মাসে রক্ত দিতে হয়, কিন্তু এত রক্ত কোথায় পাবে তার পরিবার। কেয়ার গল্পটি কোনো একক পরিবারের নয়; এটি বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস, এবারের প্রতিপাদ্য ‘আর অদৃশ্য নয়: যাদের রোগ ধরা পড়েনি তাদের খুঁজে বের করি, অদেখাদের পাশে দাঁড়াই।’
একটি জন্মগত (জেনেটিক) রক্তরোগ এবং বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বিস্তৃত রোগগুলোর মধ্যে একটি। বিভিন্ন ধরনের থ্যালাসেমিয়া আছে, কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় Hb-E এবং Hb-Beta থ্যালাসেমিয়া সবচেয়ে বেশি। জাতীয় থ্যালাসেমিয়া জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়ার বাহক (ক্যারিয়ার) ১১.৪% (Hb-E: ৮.৫৯% এবং Hb-Beta: ২.১২% এবং অন্যান্য ধরন: ০.৬৯%)। বাংলাদেশে ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ২ কোটি থ্যালাসেমিয়ার বাহক।
প্রতিবছর ১১ হাজারের অধিক থ্যালাসেমিক শিশু জন্ম নেয় (Hardy-Weinberg & multi-allelic formula অনুযায়ী)। বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত (Hb E/B এবং থ্যালাসেমিয়া মেজরের) রোগীর সংখ্যা আনুমানিক ৫ লাখ ৫২ হাজার, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ রোগী ব্লাড-ট্রান্সফিউশনের ওপর নির্ভরশীল। থ্যালাসেমিয়া রোগের এই উচ্চ প্রবণতার কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়—
ক. থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা,
খ. দুজন বাহকের মধ্যে বিবাহ,
গ. পারিবারিক বিবাহের প্রবণতা।
থ্যালাসেমিয়ার বাহকেরা রোগী নয়, তাদের কোনো উপসর্গ থাকে না, তাই তাদের কোনো চিকিৎসা বা খাদ্যতালিকাগত সীমাবদ্ধতার প্রয়োজন নেই, তবে তাদের গুরুত্ব ‘অন্য বাহককে বিয়ে না করা’র মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের ওপর নির্ভর। কারণ, দম্পতি দুজনেই যখন বাহক হয়, তখন থ্যালাসেমিক শিশুর জন্মের আশঙ্কা ২৫ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ বাহক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সহজ বৈজ্ঞানিক সত্যটি এখনো সমাজে সাধারণ মানুষের অজানা।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের হিমোগ্লোবিন লক্ষ্যমাত্রা পর্যন্ত ঠিকমতো রাখতে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন করতে হয়, অনেক থ্যালাসেমিয়া রোগী ৬ মাস বয়স থেকে সারা জীবনের জন্য ব্লাড-ট্রান্সফিউশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে এবং শরীরের অতিরিক্ত আয়রন কমানোর জন্য নিয়মিত চিলেসন (আয়রন নিষ্কাশন) করতে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। যথাযথ চিকিৎসার অভাবে হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নয়নশীল দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ রোগী সর্বোত্তম আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পায়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে করা প্রয়োজন।
বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন (স্টেমসেল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন) একমাত্র নিরাময়মূলক চিকিৎসা, বিশেষ করে অল্পবয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায় (প্রায় ৮০% নিরাময়যোগ্য)। ২০১২ সালের একটি বিশ্লেষণ অনুসারে, অ্যালোজেনিক বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন, মেডিক্যাল চিকিৎসার তুলনায় সাশ্রয়ী হিসেবে প্রতীয়মান হয়। তবে উচ্চ ব্যয়, উপযুক্ত দাতাসংকট এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে এটি এখনো সবার নাগালের বাইরে।
এই বাস্তবতায় প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর পথ। একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি—
* ব্যাপকভাবে বাহক শনাক্তকরণ (স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম) চালু করা
* বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক বা উৎসাহিত করা
* গর্ভাবস্থার ১০-১২ সপ্তাহের মধ্যে প্রিনেটাল পরীক্ষা নিশ্চিত করা
* জেনেটিক কাউন্সেলিং সেবা সম্প্রসারণ
* জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক প্রচারণা জোরদার করা
* শিক্ষাব্যবস্থায় থ্যালাসেমিয়া-বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন সাইপ্রাস, ইরান, ইতালি, কার্যকর স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে (প্রায় ৯০ শতাংশের অধিক) কমানো সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও তা সম্ভব, যদি এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়।
থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি চিকিৎসাবিষয়ক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এই রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ—সরকার, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম ও সর্বোপরি সচেতন নাগরিক সমাজের।
কেয়ার ভবিষ্যৎ আমাদের হাতেই নির্ভর করছে। এখনই সময় থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধকে একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার।
অধ্যাপক ডা. এম এ খান রক্তরোগ ও বিএমটি বিশেষজ্ঞ, উপদেষ্টা, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি, ঢাকা