এই লেখাটা একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যায়। এক আত্মপ্রত্যয়ী ভদ্রলোক খুব জোর দিয়ে বলছিলেন যে তাঁদের বাড়ির বড় বড় ব্যাপারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত তিনিই নিয়ে থাকেন। যেমন ইরান-ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার লড়াইয়ে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা কেমন হবে, এক্সপ্রেসওয়ের একটা র্যাম্প পান্থকুঞ্জে নামানো কতটা যুক্তিসংগত কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ আরোপের বিপরীতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা কী হওয়া উচিত—এই রকম সব জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সব দায় ও ভার তাঁর ওপরেই ন্যস্ত। অন্যদিকে প্রতিবেশীর মেয়ের বিয়েতে শাড়ি দেওয়া হবে নাকি মুক্তার মালার সেট দেওয়া হবে, বর্তমানের ভাড়া বাড়িটা পাল্টানো হবে কি না, কিংবা স্কুলপড়ুয়া মেয়েটি মোট কয়টা বিষয়ে কোচিং নেবে—এসব ছোটখাটো ব্যাপার তাঁর স্ত্রীই ঠিক করেন। এসব ব্যাপারে তিনি কখনোই মাথা ঘামান না।
বহু জল্পনা-কল্পনা ও হিসাব-নিকাশের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের তাৎক্ষণিক করণীয়গুলো সম্পর্কে ভাবতে গিয়েই গল্পটা মনে পড়ে গেল। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সবার প্রত্যাশা ছিল পাহাড়প্রমাণ। কিন্তু দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের সামান্য চেষ্টা দৃশ্যমান হলেও অন্য কোনো ক্ষেত্রে বড় কোনো সাফল্য প্রত্যক্ষ করেনি জাতি। প্রতি মাসে গড়ে সাতটির বেশি অধ্যাদেশ জারি করে দেশ চালানোর চেষ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ ব্যর্থতার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থবিরোধী এবং ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষাকারী বহু সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও অতি সহজেই বাস্তবায়ন করা যেত, এমন প্রয়োজনীয় অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে, যা এখনো জাগরূক। সঞ্চারিত এই আশাবাদ চাঙা থাকতে থাকতেই নতুন ও তরুণতর নেতৃত্বের অধীনে দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা দলটির দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যা ওপরের গল্পটির ছোটখাটো সিদ্ধান্তের মতো হলেও সহজসাধ্য এবং মানুষের কাছে দৃশ্যমান ও কার্যকর বলে পরিগণিত হবে। তার ওপর এগুলো বাস্তবায়ন করতে খুব বেশি সময় ও অর্থের প্রয়োজনও পড়বে না। যা দরকার, সেটি হবে সরকারের সদিচ্ছা ও সরকারপ্রধানের দৃঢ়তা। ইতিমধ্যে তাঁর কিছু ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ফলে তাঁর কাছ থেকে এ–জাতীয় আরও কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগের প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মধ্যে।
আগামী মে মাসের ২৯ তারিখের সংবাদপত্রগুলোতে সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হবে। এই সীমিত সময়ের মধ্যে উপরোক্ত ছোটখাটো বিষয় বাস্তবায়নের কাজে হাত দিয়ে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন সম্ভব, যা কেবল অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারই করবে না, প্রতিফলিত হবে সরকারের সদিচ্ছাও।
প্রথম যে বিষয়টির প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে দৃষ্টি দিয়েছেন, সেটি হচ্ছে নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি। আমরা জানি, ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া খাল খনন কর্মসূচির আওতায় পরবর্তী চার বছরের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার খাল খনন করা হয়েছিল, যার দৈর্ঘ্য ছিল সাড়ে ৩ হাজার মাইলের বেশি। এসব খালের মাধ্যমে সেচের আওতায় এসেছিল লক্ষাধিক একর জমি। সরকারের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তার অংশবিশেষও যদি কার্যকর করা যায়, সেটি হবে এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য। একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য নগরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালগুলোকে দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধার করার জন্য কঠোর পদক্ষেপও নিতে হবে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দ্রুততর হবে অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন।
দ্বিতীয় যে বিষয়টির প্রতি প্রধানমন্ত্রী নজর দিয়েছেন, সেটি হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা। এ ব্যাপারে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি—পরিচ্ছন্ন ঢাকা, সবুজ ঢাকা এবং নগরবাসীকে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা করা। আমাদের অসচেতন নাগরিকদের কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকার স্বপ্ন খুব অবাস্তব নয়। এটির জন্য প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও কঠোর অবস্থান। কেবল ঢাকাসহ অন্যান্য নগরের সর্বত্র কেব্ল টিভির লাইন, অবৈধ ব্যানার, হোর্ডিং, সাইনবোর্ড এবং পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেললেই শহরকে অনেক বেশি জঞ্জালমুক্ত মনে হবে। পরিচ্ছন্নতা মানে কেবল রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া বোঝায় না, দেয়াল ও পিলারগুলোকে পোস্টারমুক্ত করাও বোঝায়। শুধু পোস্টার সরালেই চলবে না, পরবর্তী সময়ে পোস্টার এবং অবৈধ ব্যানার ও সাইনপোস্টদাতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও চালু করতে হবে। এ ব্যবস্থার সঙ্গে সাইনবোর্ড হোর্ডিং ইত্যাদির জন্য ক্রমবর্ধমান হারে পৌরকর বাড়িয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি পৌর কর্তৃপক্ষের আয় বৃদ্ধি করাও সম্ভব। সবুজ ঢাকার জন্য সম্ভাব্য সব জায়গায় ছায়াযুক্ত গাছ লাগানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিলে কিছুটা সবুজ হতে পারে ঢাকা।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে ঢাকা শহরের ভেঙে পড়া ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন। এ জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয়ের দরকার হবে না, দরকার হবে গাড়িচালকদের মানসিকতার পরিবর্তন। কাজটা সময়সাপেক্ষ হলেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কঠোর শাস্তির বিধান করলে কিছু সাফল্য আসতে পারে। যেমন নগরীর বিভিন্ন সড়কের সংযোগস্থলের বিশাল জায়গাজুড়ে হলুদ ক্রসচিহ্নের ওপর যেকোনো গাড়ি দাঁড়াতে পারে না, এই আইনটি একজন চালকও জানেন না, লেনবিষয়ক আইন সম্পর্কেও অবহিত নন অধিকাংশ চালক।
এ বিষয়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ না দিয়ে রাস্তার ওপর চিহ্ন এঁকে দিয়ে শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই করা হয়নি, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানবিশেষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থাও করা হয়েছে, অথচ ট্রাফিক শৃঙ্খলার কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। সড়কের লেন মেনে না চলা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ করে দেওয়া কিংবা গাড়ি পার্কিং করা—এসব অরাজকতার অবসান ঘটানো সম্ভব, যদি কঠোরভাবে আইন বাস্তবায়ন করা যায়।
সড়ক-মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে হাটবাজার বা দোকান বসানো কিংবা অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন থ্রি-হুইলার ও নছিমন-জাতীয় যান চলাচলের বিরুদ্ধেও কোনো উদ্যোগই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সড়কে অরাজকতা বন্ধের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগের ফলাফল দেখা যায় সেনানিবাসের বাইরে ও ভেতরের ট্রাফিক ব্যবস্থায়। সেনানিবাসের ভেতরে যে ড্রাইভারটি অতি নিরীহ ও সভ্য আচরণ করে, বাইরে এলেই তার উগ্র ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণের বৈপরীত্য থেকেই বোঝা যায় আইন প্রয়োগের সফলতা ও ব্যর্থতার বিষয়টি।
নগরীর আরেক সমস্যা গণপরিবহন বা বাস সার্ভিস। জরাজীর্ণ ও ছালবাকল ওঠা যে বাসগুলো রাস্তায় চলে, সেগুলো কোনো মেগা সিটির যোগ্য গণপরিবহন হতে পারে না। ঢাকা নগরীর বাস সার্ভিসকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি স্বার্থান্বেষী মহলের অসহযোগিতায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে নতুন সরকারও সফল হবে না, যদি প্রধানমন্ত্রী তাঁর দীর্ঘদিন লন্ডনবাসের অভিজ্ঞতা থেকে কঠোর ব্যক্তিগত উদ্যোগ না নেন। একই ব্যবস্থা নিতে হবে নগরীর মূর্তমান বিপদ ব্যাটারিচালিত অনিয়ন্ত্রিত রিকশার বিরুদ্ধেও।
জাতিকে দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ‘উপহার’ ছিল ‘প্রেশার গ্রুপ’ নামকরণের মাধ্যমে মব-সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়া। এই ভয়াবহ প্রবণতা কিছুটা কমে এলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। নতুন সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর ও অনমনীয় হতে হবে। অনির্বাচিত সরকারের রেখে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে খুব উন্নতি ঘটেনি, সেটা সংবাদপত্র খুললেই দৃশ্যমান হয়। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি খুব সহজ নয়, কারণ এই পরিস্থিতির কারণ বহুবিধ এবং গভীর। তবে পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা, জনবল, সরঞ্জাম এবং অবকাঠামোগত বৃদ্ধি করলে মধ্যম মেয়াদে সুফল আসতে পারে।
লেখাটির শুরুতে বলা গল্পের ছোটখাটো বিষয়ের মতো উপরোক্ত বিষয়গুলো দিয়েই নতুন সরকার দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে, যার জন্য অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান লাগবে না, প্রয়োজন হবে কেবল সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ। আগামী মে মাসের ২৯ তারিখের সংবাদপত্রগুলোতে সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হবে। এই সীমিত সময়ের মধ্যে উপরোক্ত ছোটখাটো বিষয় বাস্তবায়নের কাজে হাত দিয়ে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন সম্ভব, যা কেবল অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারই করবে না, প্রতিফলিত হবে সরকারের সদিচ্ছাও।
ফারুক মঈনউদ্দীন লেখক ও ব্যাংকার। ই–মেইল: fmainuddin@hotmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব